মুক্তিযুদ্ধে কলমই ছিল যাদের অস্ত্র

জাকিয়া আহমেদ
১৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ০০:৫৭আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০১৬, ০৩:২০

পিআইবির শহীদ সাংবাদিক স্মৃতিফলক উদয়ের পথে শুনি কার বাণী

          ভয় নাই ওরে ভয় নাই,

নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান

           ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।।

সিরাজুদ্দীন হোসেন, শহীদুল্লাহ কায়সার, খোন্দকার আবু তালেব, নিজামুদ্দীন আহমদ, এসএ মান্নান (লাডু ভাই), আ ন ম গোলাম মোস্তফা, সৈয়দ নাজমুল হক, আবুল বাশার, শিব সাধন চক্রবর্তী, চিশতী শাহ হেলালুর রহমান, মুহম্মদ আখতার, সেলিনা পারভীন এবং এ কে এম শহীদুল্লাহ (শহীদ সাবের)-সাংবাদিকদের অন্যতম সংগঠন প্রেসক্লাবের মূল ভবনে ঢোকার মুখেই একটি স্মৃতিচিহ্নে খোদাই করে লেখা রয়েছে এ নামগুলো। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পত্রিকার পাতায় মানুষের অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্টের কথা লিখেছিলেন তারা, তুলে ধরেছিলেন পাক বাহিনীর বর্বরতার চিত্র। যার কারণে পাক বাহিনীর নৃশংসতার শিকার হয়ে নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল এই বীর সাংবাদিকদের।  

বাবার কথা বলতে গিয়ে শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের ছেলে সাংবাদিক জাহীদ রেজা নূর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তিনি ছিলেন একজন স্বপ্নবান পুরুষ। পত্রিকার পাতায় স্বাধীন বাংলাদেশ নিয়ে স্বপ্নের কথা বলতেন তিনি। সবচেয়ে বড় কথা তিনি জানতেন, এই বাংলায় একদিন স্বাধীনতা আসবে।’ বাবার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জাহীদ রেজা নূর বলেন, ‘বাবা ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের কার্যনির্বাহী ও বার্তা সম্পাদক। তার জয় বাংলার জয়, চিনিল কেমনে, সুকুইজ্জা কডে, বিক্ষুদ্ধ নগরীর ভয়াল গর্জন, অবশেষে বাংলার ভাগ্যাকাশ হইতে বাস্তিলের কারাগার ধসিয়া পড়িয়াছে শিরোনাম দিয়ে লেখাগুলো আগুন ঝরাতো সেই সময়ে। তিনি প্রবাসী সরকারের কাছে পূর্ব পাকিস্তানের আমেরিকান কনস্যুলেটের গোপন প্রতিবেদনটি পাঠিয়েছিলেন, যেটি পরে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বারবার প্রচারিত হওয়ায় বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্ব জনমত গড়ে উঠতে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে।’ 

সিরাজুদ্দীন হোসেন নিজের পত্রিকা ইত্তেফাকে ‘ঠগ বাছিতে গাঁ উজাড়’ নামের একটি উপসম্পাদকীয় লিখতেন জানিয়ে জাহীদ রেজা নূর বলেন, ‘যার প্রেক্ষিতে জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন মুখপাত্র দৈনিক সংগ্রাম ‘অতএব ঠগ বাছিও না’ নামে আরেকটি লেখা লিখে তাকে হুমকি দিয়েছিল। কিন্তু তাকে থামানো যায়নি। যার কারণে শান্তিনগরের চামেলীবাগের বাসা থেকে ১০ ডিসেম্বরে তাকে ধরে নিয়ে যায় পাক বাহিনী এবং তাদের দোসর আলবদর। এরপর তার আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।’  

জাহীদ রেজা নূর বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে সাংবাদিকদের মধ্যে সিরাজুদ্দীন হোসেনের নাম উল্লেখ করে গেছেন। এমনকি পাকিস্তান কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে লন্ডন থেকে ফোন করে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চেয়েছিলেন, সিরাজকে নাকি ওরা মেরে ফেলেছে?’

