বরিশাল সদরে টিসিবির কার্যক্রম আশানুরূপ ছিল না। বরগুনার বেতাগীতে পণ্য উঠিয়েছেন মাত্র একজন। পটুয়াখালীতে দু’জন আর পিরোজপুরে ৩ জন পণ্য ওঠালেও ভোলায় কেউ টিসিবি’র পণ্য বিক্রি করেননি। ডিলারদের কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, দলীয় বিবেচনায় ডিলার নিয়োগ করেছে টিসিবি। তাই মূলধারার ব্যবসায়ীদের অনেকেই এ কর্মসূচির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তাই টিসিবি বরিশাল বিভাগে রমজানে পণ্য সরবরাহের ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য:
বরগুনা
বরগুনায় টিসিবির ডিলার মাত্র চারজন। বরগুনা জেলা শহরে কোনও ডিলার নেই। বরগুনার আমতলী উপজেলায় দুজন ও বেতাগী উপজেলায় একজন ও অন্য উপজেলায় একজন ডিলার রয়েছে। এরমধ্যে শুধু বেতাগী উপজেলার ডিলার পণ্য উঠিয়েছেন। আমতলীরসহ অন্য ডিলাররা পণ্য ওঠাননি।
আমতলী উপজেলার ডিলার সাখাওয়াত হোসেন সান্টু বলেন, চাহিদা মতো পণ্য পাওয়া না যাওয়ায় পরিবহন খরচ বেশি হয়, ফলে লাভ হয় না। আমতলীতে পণ্য আনতে ৫ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। এর পাশাপাশি ঘরভাড়া, লেবার খাটানো সব মিলেয়ে কোনও লাভ হয় না। তাই এ বছর মাল ওঠানো হয়নি। এছাড়া প্রতি বস্তার পণ্যতে ঘাটতি থাকে। কিন্তু সে ঘাটতির দায় আমাদের ওপরই পড়ে।
বেতাগী উপজেলার ডিলার মো. সেলিম খান তিনি বলেন, এ বছর বেতাগীতে রোজার মাসে টিসিবির পণ্যের চাহিদা ছিল ৩০ হাজার কেজি কিন্তু পেয়েছি মাত্র ১৮০০ কেজি। এর মধ্যে চিনি ৫০০ কেজি, তেল ২০০ কেজি, ছোলা ৮০০ কেজি, মসুর ডাল ২০০ কেজি। এ বছর পণ্য দিয়ে খরচ বাদে ব্যবসা হয়েছে মাত্র দুই হাজার টাকা। দোকান ভাড়া না নিয়ে নিজের ঘরের বারান্দায় বিক্রয় করা হয় বলে কিছু লাভ হয়। না হলে লাভ নয় বরং লোকসান হতো।
বরিশাল
টিসিবির বরিশাল অফিস প্রধান প্রতাপ কুমার জানান, বরিশাল অঞ্চল কার্যালয়ের অধীনে ১৫০ জন ডিলার রয়েছে। গত ২৯ মে থেকে ১৮ জুন পর্যন্ত ২৯ জন ডিলার গুদাম থেকে পণ্য উত্তোলন করেছেন। পর্যায়ক্রমে আরও ডিলাররা পণ্য উত্তোলন করবে বলে জানান টিসিবির বরিশাল অফিস প্রধান।
তিনি আরও বলেন, যারা পণ্য উত্তোলন করবে না তাদের ডিলারশিপ বাতিল করা হবে। পণ্য উত্তোলন না করায় গত বছর ৩৫ জনের ডিলারশিপ বাতিল করা হয়েছিল।
টিসিবির ডিলার মো. নাসিরউদ্দীন জানান, আমাদেরকে নির্দিষ্ট করে যে পরিমাণ পণ্য দেওয়া হচ্ছে তাতে চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। রোটেশন করে পণ্য বিক্রি করায় সপ্তাহে বড় জোর দুদিন ভাগে পাচ্ছেন প্রতি ডিলার। প্রতি ডিলারকে ৩শ’ লিটার তেল, ৩শ কেজি চিনি, মসুর ডাল ২শ কেজি, ছোলা বুট ৪শ কেজি নির্ধারণ করে দেওয়া হচ্ছে।
বরিশাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আওয়ামি লীগ নেতা সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ দিয়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। টিসিবির নেটওয়ার্ক বাড়াতে হবে এবং তার ডিলারশিপ দিতে হবে সত্যিকার ব্যবসায়ীদেরকেই। পণ্যের যোগান দিতে হবে বাজারের চাহিদা অনুযায়ী।
বরিশাল বিভাগের জেলাভিত্তিক টিসিবি ডিলার ও তাদের কার্যক্রম
জেলা | ডিলারের সংখ্যা | পণ্য তুলেছেন | পণ্য তোলেননি |
বরগুনা | ৪ জন | ১ জন | ৩ জন |
বরিশাল | ৭৬ জন | ২৯ জন | ৪৭ জন |
পটুয়াখালী | ২ জন | ২ জন | ০ |
পিরোজপুর | ১৫ জন | ৩ জন | ১২ জন |
ভোলা | ১৪ ( আটজনের ডিলারশিপের মেয়াদ উত্তীর্ণ। ) | ০ | ০ |
