যৌন নির্যাতনের প্রতিবাদ করায় নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়া হয়

Send
রফিকুল ইসলাম, ফেনী
প্রকাশিত : ০০:৩০, এপ্রিল ০৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২০, এপ্রিল ০৭, ২০২০




নুসরাত জাহান রাফিসোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন নুসরাত জাহান রাফি। শিক্ষকের মাধ্যমে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে প্রতিবাদ করেছিলেন তিনি। এরই জেরে গত বছরের ৬ এপ্রিল তাকে আগুনে পুড়িয়ে দেয় যৌন নিপীড়ক শিক্ষকের অনুগতরা। আগুনে পুড়ে যাওয়া শরীর নিয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে হার মেনে ১০ এপ্রিল বিদায় নেন নুসরাত। এ ঘটনায় দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। আন্দোলন ও সমালোচনার মুখে হত্যাকাণ্ডের ছয় মাসের মধ্যেই (২৪ অক্টোবর) বিচার কাজ সম্পন্ন হয়। হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১৬ আসামির সবাইকে ফাঁসির আদেশ দেন আদালত। তবে উচ্চ আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন থাকায় এখনও দোষীদের ফাঁসি কার্যকর হয়নি।

এদিকে নুসরাত হত্যার পর গত এক বছর ধরে তার বাবা মা ও দুই ভাই পুলিশ পাহারায় বাড়িতে উৎণ্ঠার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। এ অবস্থায় আসামিদের দ্রুত ফাঁসি কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন নুসরাতের মা শিরিন আক্তার।

শিরিন আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা বিচারিক আদালতে ন্যায়বিচার পেয়েছি। শুনেছি উচ্চ আদালতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা আপিল করেছেন। আমরা প্রধানমন্ত্রী ও মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে আসামিদের ফাঁসির রায় দ্রুত কার্যকরের দাবি জানাই। তিনি আরও বলেন, আজ একটি বছর আমি মেয়ের কণ্ঠে মা ডাকটি শুনতে পাই না। রাতে ঘুম হয় না। কারণ আমার মেয়ের হাত পা বেঁধে যখন তারা আগুন লাগিয়েছিল, তখন আমার মেয়ে কী করেছিল, এসব ভেবেই রাত যায়। ভাত না বিষ খাচ্ছি তাও বুঝতে পারি না। আজকে বাইরের দেশে করোনাভাইরাসে হাজার লোক মারা যাচ্ছে। তাদের আত্মীয়-স্বজনরা মনকে বুঝ দিতে পারবে। কিন্তু আমার মেয়েকে জানোয়ারেরা হাত-পা বেঁধে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মেরেছে। খুনি ১৬ জনের মধ্যে একজনের মনেও কি দয়া হয় নাই?

মামলার বাদী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান বলেন, উচ্চ আদালতেও আমরা ন্যায়বিচার প্রত্যাশী। খুনিরা ও তাদের স্বজনরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে যা ইচ্ছা তাই লিখে যাচ্ছে। আমাদের জন্য খুনি ও তাদের স্বজনদের ব্যবহৃত ফেসবুকই হচ্ছে চরম আতঙ্ক।

আদালতের পিপি আইনজীবী হাফেজ আহমেদ বলেন, নুসরাতের ওপর নৃশংস ও বর্বর ঘটনা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নজরে এলে তিনি মর্মাহত হয়ে ৭ এপ্রিল তার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। নুসরাতের মৃত্যুর পর ১৫ এপ্রিল তার মা-বাবাকে প্রধানমন্ত্রী নিজ দফতরে ডেকে সান্ত্বনা দিয়ে ন্যায়বিচারের অশ্বাস দেন। আমরা আদালতে ন্যায়বিচার পেয়েছি। উচ্চ আদালতেও ন্যায়বিচার পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

প্রসঙ্গত, গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদদৌলা নিজ কক্ষে ডেকে নিয়ে নুসরাতের শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় তার মা শিরিনা আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করলে অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। মামলা তুলে না নেওয়ায় ৬ এপ্রিল মাদ্রাসার প্রশাসনিক ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয় সিরাজউদদৌলার অনুগতরা। পরে ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান (নোমান) সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। পরে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। ২৮ মে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) তদন্ত শেষে মাদ্রাসার অধ্যক্ষসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে আদালতে ৮৬৯ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র দাখিল করেন। মাত্র ৬১ কার্যদিবসে মামলার কার্যক্রম শেষ হয়। আর মামলার তদন্ত কার্যক্রম শেষ করতে পিবিআইয়ের লাগে ৩৩ কার্যদিবস। ২৪ অক্টোবর রায়ে ১৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ। পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে একলাখ টাকা করে জরিমানাও করেন তিনি।

দণ্ডিতরা হলেন- সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ এসএম সিরাজউদদৌলা (৫৭), নুর উদ্দিন (২০), শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), কাউন্সিলর ও সোনাগাজী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাকসুদ আলম (৫০), সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন (১৯), হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), আবছার উদ্দিন (৩৩), কামরুন নাহার মনি (১৯), উম্মে সুলতানা পপি (১৯), আব্দুর রহিম শরীফ (২০), ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), ইমরান হোসেন মামুন (২২), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও মাদরাসার -সভাপতি রুহুল আমিন (৫৫), মহিউদ্দিন শাকিল (২০) ও মোহাম্মদ শামীম (২০)।

সূত্র জানায়, ২৯ অক্টোবর আসামিদের মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য (ডেথ রেফারেন্স) মামলার যাবতীয় কার্যক্রম হাইকোর্টে পৌঁছে। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ হলে দণ্ড অনুমোদনের জন্য মামলার যাবতীয় কার্যক্রম উচ্চ আদালতে পাঠাতে হয়। সে অনুসারে ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পেপারবুক (মামলার যাবতীয় নথি) ছাপানো শেষ করা হয়েছিল। পরে প্রয়োজনীয় কাজ শেষে শুনানির জন্য মামলাটি প্রধান বিচারপতি বরাবর উপস্থাপন করা হয়। আপিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শুনানির জন্য বেঞ্চ গঠন করেন প্রধান বিচারপতি। বিচারপতি হাসান ইমাম ও সৌমেন্দ্র সরকারের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ এ মামলার শুনানির জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের সংকটময় পরিস্থিতি কেটে গেলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এর শুনানি হবে।

 

আরও পড়ুন:
নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যায় ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ড

 

/টিটি/

সম্পর্কিত

লাইভ

টপ