সুন্দরবনে প্লাস্টিকের স্রোত, যায় মাছের পেটেও: কীভাবে বাঁচবে প্রাণ

হেদায়েৎ হোসেন, খুলনা
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১আপডেট : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০১

জোয়ার-ভাটার টানে উপকূলের খাল-নদী পেরিয়ে প্লাস্টিক, পলিথিন, ককসিট, বোতল ও নানা ধরনের বর্জ্য জমছে সুন্দরবনে। উপকূলীয় বসতি ও বাজারের পাশাপাশি সমুদ্রগামী জেলে নৌকায় ব্যবহৃত প্লাস্টিকও ভেসে এসে ঢুকছে বনের নদী-খালে। ফলে পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ও সৈকত এলাকায় দেখা দিয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ। এতে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটির জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বাড়তি ঝুঁকিতে পড়ছে।

পরিবেশবিদরা বলছেন, সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণের জন্য শুধু পর্যটকদের দায়ী করলে সমস্যার মূল কারণ আড়ালে থেকে যাবে। উপকূলীয় এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, নদী-খালে যত্রতত্র প্লাস্টিক ফেলা এবং সমুদ্রে জেলেদের ব্যবহৃত বর্জ্য ফেলে দেওয়ার প্রবণতাও এর বড় উৎস। তাই সুন্দরবন রক্ষায় পর্যটকদের পাশাপাশি উপকূলীয় জনগোষ্ঠী, সমুদ্রগামী জেলে এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সচেতন করা জরুরি।

সুন্দরবনের কটকা, কচিখালি, জামতলা, ডিমের চর ও আন্দারমানিকসহ জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে জোয়ারে ভেসে আসা প্লাস্টিক, জেলেদের ব্যবহৃত জাল ও অন্যান্য একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক পড়ে থাকতে দেখা গেছে। কোথাও সৈকত থেকে বনের অভ্যন্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে বোতল, প্যাকেট ও পলিথিন।

এই পরিস্থিতিতে পর্যটন মৌসুমের শুরুতেই সুন্দরবন থেকে প্লাস্টিক ও পচনশীল বর্জ্য অপসারণে নেমেছে ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবন (টোয়াস)। ৭, ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির সদস্যরা সুন্দরবনের পাঁচটি পর্যটনকেন্দ্র থেকে বর্জ্য সংগ্রহ করেন। তিন দিনে তারা ১৫ বস্তা প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ করে খুলনায় এনে ডাম্পিং করেন।

এর আগে গত মে মাসেও একই পাঁচটি পর্যটনকেন্দ্রে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়েছিল টোয়াস। তখন পর্যটন মৌসুম না থাকলেও ১২ বস্তা প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল। এরপর চার মাস সুন্দরবনে পর্যটন কার্যক্রম ছিল না। তবু এবার নতুন করে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক বর্জ্য পাওয়ায় দূষণের উৎস নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ডিমের চরে দেখা গেছে, সৈকত থেকে বনের ভেতর পর্যন্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে নানা ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য। সাগরের স্রোতের সঙ্গে জেলেদের ব্যবহৃত প্লাস্টিক বর্জ্যও ভেসে আসছে। কটকা ও কচিখালি থেকে বিপুল পরিমাণ প্লাস্টিক অপসারণ করা হয়েছে। জামতলার প্রায় দুই কিলোমিটার হাঁটার পথ তুলনামূলক পরিচ্ছন্ন থাকলেও সি-বিচ এলাকায় প্রচুর বর্জ্য দেখা গেছে।

উপকূলীয় বসতি ও বাজারের পাশাপাশি সমুদ্রগামী জেলে নৌকায় ব্যবহৃত প্লাস্টিকও ভেসে এসে ঢুকছে বনের নদী-খালে

সুন্দরবনের বাইরে উপকূলীয় এলাকাতেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া, গাবুরা, বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সিগঞ্জ ও কৈখালীর বিভিন্ন বাজার ও বসতবাড়ির আশপাশে পড়ে থাকতে দেখা গেছে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক সামগ্রী। মুন্সিগঞ্জ, নওয়াবেঁকী ও নীলডুমুর বাজারে সকালে চা-পানের পর ফেলে রাখা প্লাস্টিকের কাপ, বিকালে খাবারের প্লেট ও চিপসের প্যাকেট নদীর পাশে ফেলে দেওয়ার চিত্রও দেখা গেছে। মোংলায়ও নদীর পাশে পড়ে থাকছে প্লাস্টিক বর্জ্য।

