খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। পাড়া-মহল্লায় চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। কে হবেন নগরপিতা। দলীয় মনোনয়ন পেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রার্থীরা।
১৫ মে এই সিটি করপোরেশনে ভোট গ্রহণ করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিএনপিতে মেয়র পদে মনোয়ন প্রার্থী দুই জন। আর মনোনয়ন প্রত্যাশী বেশি হওয়ায় মহানগর আওয়ামী লীগ প্রার্থী মনোনয়ন দিতে সোমবার (২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় বর্ধিত সভা আহ্বান করেছে। অন্যদিকে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী হিসেবে মুশফিকুর রহমানকে অনেক আগেই চূড়ান্ত করেছে দলটি। তবে, আরও কয়েকজন মনোনয়ন প্রত্যাশীর নাম শোনা যাচ্ছে।
দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, খুলনায় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী হিসেবে সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক এমপি পছন্দের তালিকার শীর্ষে থাকলেও তিনি কেসিসি নির্বাচনে অংশ নিতে আগ্রহী নন। এই অবস্থায় খুলনা আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা প্রার্থী হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন। কিন্তু কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ তালুকদার খালেকের বিকল্প এবং সময়োপযোগী প্রার্থী বাছাইয়ে সঙ্কটে রয়েছে। মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে তৎপর রয়েছেন সদর থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. সাইফুল ইসলাম, মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আনিছুর রহমান পপলু, সোনাডাঙ্গা থানা আওয়ামী লীগ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বুলু বিশ্বাস, দৌলতপুর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি বিজেএ চেয়ারম্যান সৈয়দ আলী ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা এনায়েত হোসেন।
খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান এমপি বলেন, ‘কেসিসি নির্বাচনকে ঘিরে মহানগর আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা সোমবার সন্ধ্যায় দলীয় কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি সাবেক মেয়র তালুকদার আব্দুল খালেক এমপি মেয়র পদে নির্বাচনে আগ্রহ না দেখানোর ফলে সময়োপযোগী প্রার্থী নিয়ে ভাবতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দলীয় সভাপতিই নেবেন। তার আগে মহানগর কমিটির পক্ষ থেকে মাঠ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও আগ্রহী প্রার্থীদের মতামত জানা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণকে সহজ করার লক্ষ্যেই বর্ধিত সভা আহ্বান করা হয়েছে।’
মহানগর সভাপতি তালুকদার আব্দুল খালেক এমপি বলেন, ‘এবার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে। তাই কারও বিরোধীতা করার সুযোগ থাকবে না। তিনি সিটি নির্বাচনের চেয়ে সংসদ নির্বাচনকে গুরুত্বের সঙ্গে নিচ্ছেন।’
খুলনা সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কেসিসি নির্বাচনে মেয়র পদে তিনি দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার কাছে মনোনয়ন চাইবেন। সে লক্ষ্য নিয়েই মাঠ পর্যায়ে কাজ করছেন।’
মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট সরদার আনিসুর রহমান পপলু বলেন, ‘তিনি মেয়র নির্বাচনে আগ্রহী এবং দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশী।’
আরও পড়ুন: কেসিসি নির্বাচন: অভ্যন্তরীণ বিরোধ থাকলেও আশাবাদী বিএনপি
বিএনপিতে মেয়র পদে মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন বর্তমান মেয়র ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান মনি ও জেলা বিএনপি সভাপতি এসএম শফিকুল আলম মনা। তবে, মনিরুজ্জামান মনি প্রচারণার মাঠে এখনও নামেননি। সেদিক থেকে জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনা প্রচার-প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন। মনা ২০১৩ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন চেয়ে আবার দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে তা প্রত্যাহার করেছিলেন।
খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, ‘সবাইকে দলের নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করা উচিত। দলই প্রার্থী চূড়ান্ত করবে। আর দলীয় প্রার্থীর ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষেই নেতাকর্মীরা নির্বাচন করবে।’ তবে, দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে বিএনপি আদৌ নির্বাচনে যাবে কি-না তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি।
এছাড়া জাতীয় পার্টির (জাপা) নগর আহ্বায়ক এসএম মুশফিকুর রহমান, জাতীয় পার্টি (জেপি) মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক কাজী মাসুদ আহম্মেদ ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মহানগর সভাপতি মাওলানা মুজ্জাম্মিল হক মেয়র পদে নির্বাচনের লক্ষ্যে কাজ করছেন।
২০১৬ সালের ২৮ জানুয়ারি জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক এসএম মুশফিকুর রহমান জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন। ওই দিনই দলের চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ তাকে কেসিসির মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেন। পরে গত বছরের ১৪ মার্চ খুলনা সার্কিট হাউজে কেক কেটে নির্বাচনি কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। এরপর নির্বাচনি আর কোনও প্রচার দৃশ্যমান হয়নি। এরমধ্যে দলীয় কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে দুই যুগের সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন মহানগর জাপার সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য শেখ আবুল হোসেন, সাধারণ সম্পাদক মো. তরিকুল ইসলামের নেতৃত্বে শতাধিক নেতা-কর্মী। মহানগর জাতীয় পার্টির প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক শেখ আবুল কাশেম এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত কেসিসিতে আওয়ামী লীগের ঘোষিত প্রার্থী এস এম এ রব হত্যা মামলার আসামিকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ হয়ে দল ত্যাগ করেন তারা।
মহানগর জাপার ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক সৈয়দ খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘এসএম মুশফিকুর রহমানকে মেয়র প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করার পরও ঢাকায় অুনষ্ঠিত মহাসমাবেশে তার দেখা মেলেনি।’ শিগগিরই মনোনয়নের জন্য তিনি কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কথা বলবেন।
মহানগর জাপার প্রভাবশালী সদস্য মাহাতাব উদ্দীন বলেন, ‘গত সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে জাপা নেতা সৈয়দ খায়রুল ইসলামসহ কয়েজন নেতা তার কাছে আসছিলেন। তারা মেয়র নির্বাচনে তাকে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপারে সম্মতি নিতে এসেছিলেন।’
মহানগর জাপার যুগ্ম আহ্বায়ক মোল্যা শওকত হোসেন বাবুল নিজেকে কেসিসির দলীয় মেয়র পদে প্রার্থী প্রত্যাশা করে বলেন, ‘আমি মেয়র পদে দলের কাছে মনোনয়ন চাইবো। মুশফিক ঢাকায় থাকেন। খুলনার মানুষের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক নেই। মেয়র পদে নির্বাচন করতে হলে খুলনার মাটি আর মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে।’
খুলনা জাপার মেয়র প্রার্থী এসএম মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘চেয়ারম্যান আমাকে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছেন। মনোনয়নও দিয়েছেন। যারা প্রার্থীতা ঘোষণা আর মনোনয়নকে ভিন্ন ব্যাখা দেন, তারা দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্ত সৃষ্টি করতে চায়।’ আগামী ২/৪ দিনের মধ্যে তিনি খুলনায় আসবেন বলে জানান।
২০১৩ সালের ১৫ জুন অনুষ্ঠিত কেসিসি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরামের প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি (আনারস) ১ লাখ ৮১ হাজার ২৬৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ সমর্থিত সম্মিলিত নাগরিক কমিটির প্রার্থী তালুকদার আব্দুল খালেক পেয়েছিলেন ১ লাখ ২০ হাজার ৫৮ ভোট। ওই নির্বাচনে ভোটার ছিল ৪ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৬ জন। এবারের নির্বাচনে ভোটার হয়েছে ৪ লাখ ৮৯ হাজার ৩৭৭ জন।







