খেটে খাওয়া মানুষদের কাছে তারা ধর্মের বাণী প্রচার করতেন। কিন্তু, এর আড়ালে চালাতেন জঙ্গি তৎপরতা। নারী হওয়ায় কেউ সন্দেহ করবে না এমন বিশ্বাসে সিরাজগঞ্জের একটি টিনশেড বাসা ভাড়া নিয়ে সপরিবারে খুব গোপনে দলে নতুন সদস্য বাড়ানোর চেষ্টাও চালাচ্ছিলেন চার নারী। কিন্তু, সে চেষ্টা সফল হয়নি তাদের। শনিবার গভীর রাতে সেই ভাড়া বাসায় সাংগঠনিক গোপন বৈঠক করার সময় এই চার নারীকে আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।এরপর ঘরে তল্লাশি চালিয়ে পাওয়া যায় ১৩টি জেহাদি বই, ৬টি তাজা ককটেল ও ৪টি গ্রেনেড তৈরির খোল ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম। পুলিশের দাবি, এই চার নারী নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামআতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি)’র সদস্য। তাদের আটকের পর এবার তাদের স্বামী ও স্বজনদের খুঁজছে পুলিশ।

পুলিশ জানিয়েছে, শনিবার গভীর রাতে সিরাজগঞ্জ জেলা শহরের মছিমপুর মহল্লার হুকুম আলীর ভাড়া দেওয়া টিনশেড বাড়ি থেকে তাদের আটক করা হয়। এ সময় তাদের ঘর থেকে ১৩টি জেহাদি বই, ৬টি তাজা ককটেল, ৪টি গ্রেনেড তৈরির খোল ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। তাদের পুলিশ সুপার কার্যালয়ের ডিবি পুলিশ সেলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
পুলিশ আরও জানায়, এ অভিযানে নেতৃত্ব দেন পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ। গত মে মাস থেকে বাড়ি ভাড়া নিয়ে পুলিশের চোখকে ফাঁকি দিয়ে জেলা শহর ও আশেপাশের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মধ্যে ধর্ম প্রচারের নামে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল।
ডিবির দাবি, এরা নিষিদ্ধ ঘোষিত জেএমবি’র সক্রিয় নারী সদস্য। তাদের প্রত্যেকের স্বামী ছোটখাট ব্যবসা বাণিজ্য করে। এদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাস বিরোধী ও বিস্ফোরক আইনে দু’টি পৃথক মামলার প্রস্তুতি চলছে বলেও ডিবি পুলিশ সূত্রে জানা গেছে।
এর আগে জেএমবির আরও ৯ জন সন্দেহভাজন সদস্যকে আটক করে ডিবি পুলিশ। এ নিয়ে ডিবি পুলিশের হাতে রবিবার পর্যন্ত নারী ও পুরুষ মিলে মোট ১৩ জন সন্দেহভাজন জেএমবি সদস্য আটক হন।
জেলা শহরের ভেতরে বসেই জেএমবির এসব সক্রিয় নারী সদস্য গত ৩ মাস থেকে পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কিভাবে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে, এ নিয়ে পেশাজীবী ও শহরবাসীর মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এদিকে, এসব নারী ধর্মের নাম ব্যবহার করে রহস্যজনক সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা নিয়ে শনিবার জেলার আইন-শৃঙ্খলা সভায় আলোচনার ঝড় উঠে।
ওই সভার প্রধান অতিথি স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং ১৪ দলের সমন্বয়ক মোহাম্মদ নাসিমের কাছে স্থানীয় সাংসদ প্রফেসর হাবিবে মিল্লাত মুন্নাসহ জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা অভিযোগ উত্থাপন করেন।
রবিবার ভোররাতে ডিবির হাতে আটক জেএমবির সন্দেহভাজন নারী সদস্যরা হলেন, সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার সলঙ্গা থানার বাদুল্লাপুর গ্রামের মো. মাহবুবুর রহমানের স্ত্রী নাদিরা তাবাসুম রানী (৩০), বগুড়া জেলার শাহজাহানপুর উপজেলার ক্ষুদ্র-ফুলকোট গ্রামের খালিদ হাসানের স্ত্রী হাবিবা আকতার মিশু (১৮), পরানবাড়িয়া গ্রামের সুজন আহম্মেদ বিজয়ের স্ত্রী রুমানা আকতার রুমা (২১) এবং গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ জেলার বোঁচাদহ দক্ষিণপাড়া গ্রামের মামরুল ইসলাম সর্দার মামুনের স্ত্রী রুনা বেগম (১৯)।
সিরাজগঞ্জ ডিবি পুলিশের সেকেন্ড অফিসার রওশন আলী জানান, এরা দীর্ঘদিন থেকে গোপনে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন, এমন গোপন তথ্যের ভিত্তিতেই জেলা শহরের মাছিমপুর মহল্লার হুকুম আলীর ভাড়ার বাড়িতে রবিবার ভোর রাতে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এদের ঘরে বড় একটি স্টিলের ট্রাংকে রাখা লাল টেপ দিয়ে মোড়ানো ৬টি তাজা ককটেল, ৪টি গ্রেনেডের লোহার খোলকসহ সার্কিট, সুইচবোর্ড, ডেটোনেটর, কানেক্টরসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম, ১৩টি বিভিন্ন লেখকের জেহাদি বই উদ্ধার করা হয়।
ডিবির ওসি ওয়াহেদুজ্জামান বলেন, এরা জেএমবির সক্রিয় নারী সদস্য। গত ৩ মাস ধরে ওই ভাড়া বাসায় অবস্থান করে সিরাজগঞ্জসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে জেএমবির সদস্য সংগ্রহ ও সাংগঠনিক এবং নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল। বিভিন্ন জেলার নারী সদস্যরা রাতে সাংগঠনিক গোপন সভা পরিচালনার সময় পুলিশ সুপারের নেতৃত্বে ডিবি পুলিশ সেখানে অভিযান চালিয়ে তাদের আটক করে।
পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে এরা দীর্ঘদিন থেকে কিভাবে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছিল এমন প্রশ্নের জবাবে পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন আহম্মেদ বলেন, এদেরকে দীর্ঘদিন থেকে পুলিশি নজরদারিতে রাখা হয়েছিল। তাদেরকে নজরদারির মধ্যে রেখে অপেক্ষা করা হচ্ছিল। অবশেষে রবিবার ভোর রাতে তাদের হাতেনাতে আটক করা হয়। এদের স্বামী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের খুঁজে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তাদের বিরুদ্ধে জেএমবি সম্পৃক্ততা পেলে মামলায় অভিযুক্ত করা হবে বলেও পুলিশ সুপার আরও জানান।
/টিএন/
আরও পড়ুন:








