সুন্দরবনে দফায় দফায় আগুন: চরম সংকটে বনজীবীরা

খুলনা প্রতিনিধি
২৪ মে ২০১৬, ১৮:০০আপডেট : ২৪ মে ২০১৬, ১৯:১৪

সুন্দরবনে কয়েক দফা অগ্নিকাণ্ডের কারণে বেশি বেকায়দায় পড়েছেন বন নির্ভরশীল ব্যক্তিরা। শরণখোলা-মোড়েলগঞ্জে বনজীবী মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে। বনজ সম্পদ লুট ও অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করানো না গেলেও হয়রানির শিকার হচ্ছেন এলাকার নিরীহ ব্যক্তিরা। একদিকে জীবিকার সন্ধানে তাদের জঙ্গলে যাওয়া বন্ধ, অন্যদিকে হয়রানির ভয়ে পালিয়ে বেড়ানো এই দুয়ে মিলে উভয় সংকটে পড়েছেন তারা।

সুন্দরবনে আগুন

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গ্রেফতার এড়াতে উত্তর রাজাপুর গ্রামের স্কুলছাত্র রবিউল, জসিম, পাশান ও কলেজছাত্র কামালসহ অনেকে এলাকা ছেড়ে শহরে পালিয়েছে। এছাড়া পুলিশি হয়রানির ভয়ে বন সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দাদের ৪০ ভাগ পুরুষ তাদের পরিবার পরিজন ফেলে রেখে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। সুন্দরবন পাস পারমিট বন্ধ থাকার পরও বাড়িতে থাকতে পারছে না স্থানীয় পেশাজীবীরা।

মৎস্য ব্যবসায়ী ও উত্তর রাজাপুর এলাকার ইউপি সদস্য মো. জাকির হোসেন খান বলেন, এ যাবত সব অগ্নিকাণ্ডেই এলাকার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে আগুন নেভানোর কাজ করেছে। একটি স্বার্থান্বেষী চক্র সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সুন্দরবনে এমন নাশকতার আগুন দিয়ে খেলা করতে পারে। বন ধ্বংসের খেলায় যারাই মেতে উঠুক না কেন, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত।

শরণখোলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ্ আলম মিয়া বলেন, পুলিশ কেবল দুষ্কৃতকারীদের ধরতে অভিযান পরিচালনা করছে। সাধারণ মানুষকে কোনওভাবেই হয়রানি করা হচ্ছে না। সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ ছাড়া কাউকেই এই মামলায় হয়রানি করা হবে না। তিনি বলেন, বর্তমানে অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্তরা এলাকা ছাড়া রয়েছে। আর প্রকৃত বনজীবীরা বনে যেতে না পেরে হতাশার মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, এ পর্যন্ত অগ্নিকাণ্ডের সূত্র ধরে দুইজনকে গ্রেফতার করে জেল হাজতে পাঠানো হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বন সংলগ্ন কয়েকজন প্রভাবশালীর ইন্ধনে সুন্দরবনে দীর্ঘদিন ধরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে আসছে। এর আগে কখনোই তাদেরকে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি।

জানা গেছে, সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জে ১৫/২০টি বিল নিয়ন্ত্রণসহ ইজারা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করছে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। বিভিন্ন প্রজাতির মাছ শিকারসহ বনজ ও প্রাণিসম্পদ লুটপাটের উদ্দেশ্যে তারা নিয়ন্ত্রণ করে বনের অধিকাংশ এলাকা। অভিযোগ রয়েছে, কাঠ, মাছ, মধুসহ নানা রকম বনজ সম্পদ আহরণের অনুমতি নিয়ে বনে প্রবেশ করে অপরাধী চক্রের সদস্যরা বন ধ্বংসে মেতে ওঠে। এদের লাগাম টানতে না পারলে সুন্দরবন রক্ষা করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। বনজ সম্পদ লুট ও অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত স্থানীয়দেরকে সামনে দেখা যায় না এবং তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি কেউ দাঁড় করাতে পারে না।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ২০০৪ সাল থেকে গত এক যুগে সুন্দরবনে যে সব স্থানে আগুন লাগানো হয়েছে এ পর্যন্ত ওই সব জায়গা এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। জন্মায়নি নতুন কোনও গাছের চারাও। ওই সব স্থানে দেখা মিলছে না বন্য প্রাণীরও।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবনে ইতোমধ্যে বার বার আগুনে প্রায় ২৫ একর বনভূমির গাছ-পালা ছাই হয়েছে। আগুনের ক্ষত কাটিয়ে বনকে পুরনো রূপে ফেরাতে এক যুগেরও বেশি সময় প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

এছাড়া বনের ভেতরে প্রবেশ করে ৩/৪ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করলেও বিভিন্ন প্রজাতির লতা-গুল্ম ছাড়া তেমন কোনও উল্লেখযোগ্য গাছপালা চোখে পড়ে না। বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ আটকাতে এবং জলমহালগুলো (বিল) নিজ নিজ দখলে রাখাসহ ক্ষমতা জাহির করতে গত এক মাসে চার দফা অগ্নিকাণ্ড ঘটনা ঘটেছে।

বন বিভাগ স্থানীয় উত্তর রাজাপুর গ্রামের কিছু অসাধু ব্যক্তির বিরুদ্ধে তিনটি মামলা দায়ের করেছে। এসব মামলায় ১৭ আসামির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাত রয়েছে আরও ৮/১০ জন। থানা পুলিশ ওই আসামিদের ধরতে গিয়ে স্কুল ও কলেজগামী শিক্ষার্থীসহ এলাকার সাধারণ মানুষকে হয়রানি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বন সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা প্রবীণ এক মুক্তিযোদ্ধা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি সুন্দরবনে পেশাজীবীদের সঙ্গে কাজ করে সংসার সচল রেখেছেন। কিন্তু সম্প্রতি চার বার আগুন লাগার পর বনে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার কারণে তিনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

সুন্দরবন সুরক্ষার কাজে নিয়োজিত স্থানীয় পেশাজীবীদের সংগঠন পিপলস্ ফোরামের শরণখোলা শাখার সভাপতি আবুল আসলাম তুহিন বয়াতি বলেন, দুর্বৃত্তায়নের হাত থেকে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হলে যৌথবাহিনীর সহায়তায় বিশেষ টিম গঠন করে ২৪ ঘণ্টা বনে নজরদারির প্রয়োজন।

স্থানীয় মৎস্য ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেন, বন বিভাগের সব দুর্যোগের সময় পাশে থেকে কাজ করেছেন তিনি। অপরাধীদের চিহ্নিত করতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় গোপনে তদন্ত করা হচ্ছে।

পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তা মো. সাইদুল ইসলাম বলেন, অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে বনে প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ রয়েছে। পরিবেশ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কাউকেই বনে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তৎপর রয়েছে। স্থানীয় লোকজনও অপরাধীদের আইনের আওতায় নিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহায়তা করছে।

/এফএস/টিএন/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
গৃহবধূকে ধর্ষণ, ছাত্রদল নেতা গ্রেফতার
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
রাতে মেট্রোরেল চলাচলের সময় বাড়ছে
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
পঞ্চগড়ে ভাগনিকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও মামিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে মামলা
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
বাসায় ফিরে বিএনপি সরকারকে ধন্যবাদ জানালেন আ.লীগের আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম
বাড়লো বিদ্যুতের দাম