কুড়িগ্রামে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও নিম্নাঞ্চলের অনেক বাড়ি-ঘর থেকে এখনও পানি নামেনি। আর যেসব এলাকার পানি নেমে গেলেও বাড়িতে ফিরতে পারছেন না অনেক পরিবার। তাই বাধ্য হয়েই এখনও বাঁধ ও পাকা সড়কে মানবেতর জীবন-যাপন করছেন তারা।
আর বন্যা কবলিত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে ডায়রিয়া চর্ম রোগসহ পানিবাহিত নানা রোগ। বন্যা দুর্গতদের জন্য জেলায় ৮৬টি মেডিক্যাল টিম কাজ করলেও দুর্গম এলাকার মানুষ দেখা পাচ্ছেন না তাদের।
বন্যা কবলিত এলাকা গুলোতে কোনও কাজ না থাকায় গত এক মাস ধরে কৃষি কাজে নিয়োজিত দিনমজুররা কর্মহীন জীবনযাপন করছেন। ফলে খাদ্য সংকট আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
জেলা প্রশাসন পর্যাপ্ত ত্রাণের কথা বললেও ৬ লাখ বানভাসিদের সবার কাছে এখনও ত্রাণ পৌঁছায়নি। বেসরকারিভাবে বিভিন্ন উন্নয়ন সংগঠন ত্রাণ বিতরণ করলেও তা পর্যাপ্ত না। এদিকে, কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার বানভাসি অনেকে বসত বাড়িতে ফিরতে শুরু করলেও ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন।
সরেজমিনে চিলমারী উপজেলার রমনা ও থানাহাট ইউনিয়নে বানভাসিদের সঙ্গে কথা বলে এমন অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়।
এসব ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, এখনও অনেক পরিবারের ঘর বাড়ি থেকে পুরোপুরি পানি নেমে যায়নি। বাড়ির টিউবয়েল ও টয়লেট পানিতে ডুবে আছে। কিছু বাড়ি-ঘর থেকে পানি নেমে গেলেও বাড়ির আঙ্গিনায় কাদা দেখা গেছে। ফলে বন্যার পানি কমলেও বিড়ম্বনা বেড়েছে বানভাসিদের।
এদিকে চিলমারী উপজেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের সূত্র মতে, উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের ৩০ হাজার ৯শ’ পরিবারের মধ্যে প্রায় ২৯ হাজার ৮শ’ পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এর মধ্যে ২২ হাজার পরিবারকে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মো. সিরাজুদ্দৌলা।
ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী এখনও প্রায় ৮ হাজার ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার কোনও ত্রাণ সহায়তা পায়নি। এখনও উপজেলা পরিষদ চত্ত্বরে ত্রাণের জন্য বানভাসিদের ভিড় করতে দেখা যাচ্ছে।
উপজেলার থানাহাট ইউনিয়নের আমিরাবাদ ছোট কুষ্টারী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পাকা রাস্তার ওপরে আশ্রয় নেওয়া পরিবারগুলো বাড়িতে ফিরছে। রাস্তার দুই ধারে ঘর-বাড়িগুলোতে এখনও পানি, কোনও বাড়িতে পানি না থাকলেও কাদা জমে রয়েছে। কিন্তু রাস্তার ওপর দিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে তাদেরকে বাড়িতে ফিরতে হচ্ছে।
রাস্তায় আশ্রয় নেওয়া হালিমা বেগম দীর্ঘদিন ধরে কোমরের সমস্যায় বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না। হাটাচলা করা তার সামর্থের বাইরে। ১৬ দিন ধরে রাস্তার ওপর বিছানা করে শুয়ে ছিলেন। টাকার অভাবে ওষুধ কিনতে পারছেন না। তার স্বামী সাইদুল কৃষি শ্রমিক। বন্যায় হাতে কোনও কাজ না থাকায় স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে পারছেন না। হালিমার অভিযোগ, তিনি কোনও ত্রাণ কিংবা চিকিৎসাসেবা পাননি।
