পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা আজও ভুলতে পারেননি রিজিয়া বেগম

Send
নাটোর প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ১৬:০৭, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৩৬, ডিসেম্বর ১১, ২০১৯

৭৬



১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পিলখানায় (বর্তমানে বিজিবি সদর দফতর) পাকিস্তানি আর্মিদের সেই নির্মমতার কথা এখনও ভুলতে পারেননি নাটোরের রিজিয়া বেগম (৮৬)। ২৫ মার্চ কাল রাতের পর তিনি স্বামীর আর কোনও খোঁজ পাননি। যুদ্ধের পরও দীর্ঘদিন তিনি স্বামীর খোঁজ করেছেন কিন্তু তার কোনও সন্ধান পাননি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসেও তিনি স্বামীর নামে কোনও একটা স্মৃতিচিহ্ন দেখে যেতে চান। নাটোর জেলা পরিষদ ভবনের পেছনের বাড়ির বাসিন্দা রিজিয়া বেগম এমন কথাই জানালেন এই প্রতিবেদককে।

রিজিয়া বেগম জানান, ১৯৭১ সালে তার স্বামী সুবেদার মেজর পদে দায়িত্বরত ছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে তারা সপরিবারে পিলখানার অফিসার্স কলোনিতেই ছিলেন। তার স্বামী শহীদ খন্দকার আকরাম আলী ওই সময়ে পিলখানার ১৫ নম্বর সেক্টরে উইং কমান্ডার হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতারের খবর এবং বেতারে স্বাধীনতার ঘোষণা শোনার পর পাকিস্তানি সেনারা ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পিলখানায় হামলা চালায়। সে সময় অস্ত্রাগারের দায়িত্বে ছিলেন তার স্বামী শহীদ খন্দকার আকরাম আলী।
ওই সময় দায়িত্বরত সুবেদার মেজর শওকত আলীর কাছ থেকে মেসেজ পাওয়ার পরই তিনি প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য অস্ত্রাগার খুলে দেন। রাত সাড়ে ১২টা থেকে একটার মধ্যে প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত হয়ে যান পিলখানার বাঙালি সেনারা। পাকিস্তানি সেনারা সাঁজোয়া বহর নিয়ে পিলখানা আক্রমণ করে বাঙালি সেনাদের নিরস্ত্র করার চেষ্টা করতে থাকে। পরের দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত থেমে থেমে এ যুদ্ধ চলে। তৎকালীন ইপিআর প্রধানের বাড়ি সংলগ্ন কোয়ার্টারেই থাকতেন তারা। সাত ছেলে আর তিন মেয়েকে নিয়ে তিনি কোয়ার্টারের মধ্যে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। দরজা আর জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখেছেন যুদ্ধের দামামা। চোখের সামনে মরতে দেখেছেন অনেক সেনাকে। যুদ্ধ থেমে গেলেও ফিরে আসেননি তার স্বামী খন্দকার আকরাম আলী। ওই সময় তার ১১ মাস বয়সী শিশুকন্যাকে তিন দিন দুধের পরিবর্তে গরম পানি খাইয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন। সাত ছেলে ও তিন মেয়েকে নিয়ে জীবিত ফিরতে পারবেন এমন আশা ছিল না। তিন দিন অনাহার- অর্ধাহারে ওই কোয়ার্টারে অবরুদ্ধ থাকার পর তার স্বামীর বন্ধু এক পাকিস্তানি সেনার সহযোগিতায় ৩ এপ্রিল দুপুর ১২টায় তাদের গাড়িতে তোলা হয়। কিন্তু কোনও গেট দিয়েই তাদের বাইরে আসতে দেওয়া হচ্ছিল না। পাকিস্তানি সেনাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল তাদের মেরে বুড়িগঙ্গায় ফেলে দিতে। অবশেষে ওই পাকিস্তানি মেজর সুবেদারের সহযোগিতায় সন্ধ্যার পর তারা পিলখানা থেকে বের হয়ে ঢাকার তৎকালীন পলাশী ব্যারাকে (বর্তমানে বুয়েট সংলগ্ন) ননদের বাড়িতে ওঠেন। কিন্তু কয়েকদিন পর পাশের ঢাকেশ্বরী মন্দিরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলে তারা সেখান থেকে কিছু দূরে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে অবস্থান নেন। তিন মাস পর তার দেবর প্রিন্সিপাল আলী আজম তাদের খুঁজে বের করেন। তিনি সন্তানদের পাঠিয়ে দিয়ে কোলের মেয়েকে নিয়ে তিনি ঢাকায় অবস্থান করেন। উদ্দেশ্য স্বামীর খোঁজ করা।

রিজিয়া বেগম আরও জানান, স্বামীকে খুঁজে পাওয়ার জন্য অনেক জায়গায় ছুটে গেছেন। এমনকি গোলাম আযমের সঙ্গে পর্যন্ত স্বামীকে উদ্ধারের জন্য সাক্ষাৎ করেছেন। কিন্তু কোথাও খোঁজ পাননি। অবশেষে কাঁদতে কাঁদতে ফিরে আসেন নাটোরে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে নাটোর শহরের নাটোর ছাতনী গণহত্যার নায়ক হাফেজ আব্দুর রহমানের পরিত্যক্ত বাড়িটি এক লাখ টাকার বিনিময়ে (কিস্তিতে পরিশোধ করার শর্তে) শহীদ পরিবার হিসেবে বরাদ্দ পান। সপরিবারে এখনও তিনি সেখানেই আছেন।

তার ছেলে বাপ্পী জানান, পিতার স্মরণে শহরের স্টেশন বাজারে একটি স্ট্যাচু বা মনুমেন্ট এবং বাড়ির পাশের রাস্তাটি তার নামে করে দেওয়ার জন্য পৌরসভা থেকে বলা হলেও আজও তা বাস্তবায়ন হয়নি। মুক্তিযোদ্ধা পরিবার হিসেবে গত বছর থেকে সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেলেও আজও খোঁজ পাননি তার বাবার। জানতে পারেননি তার বাবাকে কোথায় কবর দেওয়া হয়েছে। নাকি ফেলে দেওয়া হয়েছে। বাবার স্মৃতিকে ধরে রাখতে সরকার কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করবে এটাই তার আশা।

মুক্তিযোদ্ধা পরিবার হিসেবে সুন্দর জীবনযাপন করবেন এমন আশা রিজিয়া বেগমের। 











 

/জেবি/এমওএফ/

লাইভ

টপ