যশোর-৪ (বাঘারপাড়া-অভয়নগর) আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) এবং জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক গোলাম রসুলের বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এমপির বাসভবনের সামনে অবস্থিত ‘আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ’ ও মসজিদের যাতায়াতের রাস্তা এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমপির পরিবারের দীর্ঘদিনের বিরোধকে কেন্দ্র করে এ ঘটনার সূত্রপাত ঘটে। তবে এ নিয়ে বুধবার (২৯ জুলাই) জেলা প্রশাসন দুই পক্ষকে নিয়ে সমঝোতা সভা করলেও বিষয়টি মানেননি স্থানীয় লোকজন। তারা বলছেন, জামায়াত এমপির মেয়েকে ক্ষমা চাইতে হবে। যদিও এর মধ্যে মঙ্গলবার মেয়েকে মানসিক রোগী দাবি করে ক্ষমা চেয়েছেন জামায়াত এমপি। সেটি মানতে চান না এলাকাবাসী।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বেলা ১১টার দিকে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে এমপি এবং তার মেয়ে মেহজাবিন জান্নাত অনন্যার কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে এমপির মেয়ে অনন্যা তালা দিয়ে আঘাত করলে রোকসানা খাতুন নামে স্থানীয় এক নারী অভিভাবক আহত হন। সেইসঙ্গে অন্য এক অভিভাবকের ওপর চড়াও হন। এমপির মেয়ে এর আগে সোমবারও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ভয়ভীতি দেখান এবং মঙ্গলবার সকালে মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেন, যা এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, এমপি গোলাম রসুলের বাসভবন যশোর শহরের নীলগঞ্জ এলাকায়। পাশের রাস্তা নিয়ে গোলাম রসুল ও তার মেয়ে মাদ্রাসায় ঢুকে বিরোধে জড়ানোর পর এলাকাবাসী তাদের বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও এমপি ও তার পরিবারের সদস্যদের অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ করেন এলাকাবাসী। এ অবস্থায় এমপি ফেসবুক লাইভে এসে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানানোর পাশাপাশি ক্ষমা চেয়ে মিলেমিশে থাকতে চেয়েছেন। তিন ঘণ্টা পর বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেয় পুলিশ।
পুলিশ ও এলাকাবাসীর ভাষ্য, গোলাম রসুলের বাড়ির সামনে আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ ও মসজিদ আছে। ওই মাদ্রাসায় যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এমপির পরিবারের সঙ্গে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিরোধ চলছিল। এমপির মেয়ে অনন্যা গতকাল সোমবার মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি দেখান। এ নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হলে পুলিশের মধ্যস্থতায় মীমাংসা হয়।
মঙ্গলবার সকালে গোলাম রসুল ও তার মেয়ে মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় রেক্সোনা নামের স্থানীয় এক নারীর মাথা ফাটিয়ে দেন অনন্যা। তিনি পরে নাসির উদ্দিন নামে এক অভিভাবকের ওপর চড়াও হন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে হয়ে ওঠেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সংসদ সদস্য ও তার মেয়ে বাসভবনের মূল ফটক বন্ধ করে দেন।
বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
বিক্ষোভকারী রবিউল অভিযোগ করেন, ‘মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মঙ্গলবার সকালে বিক্ষোভকারীরা এমপির বাড়ির সামনে জড়ো হলে দোতলা থেকে গরম পানি ফেলা হয়। এতে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং এমপির বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে।’
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পরিস্থিতি মীমাংসার উদ্দেশ্যে গোলাম রসুলের এক স্বজন আব্দুল্লাহ ঘটনাস্থলে এলে বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে মারধর করেন। একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা যশোর-নড়াইল মহাসড়ক অবরোধ করে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। এমপি গোলাম রসুল ও তার মেয়ের বিচারের দাবিতে তারা সড়কে অবস্থান করেন। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক যশোর-নড়াইল মহাসড়কে লোকজন অবস্থান নিলে যানজট সৃষ্টি হয়। পরে পুলিশ জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি দিলে সড়ক থেকে সরে দাঁড়ান তারা।
