২৫ নং মাইনীমুখ মৌজার হেডম্যান মানিক কুমার চাকমা যে জায়গাটিতে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেটি ছিল লংগদু হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়। রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ২৫ জন হেডম্যান এই অ্যাসোসিয়েশনের আওতায়। তবে এখন সেখানে ধ্বংসস্তূপ। পোড়া আবর্জনা ছাড়া আর কিছুই নেই। হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশনের দফতর সম্পাদক মানিক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পাহাড়িদের সব জমিজমার দলিল, খাজনার কাগজপত্রসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দলিলপত্র ছিল আমাদের এই কার্যালয়ে। সব পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। সব দলিল হারিয়ে পাহাড়িরা এখন নিঃস্ব।’
মানিক কুমার চাকমা আরও বলেন, ‘আমাদের যদি ত্রাণ দেয় তো সেই ত্রাণ দিয়ে কী করবো। আমাদের ঘর, চুলা কিছুই তো নাই। ত্রাণের সঙ্গে সঙ্গে খাবার ও পুনর্বাসনের দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া উচিত। না হলে যারা চলে গেছেন তারা ফিরে আসতে পারবে না।’
হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশনের ভবনটি জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি বা জাইকার অর্থায়নে তৈরি করা হয়েছিল।
গত বৃহস্পতিবার (১ জুন) স্থানীয় সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নের লাশ উদ্ধার নিয়ে উত্তেজনার পর পাহাড়িদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় বাঙালিরা এই হত্যাকাণ্ডের জন্য স্থানীয় পাহাড়ি সংগঠনের সদস্যদের দায়ী করছে। শুক্রবার বাঙালিদের একটি মিছিল থেকে দুর্বৃত্তের দেওয়া আগুনে লংগদুর কয়েকটি এলাকায় আড়াইশয়েরও বেশি বাড়িঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়। আতঙ্কে এলাকা থেকে পালিয়ে যান হাজারেরও বেশি মানুষ। তাদের কেউ কেউ নিজ নিজ এলাকায় ফিরে আসলেও সেখানে থাকার মতো পরিস্থিতি নেই। আগুনে পোড়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে তাদের বসতবাড়িগুলো।
অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে যারা ফিরে আসছেন তাদের অনেকেই আপাতত তিনটিলা বৌদ্ধ বিহারে আশ্রয় নিয়েছেন। সেনাবাহিনী পক্ষ থেকে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাইনি জোনের জুম কমান্ডার লে. কর্নেল আবদুল আলিম চৌধুরী জানান, দুটি পয়েন্টে খাদ্য বিরতণ করা হচ্ছে। যত দিন পর্যন্ত আশ্রয় কেন্দ্রে লোক থাকবে ও পুনর্বাসন না হবে ততদিন এখানে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে খাবার দেওয়া হবে।
তিনটিলা বৌদ্ধ বিহারে আশ্রয় নিয়েছেন একই এলাকার বাসিন্দা প্রেম লাল চাকমা। তার গ্রামের বাড়ি আটারকছড়া ইউনিয়নের উল্টাছড়ি গ্রামে। প্রেম লাল চাকমা স্থানীয় ইউনিয়ন তথ্য সেবা কেন্দ্রের উদ্যোক্তা। তিনি জানান, স্ত্রী ও তিনি মিলে যুব উন্নয়নের মাধ্যমে এক লাখ টাকা ও গ্রামীণ ব্যাংকের কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে কিছুদিন আগেই তিনটিলাপাড়ায় বাড়ি তৈরি করেন।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সপ্তাহখানেক আগে গ্রামের বাড়িতে আমার মা মারা যান। বুধবার মায়ের শেষকৃত্যের জন্য সবাই মিলে গ্রামের বাড়ি যাই। শুক্রবার ওই নাশকতার ঘটনা শুনে আর আসিনি। শনিবার ফিরে দেখি যা ছিল সব শেষ। ঘরে ৫০ হাজার টাকা ছিল ঋণের কিস্তি পরিশোধের জন্য। কিছুই নিতে পারিনি। এখন কি করবো বুঝে উঠতে পারছি না। মেয়ে ও স্ত্রী গ্রামের বাড়িতে রয়ে গেছে। তারা আর ফিরে আসতে চাচ্ছে না।’
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান কলিন মিত্র চাকমা বলেন, ‘প্রশাসনের আশ্বাসে বাড়ি ফিরে আসার জন্য অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। কেউ কেউ এসেছেন। তাদের মধ্যে অনেকের বাড়িঘর পুড়ে যাওয়ায় ফিরে গেছেন বিহারে কিংবা আত্মীয়ের বাড়িতে। অনেকেই দূরে চলে গেছেন। ফলে তারা কোথায় আছেন, সে খবরও পাচ্ছি না। পরিস্থিতি শান্ত হলেও লোকজনের আতঙ্ক এখনও কাটেনি।’
লংগদু উপজেলা জনসংহতি সমিতির সাধারণ সম্পাদক মনি শঙ্কর চাকমা জানান, ‘তিনটিলায় মোট ১৮০ পরিবার, মানিকজোড় ছড়ায় ৮৮পরিবার ও ৫টি দোকান, বাইট্টপাড়া এলাকায় ৪২টি পরিবার ও ৪টি দোকান পুড়ে ধ্বংস হয়েছে। তিনটিলা বাইট্টাপাড়া মানিকজোড় ছড়ার লোকজন সবাই এলাকার বাইরে নিরাপদ আশ্রয়ে আছে। এখনও এখানে আসতে চাচ্ছে না। কারণ তাদের আশ্রয়ের একমাত্র স্থানটি আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’
/এফএস/টিএন/
আরও পড়ুন-
'ফিরে এসে দেখি কিছুই নাই, সব পুড়ে ছাই'