উপকূলীয় এলাকার লোকজন জানান, এসব প্লাস্টিক সামগ্রী সস্তা ও সহজলভ্য। ব্যবহারের পর পরিষ্কার করার ঝামেলাও নেই। বিশেষ করে সামাজিক অনুষ্ঠান, খাবারের দোকান ও হোটেল-রেস্তোরাঁয় দ্রুত সেবা দিতে গিয়ে অনেকে প্লাস্টিক পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। পরে এসব বর্জ্য পাশের খাল, জলাশয় ও নদীতে গিয়ে পড়ে। জোয়ার-ভাটার স্রোতে সেগুলো শেষ পর্যন্ত সুন্দরবনের অভ্যন্তরে পৌঁছায়।

সুন্দরবনের সীমানা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া শিবসা, কপোতাক্ষ, শেলা, বলেশ্বর, খোলপেটুয়া, মালঞ্চ, চুনকুড়ি ও মাদার নদীও এ বর্জ্য বহন করছে। নদীর পাড়ের অনেক মানুষ ব্যবহৃত প্যাকেট, বোতল ও প্লাস্টিকের গ্লাস না বুঝেই পানিতে ফেলে দিচ্ছেন।

ডিমের চরে শ্যামনগরের দাতিনাখালী গ্রামের জেলে বাচ্চু হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নদীতে জাল ফেললে এখন মাছের বদলে উঠে আসে চিপসের প্যাকেট, পানির বোতল আর পলিথিন। মাছও কমে গেছে আগের তুলনায়।’

গাবুরার জেলে আশিক হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘আগে চরের ওপর আগাছা বা ছোট গাছ গজানোর সুযোগ থাকতো। এখন প্লাস্টিকে ভর্তি হয়ে থাকায় মাটি আটকে থাকে, আগের মতো গাছও জন্মায় না।’ তিনি বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করি নিজেরা প্লাস্টিক না ফেলতে। কিন্তু ঘাটে বা বোটে কোনও ডাস্টবিন নেই। পানির বোতল বা খাবারের প্যাকেট কোথায় রাখবো, সেটাই বুঝি না।’

পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই সুন্দরবনের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্র ও সৈকত এলাকায় দেখা দিয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ

রাজশাহী থেকে পরিবার নিয়ে সুন্দরবন দেখতে কচিখালিতে আসা পর্যটক রহমান মিয়াও ডাস্টবিনের সংকটের কথা বলেন। তিনি জানান, তারা নিজেরা প্লাস্টিক না ফেলার চেষ্টা করেন। কিন্তু ঘাট বা বোটে ডাস্টবিন না থাকায় পানির বোতল ও খাবারের প্যাকেট কোথায় রাখবেন, সেটি নিয়ে সমস্যা হয়।

পাবনা থেকে আসা শিক্ষার্থী সামিয়া হক বলেন, ‘সুন্দরবন খুবই সুন্দর জায়গা। কিন্তু বনে এত প্লাস্টিক ও ময়লা দেখে মনটাই খারাপ হয়ে গেছে। আর বনের চলাচলের পথটাও পিচ্ছিল। সাবধানে হাঁটতে হচ্ছে। পর্যটকরা সচেতন হলেই কাজ শেষ নয়, স্থানীয় জনগোষ্ঠীও সচেতন না হলে বনের এই সৌন্দর্য একদিন হারিয়ে যাবে।’

প্লাস্টিক দূষণের আরেকটি বড় চিত্র উঠে এসেছে গবেষণায়। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর ‘স্পেশাল ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড ক্যারেক্টারাইজেশন অব মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন দ্য কোস্টাল ওয়াটার অ্যান্ড সেডিমেন্ট অব দ্য বে অব বেঙ্গল কোস্টাল, বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় সুন্দরবনের পানি, মাটি, শামুক ও সামুদ্রিক মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত উপকূলীয় এলাকায় পরিচালিত ওই গবেষণায় সুন্দরবনের পানিতে প্রতি লিটারে গড়ে ২ দশমিক ২২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক, মাটিতে প্রতি কেজিতে গড়ে ৭৩৪টি, শামুকে প্রতি ব্যক্তিতে ৩ দশমিক ০২টি এবং সামুদ্রিক বিভিন্ন মাছে প্রতি ব্যক্তিতে ৪ দশমিক ২৬টি মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।

পর্যটন ব্যবসায়ীরা বলছেন, সুন্দরবনে প্লাস্টিক দূষণের জন্য একমাত্র পর্যটকরা দায়ী নন। স্থানীয় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও এর বড় কারণ। উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে সচেতন করার পাশাপাশি বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

টোয়াস সদস্য রুবেল ও লালন বলেন, ‘আমরাও চাই সুন্দরবন নিরাপদ থাকুক। আমাদের ব্যবসাও সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল। তাই আমরা নিজেদের উদ্যোগে নদী পরিষ্কার অভিযান চালাই এবং পর্যটকদের সচেতন করার চেষ্টা করি। তবে সরকার ও বন বিভাগের অংশগ্রহণ ছাড়া ব্যাপক পরিবর্তন সম্ভব নয়।’

