শিক্ষানগরী ময়মনসিংহের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ আনন্দ মোহন কলেজ শতবর্ষ পেরিয়ে এখন আনন্দ মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রূপান্তরিত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কলেজটির শিক্ষা ও অবকাঠামোয়ও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। জীর্ণ অ্যাকাডেমিক ভবনের জায়গায় গড়ে উঠেছে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর বহুতল ভবন। মান্ধাতা আমলের শ্রেণিকক্ষের পরিবর্তে চালু হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে পাঠদান। পুরোনো ল্যাবের মরচে ধরা যন্ত্রপাতির জায়গা নিয়েছে আধুনিক সরঞ্জাম।
কলেজ কর্তৃপক্ষের নেতৃত্ব, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুসম্পর্ক এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশে প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক কর্মকাণ্ডে এসেছে নতুন গতি। এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের ফলাফলেও। গত বছর অনার্স ও মাস্টার্স ফাইনাল পরীক্ষায় রেকর্ডসংখ্যক শিক্ষার্থীর সাফল্য কলেজটির শিক্ষা কার্যক্রমের অগ্রগতির প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনসহ (পিএসসি) বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও আনন্দ মোহন কলেজের শিক্ষার্থীদের সাফল্য রয়েছে।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীদের কাছে ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সিঁড়ি বেয়ে যুগের পর যুগ তৈরি করেছে অসংখ্য কৃতী ও খ্যাতিমান মানুষ।
প্রতিষ্ঠার পেছনে আনন্দ মোহন বসুর উদ্যোগ
স্থানীয় সূত্র জানায়, ভারতীয় উপমহাদেশের বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও ময়মনসিংহের ইতিহাস-ঐতিহ্যের উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব আনন্দ মোহন বসু ১৯০৮ সালে আনন্দ মোহন কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় ২৬ বিঘা জমি দান করেন ময়মনসিংহ শহরের প্রথম মুসলমান গ্র্যাজুয়েট মৌলভী হামিদ উদ্দিন। ওই জমিতে অ্যাকাডেমিক ভবন, ছাত্রাবাস, পুকুর, খেলার মাঠ এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়।
প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ঢাকার বাইরে আনন্দ মোহন কলেজের বিশেষ খ্যাতি ছিল। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ কবীর চৌধুরী, সৈয়দ বদর উদ্দিন হোসাইন, ড. মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন, সিরাজুল ইসলাম, আব্দুল আজিজ ও অধ্যাপক শামসুল ইসলামসহ অনেক স্বনামধন্য শিক্ষক এখানে অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছেন।
মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ অনেক খ্যাতিমান ব্যক্তি এ কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। বিশিষ্ট কবি নির্মলেন্দু গুণ, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ সরকার ও প্রশাসনের উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তা ছিলেন এই কলেজের শিক্ষার্থী।
২২ বিভাগে ৩২ হাজার শিক্ষার্থী
বর্তমান অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম শামসুজ্জামান দায়িত্ব নেওয়ার পর কলেজটির সার্বিক কর্মকাণ্ডে আরও গতি এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুসম্পর্ক তৈরি, পড়াশোনার সুষ্ঠু পরিবেশ এবং ক্যাম্পাসের সার্বিক উন্নয়নে তার নেতৃত্বে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম শামসুজ্জামান জানান, শত বছরের বেশি পুরোনো এই কলেজে বর্তমানে অনার্স ও মাস্টার্সসহ ২২টি বিভাগ চালু রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজার। এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী থাকা সত্ত্বেও কলেজে কোনও ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই দাবি করে তিনি বলেন, এখানে তেমন কোনও কোন্দল বা দলাদলি নেই। কলেজে দুই শতাধিক শিক্ষক এবং ১৬২ জন কর্মচারী রয়েছেন। এসব কারণে শিক্ষার্থীরা নিবিড়ভাবে পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারছেন, যার প্রভাব ভালো ফলাফলেও পড়ছে।
