‘দিনেরাতে ছয়-সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৭-১৮ ঘণ্টাই থাকে না। বিদ্যুতের এত খারাপ অবস্থা গত ১০-১২ বছরেও দেখি নাই, একবার গেলে তিন-চার ঘণ্টায়ও আসে না। এলেও কিছুক্ষণ থেকে আবার চলে যায়। রাতের বেশিরভাগ সময় অন্ধকারে থাকি। গরমে ঘুমানো যায় না। ছেলেমেয়েরাও লেখাপড়া করতে পারে না।’ কথাগুলো বলেছেন ময়মনসিংহ সদরের গোপালনগর গ্রামের ভ্যানচালক নাসির উদ্দিন।
এমন বক্তব্য শুধু নাসির উদ্দিনের নয়, পুরো জেলার মানুষের একই কথা। শহরে ৮-১০ লোডশেডিং দেওয়া হলেও গ্রামাঞ্চলে ১৭-১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন তারা।
বেশিরভাগ লোকজন বলছেন, এমন ভয়াবহ লোডশেডিং গত কয়েক বছরে দেখেননি তারা। ফলে জনজীবন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গ্রামের সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও ব্যবসায়ীরা এই অসহনীয় পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন। তীব্র গরমের মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের রাত কাটছে ঘুমহীন, যা জনস্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
কৃষক, ব্যবসায়ী ও খামারিরা বলছেন, বিদ্যুতের অভাবে কৃষিকাজে সেচ দেওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। পোল্ট্রি, ডেইরি ও মৎস্য খামারে অক্সিজেন ও তাপমাত্রা ধরে রাখতে না পারায় ব্যাপক লোকসান হচ্ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লোকসান হচ্ছে। কলকারখানা ও শিল্পখাতের উৎপাদন প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে।
স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্যমতে, বুধবার (১২ আগস্ট) ময়মনসিংহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায় তিন থেকে চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ লোডশেডিং দেওয়া হয়। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের এই কথা মিথ্যা বলছেন নগরের বাসিন্দারা। তারা বলছেন, শহরে ৮-১০ লোডশেডিং দেওয়া হচ্ছে। তিন-চার ঘণ্টা লোডশেডিং দেওয়া হলে তাদের এত ভোগান্তি হতো না। বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন মিথ্যা কথা বলছেন।
ভোগান্তির কথা জানিয়ে ময়মনসিংহ নগরীর কাঁচিঝুলি এলাকার বাসিন্দা ও নারী উদ্যোক্তা শেফালী আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগে তো এক থেকে দুবার লোডশেডিং ছিল। বুধবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত আমাদের এলাকায় চার বার লোডশেডিং দেওয়া হয়েছে। আর রাতেও চার বার লোডশেডিং ছিল। প্রতিবারই ছিল এক ঘণ্টা করে লোডশেডিং। এর সঙ্গে বাসায় গ্যাস সংকট লেগেই আছে। একদিকে লোডশেডিং অন্যদিকে গ্যাস নেই। কীভাবে রান্নাবান্না করবো। কোনোভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। এই সংকট কবে শেষ হবে, কেউ কিছু বলছেও না। কোনও ভালো খবরও পাচ্ছি না। এভাবে বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
বিদ্যুৎ সংকটে একই কষ্টের কথা জানিয়েছেন নগরীর চরপাড়ার বাসিন্দা শহীদ মিয়া। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় বাসাবাড়িতে থাকা মুশকিল হয়ে পড়েছে। রাতেও কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যায়। এরপর আর ঘুমাতে পারি না। ছেলেমেয়ের লেখাপড়া ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গত কয়েক বছরে তো আমরা বিদ্যুতের এত চরম সংকট দেখি নাই। হঠাৎ এমন হলো কেন, আসলে কোনও ঝামেলা আছে।’
ময়মনসিংহ সদরের চোরখাই এলাকার বাসিন্দা কামরুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এক মাস আগেও দিনেরাতে ছয়-সাত ঘণ্টা গ্রামে থাকতো না। এখন একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে তিন-চার ঘণ্টায়ও আসে না। বর্তমানে বিদ্যুৎ কখন চলে যায় সেটা বড় কথা নয়, কখন আসে সেটাই বড়। কারণ মাঝেমধ্যে আসে বিদ্যুৎ।’
ময়মনসিংহ সদরের গোপালনগর গ্রামের মুরগির খামারি আবুল কালাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় খামারে মুরগি লালন পালন করাটা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় মুরগি স্ট্রোক করে মারা যাচ্ছে। বিদ্যুৎ সংকটে অনেক খামারে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।’
সংকট কবে কাটতে পারে জানতে চাইলে ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী গোলাম হায়দার তালুকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ময়মনসিংহ বিভাগে তিনটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের মধ্যে আরপিসিএল যেখানে ২১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হওয়ার কথা, সেখানে গ্যাস সংকটের কারণে উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। এ ছাড়া ইউনাইটেড ময়মনসিংহ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে ২০০ মেগাওয়াট উৎপাদন হওয়ার কথা, সেখানে উৎপাদন হচ্ছে ১২০ মেগাওয়াট। এ ছাড়া ইউনাইটেড জামালপুর কেন্দ্রে ১৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন হওয়ার কথা, সেখানে উৎপাদন হচ্ছে ৬০ মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণেই লোডশেডিং বেড়েছে কয়েকগুণ। তবে লোডশেডিং সহনীয় পর্যায়ে আনার জন্য চেষ্টা চলছে।’