প্রায় ছয় ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পরে সংসদ সদস্য গোলাম রসুল নিজ বাসা থেকে ফেসবুকে একটি ভিডিও বার্তায় বলেন, মাদ্রাসায় যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ আছে। রাস্তাটি তাদের টাকা দিয়ে কেনা। সেটি সব সময় সচল রাখতে হবে। এটা নিয়ে তার মেয়ের সঙ্গে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও হুজুরদের কথা–কাটাকাটি হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য আমি মর্মাহত। এই ভুলের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমরা সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চাই।
মেয়ে অন্যনা সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত দাবি করে এমপি গোলাম রসুল বলেন, ভারতের হায়দরাবাদ ও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে তার চিকিৎসা করানো হয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি ভীত, সন্ত্রস্ত। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। গানপাউডার এনে রেখেছে। যেকোনো সময় আমার বাড়িতে আগুন দেওয়া হতে পারে।’
সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এমপির মেয়ের সঙ্গে মাদ্রাসার শিশু ও অভিভাবকদের সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে। সেই ঘটনার জের ধরে বিক্ষুব্ধ লোকজন এমপি সাহেবের বাড়ি ঘেরাও করেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়। পরিস্থিতি স্বাভারিক রয়েছে। ঘটনা পুলিশ তদন্ত করবে।’
ওই ঘটনার পর জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি আবু জাফরের সভাপতিত্বে শহরের বারান্দিপাড়া এলাকার দলীয় কার্যালয়ে জরুরি বৈঠক হয়। বৈঠকের সিন্ধান্ত অনুযায়ী এদিন সন্ধ্যায় ভাঙচুর ও হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন দলটির নেতাকর্মীরা। সন্ধ্যায় শহরের কোর্ট মোড় থেকে নেতাকর্মীরা মিছিলটি বের করেন। পরে মিছিলটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে চৌরাস্তায় যেয়ে শেষ হয়। মিছিলে হামলাকারীদের আটকের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন নেতৃবৃন্দ।
জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক গোলাম কুদ্দুস বলেন, ‘তুচ্ছঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা জামায়াতের আমির ও সংসদ সদস্যের বাড়িতে হামলা হয়েছে। সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা হলেও জড়িতদের আটক করেনি প্রশাসন। বাড়ির সামনে হামলাকারীরা দিনভর অবস্থান করলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনও পদক্ষেপ নেয়নি। দ্রুত হামলাকারীদের আটকের দাবি জানাই।
গোলাম রসুলের বাসায় হামলা ও ভাঙচুরের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতারা বলছেন, বিএনপি নেতাদের মদতে এই হামলা হয়েছে।
রাতে এক বিবৃতিতে এ দাবি করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিএনপির নেতাকর্মীদের মদতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও পরিকল্পিতভাবে যশোর শহরের নীলগঞ্জ এলাকায় যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবং যশোর জেলা জামায়াতের আমির গোলাম রসুলের বাসায় একদল সন্ত্রাসী ন্যক্কারজনক হামলা চালিয়েছে। আমি এই হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। একজন সংসদ সদস্যের বাসায় এমন হামলা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে অবনতির দিকে নিয়ে যাবে। আমি হামলার সঙ্গে জড়িত ও উস্কানিদাতাদের অবিলম্বে শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার জোর দাবি জানাচ্ছি।’
তবে জামায়াতের এই ধরনের বিবৃতি বিভ্রান্তিকর ও নিজেদের অপরাধ ঢাকতে এমন বক্তব্য দেওয়া হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু। তিনি বলেন, ‘শিশুদের মারধর ও তালা দিয়ে অভিভাবকদের মাথা ফাটিয়ে দেওয়া মস্তিষ্কবিকৃত কর্মকাণ্ড। ক্ষুব্ধ হয়ে লোকজন এমপির বাড়িতে গিয়েছেন। বিএনপি রাজনৈতিকভাবেই এটা কখনও ভাবেই না। এই ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমাদের কোনও ধরনের নেতাকর্মী জড়িত নয়। বিভ্রান্তিকর কথাবার্তা ছড়াচ্ছে নিজেদের অপরাধ ঢাকতে।’

জামায়াত এমপির বাসভবনে হামলা-ভাঙচুর করলো কারা?
মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পেটালেন জামায়াত এমপির মেয়ে, প্রতিবাদে বাড়ি ঘেরাও