কলেজছাত্রী শিউলি বলেন, তুলনামূলক কম খরচে ভালো পরিবেশে পড়াশোনা করে এখানকার শিক্ষার্থীরা পিএসসিসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সফল হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের কাছে আনন্দ মোহন কলেজ ‘অক্সফোর্ড’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
প্রতিটি বিভাগে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম
কলেজের শিক্ষা কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে আধুনিক প্রযুক্তি। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি বিভাগে চালু করা হয়েছে মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম। প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে একটি করে ল্যাপটপ ও দুটি করে প্রজেক্টর রয়েছে। রয়েছে ইন্টারনেট সুবিধাও।
কলেজের সমৃদ্ধ লাইব্রেরিতে রয়েছে প্রায় ৪৮ হাজার বই। লাইব্রেরিটিকে ডিজিটাল করার প্রক্রিয়া চলছে। এর বাইরে প্রতিটি বিভাগের সেমিনার কক্ষে রয়েছে আলাদা লাইব্রেরি, যেখানে শিক্ষার্থীদের চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন বই রাখা হয়েছে।
উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে আইটি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা করতে তৈরি করা হয়েছে আধুনিক ‘ড্রিংকিং জোন’। রয়েছে আধুনিক ও রুচিশীল ক্যানটিন, যেখানে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনীয় লেনদেনের জন্য কলেজে ব্যাংকের আলাদা বুথ চালু করা হয়েছে। চিকিৎসাসেবার জন্য ছাত্রদের জন্য পুরুষ চিকিৎসক এবং ছাত্রীদের জন্য নারী চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
আবাসিক ও পরিবহন সুবিধায় সংকট
আধুনিকায়নের নানা উদ্যোগের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের আবাসিক ও পরিবহন সুবিধা নিয়ে রয়েছে সীমাবদ্ধতা। শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করে বলেন, বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর তুলনায় আবাসিক সুবিধা খুবই সীমিত। মেয়েদের জন্য একটি এবং ছেলেদের জন্য মাত্র দুটি হল রয়েছে।
পরিবহন ব্যবস্থাতেও একই সংকট। প্রায় ৩২ হাজার শিক্ষার্থীর জন্য চালু রয়েছে মাত্র চারটি বাস। কলেজ কর্তৃপক্ষ অবশ্য এসব সমস্যা সমাধানে জোর চেষ্টা চালাচ্ছে বলে জানিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের পরীক্ষায় যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে ছাত্রদের আবাসিক হোস্টেলে বিকল্প গেট ও সড়কের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, জরুরি পরিস্থিতিতে ১৪৪ ধারা জারি থাকলেও যাতে পরীক্ষা গ্রহণে কোনও প্রতিবন্ধকতা তৈরি না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই এসব ব্যবস্থা করা হয়েছে।
বদলে গেছে রাতের ক্যাম্পাস
স্থানীয়রা বলছেন, কলেজ ক্যাম্পাসের সারি সারি পাম ট্রি, দেবদারু ও ক্রিসমাস ট্রির শ্যামল-শীতল ছায়া পরিবেশকে করেছে আরও মনোরম। এর সঙ্গে নতুন নতুন বহুতল অ্যাকাডেমিক ভবন নির্মাণ এবং শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখায় কলেজটির পড়াশোনার মানও বাড়ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় রাতের বেলায় যে ক্যাম্পাস অনেকটা ভুতুড়ে পরিবেশে থাকতো, যোগ্য নেতৃত্ব ও পরিকল্পনার ফলে সেটি এখন শুধু আলোঝলমলই নয়, বছরজুড়ে প্রাণবন্তও থাকে।
শতবর্ষের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও কৃতী মানুষের স্মৃতিকে ধারণ করে আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে আনন্দ মোহন কলেজ। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর আবাসন ও পরিবহন সংকটসহ কিছু চ্যালেঞ্জ থাকলেও শিক্ষা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠানটি ময়মনসিংহ তথা দেশের উচ্চশিক্ষায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করছে।









