সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ মামলায় বিনা অপরাধে তিন বছর কারাবাসের পর হাইকোর্টের হস্তক্ষেপে মুক্তি পেয়েছেন পাটকল শ্রমিক জাহালম। রবিবার মধ্যরাতে মুক্তির পর সোমবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সরেজমিনে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলার ধুবড়িয়া গ্রামে জাহালমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটি পুরনো একচালা ঘর। আনুমানিক ৮ বাই ১০ ফুট আকারের সেই ঘরটির অবস্থাও খুব টেকসই নয়, জীর্ণ অবস্থা। ভেতরে আসবাবপত্রও তেমন কিছু নেই। একটি মাত্র চৌকি। সেখানেই নিজের স্ত্রী ও একমাত্র মেয়েকে নিয়ে অবস্থান করছেন জাহালম। এর আগে ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার হওয়ার আগ পর্যন্ত এই ঘরেই পরিবারসহ থাকতেন তিনি।
স্থানীয়রা জানান, আর্থিকভাবে অসচ্ছল হওয়ায় আব্দুল বারী নামের একজন ধনাঢ্য ব্যক্তির বাড়িতে প্রায় ত্রিশ বছর ছিলেন জাহালমের বাবা-মা। পরে জাহালমসহ তার ছয় ভাইবোন বড় হয়ে বিভিন্ন জায়গায় কাজ করে নিজেরা অল্প কিছু করে জমি কিনে একচালা ঘর বানান। ২০১২ সালে ১০ শতাংশ জমি কেনেন জাহালম। ২০১৩ সালে সেখানে একটি একচালা ঘর বানান তিনি।
প্রসঙ্গত, সোনালী ব্যাংকের ১৮ কোটি ৪৭ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আবু সালেক নামে এক ব্যক্তির নামে ৩৩টি মামলা দেয় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। আসামি আবু সালেক কিন্তু তার বাড়ির ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল জাহালমের ঠিকানা। পরে সেই অর্থ আত্মসাতের মামলায় ২০১৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর সকাল সাড়ে ৯টায় দুদকে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে জাহালমের বাড়ির ঠিকানায় চিঠি দেয় দুদক। জাহালম সেসময় নরসিংদীর ঘোড়াশালের বাংলাদেশ জুট মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছিলেন। নির্দিষ্ট দিনে দুদকে হাজিরা দিয়ে জাহালম আবার তার নরসিংদীতে জুট মিলের কর্মস্থলে চলে যান। এর দুই বছর পর ২০১৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর ঘোড়াশালের ওই জুট মিল থেকে জাহালমকে গ্রেফতার করে নাগরপুর থানায় আনা হয়। পরদিন তাকে টাঙ্গাইলের আদালতে তোলা হলে জেলখানায় পাঠানোর নির্দেশ দেন বিচারক। ৭ দিন টাঙ্গাইল কারাগারে রাখার পর তাকে কাশিমপুর-২ কারাগারে নেওয়া হয়। এরপর থেকে তিন বছর সেখানে কারাবন্দি ছিলেন জাহালম। সম্প্রতি গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ভুল মামলায় তাকে গ্রেফতারের বিষয়টি নজরে আসায় রবিবার (৩ ফেব্রুয়ারি) হাইকোর্ট তাকে মুক্তির নির্দেশ দেন। পরে রবিবার মধ্যরাতে তাকে মুক্তি দেয় কারা কর্তৃপক্ষ। মুক্তি পেয়ে টাঙ্গাইলের নিজের বাড়িতে চলে যান জাহালম।
এ ব্যাপারে স্থানীয়রা বলছেন, তদন্তের সময় জাহালমের বাড়িতে দুদকের কর্মকর্তারা এলে তারা অর্থনৈতিক অবস্থা দেখেই প্রকৃত ঘটনা বুঝতে পারতেন। তাহলে আর এই ভুল হতো না।
গ্রেফতারের প্রসঙ্গে জাহালম বলেন,‘‘সেসময় আমি বলেছিলাম, ‘স্যার, আমি জাহালম। আবু সালেক না। আমি নির্দোষ। কিন্তু কেউ শোনেনি।’’ এ কারণেই আসল আসামি সালেকের বদলে তাকে (জাহালম) ৩ বছর কারাভোগ করতে হয়েছে বলেও আক্ষেপ করেন তিনি।
জাহালম আরও বলেন,‘তখন দুদকের কোনও কর্মকর্তা কোনও কথাই শোনেননি। সেই সময় দুদক কর্মকর্তারা আমাকে পেটানোর ভয়ও দেখান।’
দুদক থেকে শুধু তার বাড়ির ঠিকানায় চিঠি পাঠানো হতো দাবি করে তিনি বলেন, ‘এমনকি কোনও কর্মকর্তা আমার বাড়িও পরিদর্শন করেননি। শুধু চিঠি পাঠানো হতো।’
আরও খবর:
অব্যাহতি পেলেন ২৬ মামলার ‘ভুল’ আসামি জাহালম
কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন জাহালম
জাহালমের ঘটনা তদন্তে দুদকের কমিটি








