কাজের আশায় আর দালালদের প্রলোভনে পড়ে ভারতে গিয়ে এখন বন্দি জীবন কাটাতে হচ্ছে বিলুপ্ত ছিটমহলের অভিবাসী অনেক নারী, পুরুষ, শিশুকে। ভারতে গিয়ে কাজ শেষে ফিরে আসার সময় দালালরাই কৌশলে তাদের ভারতীয় পুলিশ ও বিএসএফ-এর হাতে ধরিয়ে দিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর তাদের ঠাঁই হয় কারাগারে। তাদের ছাড়িয়ে আনতে দালালদের টাকা-পয়সাও দিয়ে যাচ্ছেন দেশে থাকা স্বজনরা। অনেকে এ টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন। তবে মুক্তি মেলেনি বন্দি বাংলাদেশিদের। কুড়িগ্রামের বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়া ও আশেপাশের গ্রামের লোকজন এমন দাবিই করছেন।
সরেজমিনে গিয়ে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাশিয়ারছড়ার কামালপুর গ্রামসহ কয়েকটি গ্রামের শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশু ভারতের বিভিন্ন জেলে আটক রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সাবেক ছিটমহল আন্দোলনের নেতা গোলাম মোস্তফাকে কারাগারে আটক ১০-১৫ জনের স্বজনেরা প্রায় তিন লাখ টাকা দিয়েছিলেন। তবে তারা মুক্তি পাননি।
স্থানীয়রা আরও জানান, কিছু দালাল সীমান্তবর্তী এলাকার নারী, পুরুষ ও শিশুদের ভারতের বিভিন্ন ইটভাটায় কাজ দেওয়ার কথা বলে কৌশলে কাঁটাতারের বেড়া পার করে দেয়। অনেকেই নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছুতে পারলেও কাজ শেষে ফেরার পথে ভারতীয় দালালেরা কৌশলে বাস ও রেল স্টেশনে পুলিশকে এবং সীমান্তে বিএসএফ দিয়ে তাদেরকে ধরিয়ে দেয়। এরপর তাদের অমানুসিক নির্যাতন চালিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়। এ সময় দালালরা ওইসব লোকজনের কাছ থাকা কষ্টার্জিত উপার্জন লুট করেও নিয়ে সটকে পরে। আটককৃতরা আইনি সহযোগিতা পাচ্ছে কিনা তাও জানেন না দেশে থাকা স্বজনরা।
আটককৃতদের পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালে জানুয়ারিতে উপজেলার কাশিপুর সীমান্ত দিয়ে শতাধিক বাংলাদেশিকে পাচার করে দালালরা। ভারতের আলিপুরদুয়ার, মাতাভাঙ্গা, মেখলিগঞ্জ, কোচবিহার, দিনহাটা, তুফানগঞ্জ, জলপাইগুড়ি সেন্ট্রাল জেল, শিলিগুড়ি, ইসলামপুর জেলে বালুরঘাট জেলে আটক রয়েছেন।
এমন কয়েকজন হলেন- ফুলবাড়ী উপজেলার দাশিয়ারছড়ার কামালপুর দেবীরপাঠের কুদ্দুস আলীর ছেলে সাইদুল হক (৩৮), তার স্ত্রী শাহিনুর বেগম (৩৫),জমশেদ আলীর ছেলে খোরশেদ আলম (৩৫),আব্দুল কাদেরের ছেলে মহির উদ্দিন (৩২), মো. বেলাল হোসেনের ছেলে লাভলু মিয়া (২৯), লাভলুর স্ত্রী জাহানারা (২৬), শিশু কন্যা লাভলী (৩), মৃত আব্দুল কাদের এর ছেলে হাসেন আলী (৫০), পুত্রবধূ মনোয়ারা বেগম (৪২) ও নাতী হেলাল হোসেন (৩৫) , হেলাল উদ্দিন(৩৫) ও তার শিশু সন্তান রাব্বি, আব্দুর রশিদের ছেলে হাফিজুর রহমান (২২), হাফিজুল (১৪), নাগদাও গ্রামের মজনু মিয়ার ছেলে নাজমুল (১৩) ও উপজেলার ঘোগারকুটি গ্রামের আব্দুল ব্যাপারীর ছেলে স্বাধীন মিয়া (১০), একই গ্রামের আব্দুল ব্যাপারী মাইদুল (১৯)।
২০১৫ সালের ১৪ অক্টোবর দালালের মাধ্যমে কাঁটাতারের বেড়া টপকিয়ে ভারতে পাচারের সময় ভুরুঙ্গামারী সীমান্তের ওপারে সাহেবগঞ্জ বিএসএফ হাজরা নামের এক তরুণীকে আটক করে নির্যাতন চালিয়ে পুলিশে হস্তান্তর করে। তিনি এখন কোচবিহার জেলে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
ভারতে আটককৃতদের স্বজনদের অভিযোগ, তাদের স্বজনদের আটকের খবর পাওয়ার পর সাবেক ছিটমহল আন্দোলনের নেতা গোলাম মোস্তফা প্রতিটি পরিবারের কাছ থেকে বিশ থেকে পঞ্চাশ হাজার টাকা করে নিয়েছেন। কিন্তু দেড় বছর পার হলেও এখন পর্যন্ত কেউ ছাড়া পায়নি।
এ বিষয়ে জানতে গোলাম মোস্তফার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাকে পাওয়া যায় না।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার দেবেন্দ্র নাথ ঊরাঁও জানান,’বন্দিদের বিষয়ে সঠিক কোনও পরিসংখ্যান নেই। তবে তারা অবৈধ অনুপ্রবেশ করে ভারতে গিয়ে আটক হয়েছে। আটক পরিবারগুলো সহযোগিতা চাইলে দেওয়া হবে। বন্দিদের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’
এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আব্রাহাম লিংকন ট্রিবিউনকে জানান, ‘অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে তারা বিভিন্ন মেয়াদে সাজা খাটছেন। এদের মধ্যে অনের নারী ও শিশু রয়েছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে উদ্যোগ নিয়ে যদি ভারত সরকারের কাছে এদের জন্য সাধারণ ক্ষমার ব্যবস্থা করা যায় তাহলে এক কথা। অন্যথায় তাদের সাজার মেয়াদ শেষ করেই দেশে ফিরতে হবে।’
/এসটি/এফএস/
আরও পড়ুন-
ইসলামী ব্যাংকের জাকাত ফান্ডের ৮০ শতাংশ টাকা যাবে প্রধানমন্ত্রীর ফান্ডে