ভোলা
জেলার সাত উপজেলার মধ্যে মনপুরায় টিসিবির কোনও ডিলার নেই। বাকি ৬ উপজেলায় ১৪ জন ডিলার রয়েছেন। এর মধ্যে আটজনের ডিলারশিপের মেয়াদ উত্তীর্ণ। তারা টিসিবি থেকে কোনও পণ্য উত্তোলন করছেন না । অবশিষ্ট যে ছয়জন ডিলার রয়েছেন তারাও টিসিবি থেকে কোনও পণ্য উত্তোলন করছেন না।
ভোলায় টিসিবির কোনও অফিস নেই, এমনকি কোনও কর্মকর্তা বা প্রতিনিধিও নেই। টিসিবির আঞ্চলিক অফিস বরিশালে। বরিশাল থেকেই এ অঞ্চলের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
ভোলা সদরে টিসিবির ডিলার আহমেদ ট্রেডার্সের মালিক সুলতান আহমেদ জানান, টিসিবির পণ্যের মান ভাল না এবং বরাদ্দও দেওয়া হয় কম। এই পণ্য এনে বিক্রিও হয় না, লাভও হয় না। তাই তিনি এখন টিসিবির পণ্য তোলেন না। তার ডিলারশিপের মেয়াদ গত ৩১ ডিসেম্বর উত্তীর্ণ হয়েছে। তিনি এখন নবায়ন করতেও আগ্রহী নন।
ভোলা জেলা প্রশাসকের দফতরে টিসিবির ফাইল দেখেন জেলা নাজির আবদুল মান্নান চৌধুরী। তিনি জানান, টিসিবির ডিলারদের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা পণ্য উত্তোলনের জন্য একাধিকবার বৈঠক করেছেন। কিন্তু নিম্ন মানের পণ্য ও পণ্য উত্তোলন করলে ব্যবসায়িক লোকসান হয় এই অজুহাতে তারা পণ্য উত্তোলন করছেন না।
পটুয়াখালী
পটুয়াখালী জেলার শুধু সদর উপজেলায় টিসিবির ২টি ডিলার রয়েছে। অন্য উপজেলায় কোনও ডিলার নেই। এদের মধ্যে সবাই টিসিবির পণ্য উঠিয়েছেন।
টিসিবির পণ্য উঠিয়েছেন এমন একজন ডিলারের বক্তব্য, পণ্যের মান ভাল ছিল। ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য পাওয়া যায় নি। অনেক ক্রেতা পণ্য না পেয়ে ফিরে গেছে। টিসিবির পণ্য বরিশাল থেকে ওঠাতে হয়, সড়ক পথে পণ্য পরিবহনে গাড়িভাড়া অনেক বেশি পড়ে তাই নামমাত্র লাভ হয়। ক্রেতাদের কাছে ছোলা বুট ও চিনির চাহিদা সবচেয়ে বেশি, চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ খুবই অল্প।
গুণগত পণ্যের পরিমাণ বাড়িয়ে সাধারণ জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দাবি জানান, মতিয়ার রহমান সিকদার, সভাপতি, চেম্বার অব কমার্স পটুয়াখালী।
পিরোজপুর
পিরোজপুর জেলায় কাগজে কলমে টিসিবির ডিলারের সংখ্যা ১৫ জন। এর মধ্যে পিরোজপুর সদরে ৩ জন, জিয়ানগরে ৪ জন, নাজিরপুরে ২ জন, কাউখালীতে ৩ জন, মঠবাড়ীয়া ২ জন ও ভান্ডারিয়ায় ১ জন। এদের মধ্যে জিয়ানগরের ৩ জন ডিলার টিবিসির পণ্য উত্তোলন করেছেন।
পিরোজপুরে টিসিবির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয় খুলনা থেকে। টিসিবির খুলনা বিভাগীয় কার্যালয়ের প্রধান রুবেল মোর্শেদ জানান, পিরোজপুরের ১০ জন ডিলার তাদের অনুমোদনপত্র নবায়ন করেননি। যারা অনুমোদনপত্র নবায়ন করেননি তাদের লাইসেন বাতিরের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।
পিরোজপুর সম্মিলিত ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আতাউর রহমান শেখ আলম বলেন, দলীয় বিবেচনায় টিসিবির ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যে কারণে অনেক বিষয়ে আমরা কথা বলতে পারি না।
/এইচকে/বিটি/আপ-এসটি
এ সংক্রান্ত আরও সংবাদ:
রোজায় ১৮ জেলায় পৌঁছায়নি টিসিবি’র পণ্য
রংপুর অঞ্চলের ডিলারদের অভিযোগ: ব্যাপক চাহিদা তবুও বন্ধ করা হয়েছে পণ্য সরবরাহ
চট্টগ্রামের ৬ জেলার মানুষ পাননি টিসিবি’র কোনও পণ্য
খুলনা অঞ্চলে পণ্য তুলেছেন মাত্র ২৩ শতাংশ ডিলার, দেওয়া হয়নি তেল-খেজুর