টোয়াসের সাধারণ সম্পাদক মাঝহারুল হক কচি জানান, পরিবেশ ও প্রকৃতিবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করতে তারা সুন্দরবন থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছেন। শুধু প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণই নয়, জাহাজে একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহারও বন্ধ করেছেন তারা। এ বিষয়ে পর্যটকদের কাউন্সেলিংও করা হচ্ছে।

বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনটির জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বাড়তি ঝুঁকিতে পড়ছে

তিনি বলেন, মৌসুমের শুরু ও শেষে দুই দফায় সংগঠনের সদস্যরা একত্র হয়ে প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্র থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে খুলনায় নিয়ে ডাম্পিং করেন। এবার বর্জ্যের পরিমাণ বেশি হওয়ায় পুরো পর্যটন মৌসুমজুড়ে এ কাজ চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতি ভ্রমণেই টোয়াসের সদস্যরা নিজেদের উদ্যোগে জাহাজ থেকে বর্জ্য অপসারণ করবেন।

বন বিভাগ বলছে, সুন্দরবনের ভেতরে প্লাস্টিক বহন করে নেওয়া বা ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে নদীপথে ভেসে আসা বর্জ্য ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘সুন্দরবনের ভেতরে প্লাস্টিক বহন করে নিয়ে যাওয়া কিংবা ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আমাদের বন প্রহরীরা নিয়মিত টহল দিয়ে পর্যটক ও জেলেদের তল্লাশি করে। এরপরও নদীপথে ভেসে আসা প্লাস্টিক সুন্দরবনের নদী-খালে পৌঁছে যাচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এটা শুধু বন বিভাগ বা টোয়াসের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। স্থানীয় প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং স্থানীয়দের সম্মিলিতভাবে সচেতন ও সক্রিয় হতে হবে। বন বিভাগ বছরে কয়েকবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালায় এবং স্কুল-কলেজে সচেতনতামূলক সভা করে। টোয়াসও সচেতনভাবে চেষ্টা করছে। তারা মৌসুমের শুরু ও শেষে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করে। আমরা চাইবো, প্রতিটি ট্যুরেই তারা এ কাজটি চলমান রাখবে।’

/এএম/ 
সম্পর্কিত
সুন্দরবনে নিষিদ্ধ এলাকায় মাছ ধরতে গিয়ে ২ নৌকাসহ ৭ জেলে আটক
বিএনপিতে যোগ দিলেন জামায়াতের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী
দুই পুলিশ সদস্য আটক
সর্বশেষ খবর
সিপিএল অভিষেকেই মিরাজের বাজিমাত, ১৩ রানে ৩ উইকেট
সিপিএল অভিষেকেই মিরাজের বাজিমাত, ১৩ রানে ৩ উইকেট
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষেই কর্মক্ষেত্রের প্রস্তুতি নেবেন যেভাবে
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষেই কর্মক্ষেত্রের প্রস্তুতি নেবেন যেভাবে
ফিলিপাইনে ফেরিতে আগুন: নিহত ৫, নিখোঁজ বহু
ফিলিপাইনে ফেরিতে আগুন: নিহত ৫, নিখোঁজ বহু
ইউরোপ-এশিয়ার মাঝে মসজিদের শহর ইস্তাম্বুলকে ভ্রমণতালিকায় কেন রাখবেন
ইউরোপ-এশিয়ার মাঝে মসজিদের শহর ইস্তাম্বুলকে ভ্রমণতালিকায় কেন রাখবেন
সর্বাধিক পঠিত
সোনালী ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তার ১০ বছরের সাজা, ৯৩ কোটি টাকা জরিমানা
সোনালী ব্যাংকের ছয় কর্মকর্তার ১০ বছরের সাজা, ৯৩ কোটি টাকা জরিমানা
রাহুলের সঙ্গে শ্রদ্ধার প্রেম, প্রকাশ্যে এলো রোমান্টিক মুহূর্ত
রাহুলের সঙ্গে শ্রদ্ধার প্রেম, প্রকাশ্যে এলো রোমান্টিক মুহূর্ত
নতুন কৌশলে প্রতারণা, ইলিশ বিক্রেতাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা
নতুন কৌশলে প্রতারণা, ইলিশ বিক্রেতাকে ১ লাখ টাকা জরিমানা
জুলাই জাদুঘরে অশ্রুসিক্ত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল
জুলাই জাদুঘরে অশ্রুসিক্ত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল
নিজেকে দেখতে চান আশির দশকে? ছবি বানাবেন যেভাবে
নিজেকে দেখতে চান আশির দশকে? ছবি বানাবেন যেভাবে