তারই পাশে রাস্তার ওপর দুই সপ্তাহ ধরে ছেলে মেয়ে নিয়ে আছেন আব্দুস ছালাম। তার ৯ বছরের ছেলে ওসমান গণি ৭ দিন ধরে জ্বরে ভুগলেও জোটেনি কোনও চিকিৎসা সহায়তা। কোনও সাহায্য সহযোগিতা ছাড়াই তারা রাস্তা ছেড়ে বাড়ি ফিরে গেছেন।
দিনমজুর ছক্কু মিয়ার স্ত্রী আরজিনা দুই শিশু সন্তান নিয়ে ১৫ দিন ধরে রাস্তায় চালা করে অবস্থান করেছেন। দুই সপ্তাহ ধরে স্বামী বেকার হয়ে আছে, ঘরে অসুস্থ শশুর। এদিকে, ঘরের জমা টাকাও শেষ হয়ে গেছে বন্যার শুরুতেই। কিন্তু বারবার ত্রাণের জন্য মেম্বার চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েও কোনও ত্রাণ পাননি। এখন বাচ্চাদের কি খাওয়াবেন আর অসুস্থ শশুরের চিকিৎসাই বা কেমন করে করাবেন, এই ভাবনায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন আরজিনা।
আর ঐ রাস্তায় আশ্রয় নেওয়া রশিদা বেগম ক্ষোভের সঙ্গে অভিযোগ করে বলেন, ‘এতদিন ধরে রাস্তায় থাকছি কিন্তু আমাদের জন্য খাবার পানি আর টয়লেটের কোনও ব্যবস্থাই করা হয়নি। এখনও বাড়ির পানি পুরাপুরি নামি যায় নাই, আমরা যে কেমন করি দিন কাটবার লাগছি শুধু আমরাই জানি।’
চিলমারী উপজেলার থানাহাট ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক মিলন জানান, বন্যার পানি নেমে যেতে বিলম্ব হওয়ায় এখনও অনেক পরিবারের বাড়ির আঙ্গিনায় কাদা-পানি রয়েছে।
চিকিৎসা সেবা না পাওয়ার অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, কেউ যদি মেডিক্যাল টিমের কাছে না আসে তাহলে কিছু করার নেই। সবার ঘরে ঘরে গিয়ে তো চিকিৎসা করা সম্ভব না।
চিলমারী উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শওকত আলী সরকার (বীর বিক্রম) জানান, তার উপজেলা পুরোটাই বন্যার পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। এখন পানি নেমে গেলেও অনেক পরিবারের ঘরবাড়িতে কাদা রয়েছে। ঘর বাড়ি স্বাভাবিক হতে আরও দুই একদিন সময় লাগবে। তবে তারা ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছেন।
বন্যা দুর্গতদের ত্রাণ ও চিকিৎসা সহায়তা না পাওয়ার বিষয়ে চিলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম জানান, জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া তিনি কোনও বক্তব্য দিতে পারবেন না। তবে বানভাসিরা ত্রাণ ও চিকিৎসা সেবা পেয়েও অস্বীকার করছেন।
এদিকে বন্যা দুর্গতের সহায়তা করতে সৈয়দপুর পৌরসভার পক্ষ থেকে কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক খান মো. নুরুল আমিনের কাছে ১ লাখ টাকার চেক তুলে দেন সৈয়দপুর পৌরসভার প্যানেল মেয়র শাহীন আহমেদসহ পৌর কাউন্সিলররা।
বুধবার দুপুরে তিনি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে চেক হস্তান্তর করেন। এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক আকতার হোসেন আজাদসহ জেলা প্রশাসনের অন্যান্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
/এসএনএইচ/আপ- এইচকে/
আরও পড়ুন:আজ নীলফামারী যাচ্ছেন তিন মন্ত্রী








