‘৭ মার্চের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি’

Send
তানজিল হাসান,মুন্সীগঞ্জ
প্রকাশিত : ০৭:৫৬, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ০৮:০৩, ডিসেম্বর ১৭, ২০১৭

৭ মার্চের ভাষণ

‘খালেদ মোশাররফের অধীনে ২ নং সেক্টরে যুদ্ধ করি। খালেদ মোশাররফ শেষের দিকে আহত হন। ওআইসি ছিলেন হায়দার সাহেব। তিনিই যুদ্ধ পরিচালনা করতেন। দেশকে স্বাধীন করার জন্য বঙ্গবন্ধুর ডাকে, ৭ মার্চের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করি।’-কথাগুলো বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মুহাম্মদ ফজলুল হক।

মুন্সীগঞ্জের নয়াগাও নিবাসী মুহাম্মদ ফজলুল হক ১৭ জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দলের কমান্ডার ছিলেন। ১৯৬৮ সালে মুন্সীগঞ্জের হরগংগা কলেজ থেকে বি কম পাশ করেন তিনি। তখন থেকেই ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন। ১৯৯০ এর দিকে প্রায় তিন বছর পঞ্চসার আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন তিনি। এরপরে আর রাজনীতি করেননি।

তিনি বলেন, ‘আমি যখন যুদ্ধে যাবার জন্যে বের হই, আমার সঙ্গে কাজী আনোয়ার হোসেন নামে একজন সহযোগী ছিল। এখন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা। যুদ্ধে অংশ নিতে আমরা দু’জন বাসা থেকে বের হই। কিন্তু রাস্তাঘাট চিনি না ভালো করে। আগরতলার উদ্দেশ্যে রওনা হই, কিন্তু চলে যাই ঠিক উলটো পথে, কুষ্টিয়ার শিকারপুর সীমান্তের কাছে।“

বয়সের ভারেই হয়তো স্মৃতি হাতড়ে বেড়ান। থেমে গিয়ে আবার বলতে শুরু করেন, “বিহারের সিংগুম জেলার চাকুলিয়ায় আমাদের ট্রেনিং সেন্টার ছিল। সেখানে ব্রিটিশ পিরিয়ডে জাপানের আর্মিরা বোমা ফেলে। ৩১ মে থেকে  ৩০ জুন পর্যন্ত সেখানেই ট্রেনিং। মূলত গেরিলা ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল। প্রতিদিন ট্রেনিং, পিটি প্যারেড,রাইফেল ট্রেনিং, এসএমজি, গ্রেনেড, এসএলআর ট্রেনিং হতো। তারপর, যশোরের একজন, বাবুল, ফজলু, আলী আহমদ, লতিফ, শ্রীনগরের তিনজন, ঢাকা বরিশালের মিলিয়ে আমাদের ১৭ জনের একটি দল হয়।

তিনি জানান, প্রথমে বাগেরহাটের একটি জায়গায় পাঠানো হয় তাদের। সেখানে অন্যরকম একটি ঘটনার সম্মুখীন হতে হয় সেখানে ইপিআর যুদ্ধ করছিলো। রাত ১০-১১টার দিকে তাদের ডেকে নিয়ে যেত ‘কাভারিং’ দেওয়ার কথা বলে।

মুহাম্মদ ফজলুল হক বলেন, ‘আসলে ‘কাভারিং’ নয়, আমাদের যুদ্ধ করতে হত সরাসরি পাক-আর্মিদের সাথে। আর্মিরা রাতের বেলা হামলা করে গ্রাম জ্বালিয়ে, ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে চলে যেতো। আমরা পড়লাম বিপদে। অচেনা জায়গা, কিছু চিনি না। তার মধ্যে রাতের বেলার যুদ্ধ। তিনদিন পর আমরা প্রতিবাদ করলাম। আমরা বললাম যে আমরা নিজেদের এলাকায় যুদ্ধ করব। পরদিন আমাদের কোর্ট মার্শাল করল। ক্যাপ্টেন সিফা ক্যাম্পে ছিলেন না, সুবেদার জলিল ছিলেন ইনচার্জ। কাদাময় মাঠে গড়িয়ে একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত যেতে হবে—এই হল শাস্তি। এ ঘটনা শুনে ওই সেক্টরের কমান্ডার মেজর জলিল আসলেন পরেরদিন। আমাদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করে সুবেদার জলিলকে বকাঝকা করলেন। ১৫’শ টাকা আর ট্রানজিট অর্ডার দিয়ে আগরতলা চলে যেতে বললেন আমাদের।’

ফজলুল হক বলেন, ‘প্রথম মুন্সীগঞ্জে আসি জুলাই মাসে। উঠি খাসকান্দির আবেদ আলী ব্যাপারীর বাড়িতে। সেখানেই সারাদিন ছিলাম। ওই রাতেই পাক আর্মিরা ওই গ্রামে আক্রমণ করে। পাঁচজন লোক শহীদ হয়। ২২ জনকে নির্যাতন করে। কারও হাত ভেঙ্গেছে, কারও পা। কারও চোখ উপড়ে ফেলা হয়েছে।’

তিনি জানান, ৭১ সালে তার অংশগ্রহণে সবচেয়ে বড় যুদ্ধগুলো হচ্ছে, গালিমপুরের যুদ্ধ, সিরাজদিখান, টঙ্গিবাড়ী ও মুন্সীগঞ্জ থানা আক্রমণ। এরমধ্যে সিরাজদিখান ও টঙ্গিবাড়ী থানা আক্রমণে নিজেই সরাসরি নেতৃত্ব দেন।

তিনি বলেন, ‘দিন তারিখ মনে নেই। তবে বর্ষার দিন ছিল। শ্রীনগরের বাগরায় এই যুদ্ধে আমার সাথে শ্রীনগরের কিছু ছেলে ছিল। সকালে হিন্দু বাজারে গিয়ে আর্মিরা লুটপাট করে। তারা একটি খাল দিয়ে লঞ্চে করে আসে। খবর পেয়ে আমরা আগে থেকে দুইপাড়ে বাঁশঝাড়ে অবস্থান নেই। সন্ধার পরপরই আমরা ফায়ার করতে শুরু করি। তারা দিকভ্রান্ত হয়ে যায়। আর্মিদের সাথে রাজাকাররাও ওই লঞ্চে ছিল। ধারণা করি তারা কেউ বাঁচতে পারে নাই।’

মুক্তিযুদ্ধের সনদধারী এক সময়ের এই কমান্ডারকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়, যুদ্ধাপরাধীদের যে বিচার চলছে সে ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কি--তীব্র ঘৃণা নিয়ে তিনি বলেন, খুবই ভালো কাজ হচ্ছে। এ অপরাধীদের বিচার হয় নাই বলেই পরবর্তীতে দেশে অপরাধ বাড়ছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা ছিল এই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, আমি মনে করি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কাজসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে সঠিকপথেই এগোচ্ছেন।

/এমএইচ/

লাইভ

টপ