শহীদ সাংবাদিক স্মৃতিফলক ক্ষণজন্মা সাহিত্যিক-সাংবাদিক শহীদ সাবের মারা যান পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দেওয়া আগুনে। ১৯৭১ সালের ৩১ মার্চ দৈনিক সংবাদ অফিসে যখন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আগুন লাগিয়ে দেয়, তখন সাংবাদিক একেএম শহীদুল্লাহ ওরফে শহীদ সাবের অফিসের ভেতরে বসে কাজ করছিলেন। অগ্নিদগ্ধ হয়ে সেখানেই তিনি মৃত্যুরবণ করেন। সেদিন সংবাদ অফিসের সব কিছুর সঙ্গে ছাই হয়ে যান এই সাংবাদিক, যার মৃতদেহ শনাক্তও করা যায়নি। ১৯৭২ সালে বাংলা একাডেমীর মরণোত্তর পুরস্কার লাভ করেন তিনি। স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদানের জন্য বাংলাদেশ ডাক বিভাগ ২ টাকা মূল্যের ডাকটিকিট প্রকাশ করে তাকে নিয়ে।

বাংলাদেশ তখন বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে। ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের মাত্র ৩ দিন আগে ১৩ ডিসেম্বর সিদ্ধেশ্বরীর বাসা থেকে সাংবাদিক সেলিনা পারভীনকে ধরে নিয়ে যায় পাক বাহিনী। সেলিনা পারভীন তার পত্রিকা শিলালিপি বিক্রির টাকা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করতেন। মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করায় পাকবাহিনীর নজরে পড়ে যান তিনি। বিজয়ের দুইদিন পর, ১৮ ডিসেম্বর রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে পাওয়া যায় গুলি আর বেয়নেটের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত সেলিনা পারভীনের মৃতদেহ।

বীর সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের হত্যার দায়ে আলবদর নেতা আলী আহসান মুজাহিদ ও মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। ফাঁসির দণ্ড মাথায় নিয়ে আরও দুজন পলাতক আছে জানিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সাধারণ মানুষকে প্রচার এবং বোঝানোর ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা বিশাল ভূমিকা পালন করেছেন। তারা লেখনীর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের মন, মগজ এবং মানসিকতায় বিচরণ করতে পারতেন। বুলেটের চাইতেও এসব লেখনী ছিল অনেক বড় অস্ত্র। পাকবাহিনীর কাছে তখন সাংবাদিকরা অনেক বড় টার্গেট ছিল। কারণ সাংবাদিকদের লেখনী চলে যাচ্ছিল গণমানুষের কাছে, গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। তাদের লেখা পড়েই মানুষ বুঝতে পারতো আমাদের দাবী কী, পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের দ্বন্দ্ব, কেন দরকার আমাদের নতুন রাষ্ট্রের। সাংবাদিকরা ছিলেন কলম সৈনিক। তাই মুজাহিদদের কাছে সাংবাদিকরা ছিল টার্গেট।’

শহীদ সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনসহ বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীকে হত্যার অপরাধে আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। একই অপরাধে আশরাফুজ্জামান খান, চৌধুরী মঈনুদ্দীন এবং মতিউর রহমান নিজামীরও ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়। মুজাহিদ এবং নিজামীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে ইতোমধ্যে। তবে আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মঈনুদ্দীনকে দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা সম্ভব হয়নি এখনো।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে নিহত ১৩ জন সাংবাদিককে নিয়ে গত বছর একটি বই প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউট (পিআইবি)। ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাংবাদিক’ নামে বইটির সম্পাদনা করেছেন পিআইবি’র মহাপরিচালক মো. শাহ আলমগীর।

শাহ আলমগীর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সাংবাদিকদের জন্য আলাদা কোনও ডকুমেন্ট ছিল না। আমরা চেষ্টা করেছি কিছু করার। নতুন প্রজন্ম, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকরা যেন তাদের সম্পর্কে জানতে পারে। এ কারণেই বইটি প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলাম আমরা।’

তিনি বলেন, ‘বইটি লেখার জন্য তথ্য চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছিলাম।  অনেকের সহযোগিতা, পিআইবির গবেষণা বিভাগ এবং শহীদ সাংবাদিকদের স্বজনদের সহযোগিতায় বইটি তৈরি করেছি। কিন্তু বইটি তৈরি করতে গিয়ে, সম্পাদনা করতে গিয়ে মনে হয়েছে অনেক গ্যাপ এখনো রয়ে গেছে, তথ্যগুলো পূর্ণাঙ্গ নয়, আরও কাজ করার বাকি আছে। আমরা আশা করছি, বইটির দ্বিতীয় সংস্করণ যখন হবে তখন সব গ্যাপ পূরণ করতে পারবো।’

শাহ আলমগীর বলেন, ‘ঢাকার বাইরের অনেক সাংবাদিকের কথা জানতে পেরেছি। কিন্তু তাদের সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাইনি। চেষ্টা করছি তাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নিয়ে বইটিতে যোগ করার। বইটিতে যে ১৩ জন সাংবাদিকের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, সেই ছবিগুলোও কিন্তু প্রেসক্লাব কিংবা আমাদের ইউনিয়নে নাই। আমরাই প্রথম ১৩ জনের ছবি জোগাড় করেছি।’

শহীদ সাংবাদিকদের স্মৃতি ধরে রাখতে বুধবার (১৪ ডিসেম্বর) শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ ভবনের একটি কক্ষে উদ্বোধন করা হয়েছে ‘শহীদ সাংবাদিক স্মৃতিফলক।’ সবুজ জমিনে লাল রক্তের স্রোত নেমে আসা এই ফলক উদ্বোধন করেন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু। এসময় তিনি বলেন, ‘এটি একটি মহৎ উদ্যোগ। দেরিতে হলেও আমাদের এ ধরনের কাজ করা দরকার, ইতিহাস সংরক্ষণ করা দরকার, ইতিহাসকে স্মরণ করা দরকার। তবেই কেবল নতুন প্রজন্ম নতুন ইতিহাস তৈরি করতে পারবে। শহীদ সাংবাদিকদের স্মৃতিফলক উন্মোচনের মধ্যে দিয়ে তাদের সম্মান জানানো হয়েছে, ইতিহাসকেও ধারণ করা হয়েছে।’

ছবি: নাসিরুল ইসলাম

/এএআর/

সম্পর্কিত
বিশ্বের সর্বোচ্চ শিখরে ফের উড়লো বাংলাদেশের পতাকা
অযত্ন-অবহেলায় সর্ববৃহৎ গণহত্যার স্থান, ৫৪ বছরেও হয়নি স্মৃতিসৌধ
নানা আয়োজনে রাজধানীবাসীর বিজয় উদযাপন
সর্বশেষ খবর
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
কুমিল্লায় এক শিশুকে ধর্ষণ ও আরেক শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগ
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
টিভিতে আজকের খেলা ( ৪ জুন, ২০২৬)
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
বিএনপির কর্মী খুন, জামায়াত নেতাসহ ১২ জনের বাড়িতে হামলা-ভাঙচুর
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
মন্ত্রিত্ব ছাড়া দীপেন দেওয়ান লিখলেন ‘বিএনপি আমার শেষ ঠিকানা’
সর্বাধিক পঠিত
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
ইউএনজিএ’র সভাপতি হিসেবে কী সুবিধা পাবেন খলিলুর রহমান, দায়িত্ব কী  
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
করদাতাদের জন্য ‘মাস্টারপ্ল্যান’, ২০৩১ পর্যন্ত করমুক্ত আয়ের সীমা কত হচ্ছে জানুন
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
খাবার মুখে দেওয়ার সময় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর চামচে ফুঁ দেওয়া লোকটি কে
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
ইউনিটপ্রতি কত বাড়লো বিদ্যুতের দাম
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক