জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের বাড়তি দামে কৃষিকাজে সেচের খরচ বেড়েছে। এতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে কৃষকদের ওপর। এমন পরিস্থিতিতে সৌরশক্তিনির্ভর সেচ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বাগেরহাট ও ঝিনাইদহে। সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্পে সেচ দিয়ে খরচ কমানোর পাশাপাশি বাড়তি আয় করছেন কৃষকরা।
ইতিমধ্যে বাগেরহাট সদর ও রামপাল উপজেলায় সাতটি এবং ঝিনাইদহে ৩৬টি সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। বাগেরহাটের সাতটি পাম্পই নারী কৃষি উদ্যোক্তাদের ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে। এসব পাম্প পরিচালনায় গড়ে উঠেছে নারী কমিটি। অন্যদিকে, ঝিনাইদহে প্রান্তিক কৃষকরা নিজেদের জমিতে সেচ দেওয়ার পাশাপাশি অন্য কৃষকদের জমিতেও পানি সরবরাহ করে বাড়তি আয় করছেন।
বাগেরহাট সদর ও রামপালে স্থাপিত সাতটি সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প নারী কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি কমিটিতে ৪০ জন করে নারী রয়েছেন। জলবায়ু সহনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান আইআরভি এসব পাম্প সরবরাহ করেছে।
মৎস্য ও কৃষিনির্ভর এলাকার নারী উদ্যোক্তাদের সেচ সুবিধা সহজ করতে রামপালের উজলকুড় ইউনিয়নে তিনটি, ভোজপাতিয়া ইউনিয়নে দুটি এবং বাগেরহাট সদর উপজেলার ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের সায়েড়া গ্রামে দুটি সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে।
এসব পাম্প ব্যবহারের ফলে নারী কৃষি উদ্যোক্তাদের সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে। একই সঙ্গে ডিজেল ও বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমায় বাড়ছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার। কমছে পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবও।
বাগেরহাট সদরের পূর্ব সায়েড়া পূর্বপাড়া কৃষি নারী উদ্যোক্তা ফোরামের সভাপতি দীপিকা মিস্ত্রি বলেন, শীত মৌসুমে সবজি ক্ষেতে পানি দেওয়ার জন্য আমাদের অনেক কষ্ট করে মাছের ঘের বা খাল থেকে পানি টেনে আনতে হতো। এ কারণে ইচ্ছা থাকলেও বেশি জমিতে চাষাবাদ করতে পারতাম না। সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প পাওয়ার পর সেই কষ্ট অনেকটাই কমেছে।
তিনি বলেন, প্রয়োজন অনুযায়ী পাম্পটি এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে পাইপের মাধ্যমে দূরের জমিতেও পানি দিতে পারছি। এতে পানি টানার সময় ও শ্রম দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে। অতিরিক্ত সময় কাজে লাগিয়ে এখন আরও বেশি জমিতে চাষাবাদ করতে পারছি।
পূর্ব সায়েড়া মধ্যপাড়া নারী উদ্যোক্তা ফোরামের সভাপতি লাভলী মণ্ডল বলেন, সৌরচালিত পাম্প থাকায় সেচের জন্য তেল বা অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ করতে হচ্ছে না। সূর্যের আলো ব্যবহার করে সরাসরি ধান ও সবজি ক্ষেতে পানি দিতে পারছি। আগে অন্যের জমির শ্যালো মেশিন ভাড়া নিতে হতো। মেশিন আনা-নেওয়া ও তেলের খরচ মিলিয়ে আমাদের জন্য বিষয়টি বেশ কষ্টকর ছিলো।
আইআরভির নির্বাহী প্রধান মেরিনা যুথি বলেন, জলবায়ু সহনশীল কৃষি ও নারীর ক্ষমতায়নে সৌরচালিত সেচ পাম্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তৃণমূল পর্যায়ে নারীরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন। তারা এখন শুধু সোলার পাম্প ব্যবহারকারী নন, উদ্যোক্তা হিসেবেও কাজ করছেন। এ জন্য নারীবান্ধব প্রযুক্তি ও প্রণোদনা আরও বাড়ানো প্রয়োজন।
বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মোতাহার হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ সংকটের মধ্যে সেচ সচল রাখতে সৌরশক্তি সহায়ক ভূমিকা রাখছে। বেসরকারি উদ্যোগে সোলার পাম্প পেয়ে বাগেরহাটের নারী কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন। সরকারও এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ করছে। কৃষি বিভাগের মাধ্যমে কৃষকদের সোলার পাম্প দেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ঝিনাইদহ সদর, কোটচাঁদপুর ও মহেশপুর উপজেলায় ইতিমধ্যে ৩৬টি সৌরবিদ্যুৎচালিত পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় তিনটি, কোটচাঁদপুরে একটি এবং মহেশপুরে ৩২টি পাম্প রয়েছে। পর্যায়ক্রমে জেলার অন্যান্য এলাকাতেও সোলার পাম্প স্থাপনের কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) কারিগরি সহায়তায় রুরাল রিকনস্ট্রাকশন ফাউন্ডেশনের (আরআরএফ) বাস্তবায়নাধীন ‘স্মার্ট’ প্রকল্পের আওতায় এসব সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচ পাম্প স্থাপন করা হচ্ছে।
সোলার পাম্প ব্যবহারকারী কৃষকরা জানান, প্রচলিত ডিজেলচালিত সেচ ব্যবস্থার তুলনায় এ পাম্প পরিচালনায় খরচ কম। ফলে নিজেদের জমিতে সেচ দেওয়ার পাশাপাশি অন্য কৃষকদের জমিতে পানি সরবরাহ করে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মহেশপুরের সীমান্তবর্তী এলাকায় ফুলচাষিদের জন্য এ উদ্যোগ নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
ঝিনাইদহ সদর উপজেলার কৃষক হাবিবুর রহমান বলেন, সোলার পাম্প স্থাপনে তার ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে আরআরএফের ‘স্মার্ট’ প্রকল্প থেকে ৪৫ হাজার টাকা অনুদান পেয়েছেন তিনি।
মহেশপুরের কৃষক সাদিকুল রহমান বলেন, সীমান্তবর্তী এলাকায় আরআরএফ প্রথমবারের মতো ফুলচাষিদের নিয়ে কাজ করছে। প্রকল্পের ঋণ ও অনুদানের মাধ্যমে তিনি সোলার পাম্প স্থাপন করেছেন। নিজের জমিতে সেচ দেওয়ার পাশাপাশি আরও ১৫ বিঘা জমিতে সেচ দিচ্ছেন।
ফুলচাষি গফুর মিয়া বলেন, সৌরচালিত পাম্প স্থাপনের পর তেল ও বিদ্যুতের খরচ হচ্ছে না। নিজের জমির সেচের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বাড়তি আয় করতে পারছি।
আরআরএফের সিনিয়র সহকারী পরিচালক কৃষিবিদ ড. অসিত বরণ মণ্ডল বলেন, পিকেএসএফের সহায়তায় ‘স্মার্ট’ প্রকল্পের মাধ্যমে ইতিমধ্যে ৩৬টি সোলার পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। সামনে আরও ১০০টির বেশি পাম্প স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, আগে এক বিঘা জমিতে সেচ দিতে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা খরচ হতো। সোলার পাম্পে খরচ হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকা। এতে কৃষকদের সেচ খরচ কমার পাশাপাশি পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবও কমবে।
ঝিনাইদহ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক কামরুজ্জামান বলেন, সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে কৃষকদের সোলার পাম্প দেওয়া হচ্ছে। এটি কেবল শুরু। শুরুতেই কৃষিকাজের সেচব্যবস্থা সহজ হয়েছে। বিদ্যুৎচালিত পাম্পের তুলনায় সোলার পাম্পে খরচ অনেক কম হওয়ায় কৃষকরা লাভবান হচ্ছেন।