কুড়িগ্রামের সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেঁষে রয়েছে বেগম রোকেয়া ও ব্রহ্মপুত্র আশ্রয়ণ প্রকল্প। দুর্গতদের আশ্রয় নেওয়ার জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প দুটি করা হয়েছিল। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এগুলো আসলে মানুষের থাকার উপযুক্ত কিনা। কারণ এখানকার বেশির ভাগ ঘরের চালেই নেই টিন, নেই দরজা-জানালাও। দুটি প্রকল্পে ২২টি করে ৪৪টি ব্যারাকে ২২০ পরিবার পুনর্বাসিত হওয়ার কথা থাকলেও বর্তমানে সেখানে আছে ৮০-৯০টি পরিবার। বাকিগুলো থাকার অনুপযুক্ত। দুর্যোগের সময় জরুরিভাবে দুর্গতরা এখানে আশ্রয় নিতে পারলে দুর্ভোগ অনেকাংশে লাঘব হতো বলে মনে করছেন জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
ভরা বর্ষায় কুড়িগ্রামের সব কটি নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার কয়েকটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল, চর ও দ্বীপচর প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়ন ও চিলমারী উপজেলার চিলমারী, রমনা ও অষ্টমীরচর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রামের ঘর-বাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। মানবেতর জীবন-যাপন করলেও আশ্রয়ণ প্রকল্পের দুর্দশার কারণে সেখানে আশ্রয় নিতে পারছে না দুর্গতরা।
চর কালির আলগা গ্রামে সরেজমিনে আশ্রয়ণ প্রকল্প দুটি ঘুরে সেখানকার দুর্দশার চিত্র দেখা গেছে। আশ্রয়ণ প্রকল্প দুটির অধিকাংশ ঘর থাকার অনুপোযোগী। ঘরের চালে টিন নেই, চালে লাগানো লোহার অ্যাঙ্গেলপড়ে আছে নিচে। টিন লাগানোর কাজে ব্যবহৃত লোহার পাতলা অ্যাঙ্গেলগুলো দেখলেই বোঝা যায় কতটা নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে। কোনও কোনও ঘরের দরজা জানালা নেই, ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ঘর থেকে খসে পড়া ইট। টয়লেটগুলোও নষ্ট।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আনোয়ারা, আদুরী ও রাবেয়া বলেন, ‘আমরা এখানে অনেক কষ্টে থাহি। কেউ আমাগো কোনও খোঁজ-খবর নেয় না। বৃষ্টি হলে ঘরের চাল দিয়া খালি পানি পড়ে, বাতাসে চাল উড়ি যাবার চায়, বাচ্চাগো নিয়া সবসময় আতঙ্কে থাহি।’
রেজ্জাক ও তাহের আলী নামে আশ্রয়ণ প্রকল্পে দুই বাসিন্দা জানান, তারা প্রথম থেকেই এখানে বাস করছেন। কিন্তু হস্তান্তরের কয়েকদিনের মাথায় সামান্য ঝড়ে প্রকল্পের বেশিরভাগ ব্যারাকের টিনের চাল উড়ে যায়। ধসে যায় দেয়াল ও কংক্রিটের সিঁড়ি। এরপর আর কেউ সেগুলো ঠিক করে দেয়নি। ফলে ওই ব্যারাকগুলোর বরাদ্দ প্রাপ্তরা আশ্রয়ণ প্রকল্প ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। বর্তমানে যারা আছেন তারা টিনের চালে ইট, বালুর বস্তা দিয়ে এবং রশি দিয়ে চাল বেঁধে বাস করছেন। অনেকে চালের ওপর আলাদা করে পলিথিন ও ত্রিপল দিয়ে বাস করছেন।
বেগম রোকেয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাত্র একটি টিউবওয়েল ঠিক আছে। যা দিয়ে সেখানকার সবক’টি পরিবার তাদের খাবার পানির চাহিদা মেটাচ্ছে।
এরই মধ্যে ব্রহ্মপুত্র আশ্রয়ণ প্রকল্পের একবারে উত্তরে নদী ভাঙন শুরু হয়েছে। এ ভাঙন রোধে এখন পর্যন্ত কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ অবস্থায় পুরো প্রকল্পের ভবিষ্যত নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন এখানকার বাসিন্দারা।
ব্রহ্মপুত্র আশ্রয়ণ প্রকল্পের সভাপতি মোন্নাফ আলী জানান, ৮/১০ দিন থেকে প্রকল্প এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি ব্যারাকের নিচের মাটির ধসে পড়েছে। দু-একদিনের মধ্যে ওই ব্যারাকগুলো নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে।
আশ্রয়ণের বেহাল দশার কথা স্বীকার করে যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী বলেন, ‘আমি প্রশাসনের কাছে কয়েকবার সংস্কারের ব্যাপারে অনুরোধ করেছি। কিন্তু লাভ হয়নি। বর্তমানে সংস্কারের পাশাপাশি ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।নইলে কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এ আশ্রয়ণ প্রকল্প রক্ষা করা সম্ভব হবে না।’
আশ্রয়ণ প্রকল্পটির ভাঙন রোধের জন্য দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সুদৃষ্টি কামনা করেন এই জনপ্রতিনিধি।
ভাঙন রোধ ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের সংস্কারের ব্যাপারে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমিন আল পারভেজ বলেন, ‘বিষয়টি চেয়ারম্যান আমাকে অবগত করেছেন। ভাঙন রোধে দুই একদিনের মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মোহাম্মদ ফেরদৌস খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বিষয়টি আমরা জেনেছি। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।’
প্রসঙ্গত, বেগম রোকেয়া ও ব্রহ্মপুত্র আশ্রয়ণ প্রকল্প দুটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তত্ত্বাবধানে ২০১৫ সালে ২৪০ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রকল্পের নির্মাণ কাজের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান ছিল মেসার্স জারিফ এন্টারপ্রাইজ।
/এসটি/টিএন/
আরও পড়ুন:








