নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হামলায় পাহাড়ে আতঙ্ক

Send
জিয়াউল হক, রাঙামাটি
প্রকাশিত : ১১:৩০, আগস্ট ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:০৯, আগস্ট ২৩, ২০১৯

রাঙামাটি

পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে আঞ্চলিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা নতুন কোনও বিষয় নয়। সাম্প্রতিক সময়ে দুপক্ষের সংষর্ষে একাধিক নেতাকর্মীর প্রাণহানিও ঘটেছে। তবে নিজেদের আধিপত্য নিয়ে দলগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ লেগে থাকলেও শান্তি চুক্তির পর নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর তেমন কোনও হামলার ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু   গত ১৮ আগস্ট নিরাপত্তা বাহিনীর একটি টহল দলের ওপর হঠাৎ সন্ত্রাসীরা হামলা করে। সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সৈনিক মো. নাসিম নিহত হন। এরপর আজ শুক্রবার  (২৩ আগস্ট)  ফের সেনা সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা ঘটে।  নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর  পরপর  দু’দফা এই হামলার ঘটনায় ভাবিয়ে তুলেছে পাহাড়ে বসবাসকারীদের। এমনকি নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কও রয়েছে সাধারণ মানুষের।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেনা সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাটি ঘটে রাঙামাটি জেলার রাজস্থলী উপজেলার গাইন্দ্যা ইউনিয়নের দুর্গম পোয়াথু গ্রামে। এতদিন ওই এলাকাটি পাহাড়ের নতুন সংগঠন ‘মগ লিবারেশন পার্টি’র  দখলে থাকলেও বর্তমানে তা নিয়ন্ত্রণ রেখেছে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতি। এদিকে,  শুক্রবার (২৩ আগস্ট) রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেকে টহলরত সেনা সদস্যদের লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা ফের গুলি ছুড়েছে। রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) ছুফিউল্লাহ জানান,শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে বাঘাইছড়ির সাজেক থানার সীমানাছড়া এলাকার উজোবাজারে দুটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধের খবর আসে। এই খবর পেয়ে সেনাবাহিনীর একটি টহল দল ওই এলাকায় যায়। এসময় সন্ত্রাসীরা সেনাবাহিনীর গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। একটি গুলিতে গাড়ির কাচ এবং আরেকটি গুলিতে গাড়ির বডি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসময় সেনা সদস্যরাও পাল্টা গুলি ছুড়লে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যায়। পরে সেখানে সুমন চাকমা ওরফে কসাই সুমন নামে এক সন্ত্রাসীর মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।



পাহাড়ে দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ১৯৯৭ সালে ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সম্পাদিত হয়, যা শান্তিচুক্তি নামে সবার কাছে সমাদৃত। চুক্তির ফলে পাহাড়ে শান্তি নেমে আসবে, এমন ধারণা থাকলেও চুক্তির বিরোধিতা করে জনসংহতি সমিতির একটি অংশ। পরে এই অংশটি বের হয়ে গিয়ে ইউপিডিএফ নামে আরেকটি  দল গঠন করে। ২০০১ সাল থেকে পাহাড়ে পুনরায় শুরু হয় ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত। পরবর্তীতে আরও দুটি আঞ্চলিক দল গঠিত হয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শান্তিচুক্তির কয়েক বছর পর নানিয়ার চরে আঞ্চলিক দু’দলের সশস্ত্র সংঘর্ষ চলাকালে সেখানে টহল দিতে গিয়ে অতর্কিতভাবে এক সেনা অফিসার নিহত হয়েছিলেন। এরপরও সংঘাত কেবল আঞ্চলিক দলগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। এবার নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর  কেন এই হামলা, পাহাড়ে তা এখন আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত বছরের ৪ মে  হত্যার শিকার হন নানিয়ার চরের উপজেলা চেয়াররম্যান। তার পরদিনই আরও পাঁচ জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় পাহাড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সেসবের পেছনে আঞ্চলিক দলগুলোর প্রাধান্য বিস্তারের লড়াইকেই দায়ী করা হয়। এবছরের ১৮ মার্চ বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজনের ওপর ব্রাশ ফায়ার করা হয়। এতে নিহত হন আট জন। সর্বশেষ গত ১৮ আগস্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর টহল দলের ওপর সন্ত্রাসী হামলা হয় রাজস্থলীতে। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এখন কারা কোন উদ্দেশে সেনাবাহিনীকে টার্গেট করলো? নাকি সরকারকে নতুন কোনও বার্তা দিতে চায় আঞ্চলিক দলগুলো— এ ধরনের নানা ভাবনা ও  প্রশ্ন দেখা দিয়েছে পাহাড়ের  বিভিন্ন পেশার মানুষের মাঝে। 
রাঙামাটি প্রেস ক্লাবের সভাপতি সাখাওয়াৎ হোসেন রুবেল বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে বিস্তীর্ণ গহিন অরণ্য রয়েছে। যেকোনও অপরাধ করে লুকিয়ে থাকার সুযোগ রয়েছে। দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনীর ওপর হমলায় প্রমাণ করে যে, সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়েছে। তাদের অস্ত্রের মজুত অনেক। তারা সরকারকে চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে বলে আমি মনে করি। যারা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্রের মাধ্যমে পার্বত্য এলাকার শান্তি নষ্ট করতে চায়, তারাই এসব কাজে জড়িত। ’

নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক ও রাঙামাটি কলেজের সাবেক জিএস জাহাঙ্গীর আলম মুন্না বলেন, ‘বিনাযুদ্ধে বিনাকারণে সেনাবাহিনীর একজন সৈনিককে জীবন দিতে হলো। এর আগে গত ১৮ মার্চ বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিদের ওপরে ব্রাশফায়ার করলো। সেই ঘটনায় আট জন নিহত হন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারকে এখনই এবিষয়ে ভাবতে হবে।  তা না-হলে মানুষের মাঝে আতঙ্ক বাড়বে।  
রাঙামাটি পাবলিক কলেজের অধ্যক্ষ তাছাদ্দীক হোসেন কবির বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীর টহল দলের ওপর সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা আমাদের জন্য একটি অশনি সংকেত। যতকুটু জেনেছি, এটি একটি পরিকল্পিত হামলা ছিল। বিভিন্ন সময়ে সন্ত্রাসীরা আইনে আওয়তায় আসলেও যথেষ্ট প্রমাণ না থাকায়, এরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায় এবং ফের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়। বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা সরকারের জন্য এখনই উপযুক্ত সময়। তা না-হলে এমন একটা অবস্থা তৈরি হতে পারে, যাতে সরকার যে লক্ষ্য নিয়ে শান্তি চুক্তি করেছিল, সেটি ব্যাহত হতে পারে। পরিস্থিতি চুক্তির আগের অবস্থায় ফিরে যায় কিনা, সেটা নিয়েও পাহাড়ি  জনগণের শঙ্কা রয়েছে।’
রাজস্থলী থানার অফিসার ইনচার্জ মফজল আহম্মদ জানান, ‘যে ইউনিয়নে ঘটনাটি ঘটেছে, সেখানে কয়েকটি সন্ত্রাসী সংগঠনের অবস্থান রয়েছে বলে শুনেছি। তিনি আরও জানান, সেনা সদস্য নিহতের ঘটনায় এখনও মামলা হয়নি। এলাকায় তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। এখনও কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি। তবে এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বর্তমানে স্বাভাবিক রয়েছে।
রাঙামাটির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) মো. ছুফিউল্লাহ বলেন, ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। সন্ত্রীদের গ্রেফতারে পুলিশ সতর্ক রয়েছে।’

আরও পড়ুন:

সাজেকে টহলরত সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি, বন্দুকযুদ্ধে নিহত ১

রাঙামাটিতে সন্ত্রাসীদের গুলিতে সেনা সদস্য নিহত

 

 

 

 

 

/এপিএইচ/

লাইভ

টপ
X