দাম না পেয়ে কোরবানির পশুর চামড়া ফেলা হলো পদ্মায়!

Send
রাজশাহী প্রতিনিধি
প্রকাশিত : ২০:৫৬, আগস্ট ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১২, আগস্ট ০২, ২০২০

প্রকৃত দাম না পেয়ে ছাগলের চামড়া পদ্মা নদীতে ফেলতে নিয়ে এসেছেন ব্যবসায়ীরারাজশাহীতে দাম না পেয়ে কোরবানির পশুর চামড়া পদ্মা নদীতে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। রবিবার (২ আগস্ট) দুপুরের দিকে রাজশাহীর বুলনপুরে আই-বাঁধ সংলগ্ন পদ্মা নদীতে এক হাজার ৫০০ পিস ছাগলের চামড়া ফেলে দেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাজশাহীতে এবার সবচেয়ে কম দামে বিক্রি হচ্ছে কোরবানির পশুর চামড়া। প্রত্যাশিত দামে নিজেরা বিক্রি করতে না পেরে অনেকেই চামড়া সরাসরি দান করেছেন মাদ্রাসা অথবা এতিমখানায়। আবার সেসব চামড়া নিয়েও পড়েছে বিপাকে পড়েছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো। অনেক মৌসুমি ব্যবসায়ী বিক্রি করতে না পেরে সংগ্রহ করা চামড়া পদ্মা নদীতে ফেলে দিয়েছেন। সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করলেও প্রতি পিস গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে তিনশ’ থেকে চারশ’ টাকা দরে। আর ছাগলের চামড়া বিক্রি হয়েছে ১০ থেকে ৩০ টাকা প্রতি পিস। ছোট আকারের ছাগলের চামড়া বিক্রিই করতে পারেননি অনেকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আড়তদারদের বিনামূল্যে কোরবানির পশুর চামড়া দিতে বাধ্য হয়েছেন তারা।

রবিবার (২ আগস্ট) রাজশাহী নগরীর আই-বাঁধ এলাকায় কয়েকজন মৌসুমি ব্যবসায়ীকে প্রায় দেড় হাজার গরু-ছাগলের চামড়া পদ্মা নদীতে ফেলে দিতে দেখা গেছে। এসব ব্যবসায়ী জানান, তারা রাজশাহীর বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে ঘুরে চামড়া কিনেছেন। তারপর বিক্রির জন্য চামড়া রাজশাহী নগরীর রেলগেট এলাকায় আড়তে নিয়ে যান। কিন্তু তারা যে দামে কিনেছেন তার তিন ভাগের একভাগও দাম বলা হয়নি। এসব চামড়া তাদের অন্য কোথাও বিক্রি করতে বলা হয়। কিন্তু তারা খোঁজ নিয়ে দেখেছেন, কোথাও চামড়ার চাহিদা নেই। তারা যে দামে চামড়া কিনেছেন তার অর্ধেক দামও পাবার সম্ভাবনা নেই। তাই ক্ষোভে তারা এসব চামড়া নদীতে ফেলে দিয়েছেন।

ছাগলের চামড়া ফেলা হচ্ছে নদীতেফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও শেয়ার দিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। তৌহিদ ফেরদৌস তন্ময় নামের একজন ফেসবুক ব্যবহারকারী এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও পোস্ট দিয়ে লিখেছেন, ‘রাজশাহীর মৌসুমি চমড়া ব্যবসায়ীরা চামড়ার দাম না পেয়ে কোরবানির পশুর চামড়া পদ্মা নদীতে ফেলে দিচ্ছেন। রাজশাহীর আই-বাঁধ সংলগ্ন নদীতে চামড়াগুলো ফেলে দিয়েছেন তারা। এভাবেই নষ্ট হচ্ছে আমাদের দেশের সম্পদ ও পদ্মা নদীর পরিবেশ।’

অভিযোগ রয়েছে, মূলধন বকেয়ার অজুহাত দেখিয়ে অধিক মুনাফার আশায় বড় আড়তদারদের সিন্ডিকেট বাজার নিম্নমুখী করে রেখেছে। যদিও আড়তদাররা দায়ী করছেন ট্যানারি মালিকদের।

ঈদের দিন রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চামড়া ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দামও দিতে চাইছিলেন না। চামড়া দেখে তারা নিজেরা ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করছিলেন। ক্রেতা-বিক্রেতার কোনও দরকষাকষি দেখা যায়নি। একরকম নিজেদের নির্ধারণ করে দেওয়া দামেই চামড়া কিনছিলেন ব্যবসায়ীরা। চামড়া নিতে তাদের খুব একটা আগ্রহও দেখা যায়নি। মাঝারি আকারের একটি গরুর চামড়া ৫০ থেকে ১৫০ টাকায় কিনতে দেখা গেছে। আর বড় আকারের গরুর চামড়ার দাম দেওয়া হয়েছে সর্বোচ্চ ৩০০ টাকা। ছাগলের চামড়ার দাম দেওয়া হয়েছে ৫ টাকা থেকে ৩০ টাকা।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার কুমরপুর গ্রামের বাসিন্দা আবু জাফরসহ সাত জন ব্যক্তি একসঙ্গে একটি গরু কোরবানি দেন। আবু জাফর বলেন, আমাদের গরুটার দাম ছিল ৯০ হাজার টাকা। মাংস হয়েছে চার মণ। চামড়ার দাম পেয়েছি ২০০ টাকা। এ দামেও চামড়া কিনছিলেন না ব্যবসায়ীরা। একরকম জোর করেই তাকে চামড়াটা দেওয়া হয়েছে। আমাদের এলাকায় পাঁচ টাকাতেও খাসির চামড়া বিক্রি হয়েছে।

প্রকৃত দাম না পেয়ে ছাগলের চামড়া পদ্মা নদীতে ফেলছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরাএদিকে দরদামে না হলে প্রকৃত ব্যবসায়ী চলে যাওয়ার পর কোথাও কোথাও সামান্য কিছু দাম দেশি দিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের চামড়া কিনতে দেখা গেছে। কিন্তু সেসব চামড়া আর কেনা দামেও তারা বিক্রি করতে পারেননি। এতে তারা লোকসানে পড়েন।

রাজশাহী চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি আসাদুজ্জামান মাসুদ বলেন, আমাদের বকেয়া টাকা পড়ে আছে ট্যানারি মালিকদের কাছে। করোনার কারণে হাতেও টাকা নেই। সরকার কমিয়ে দাম নির্ধারণ করে দিলেও প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছে সেই দামেও চামড়া কেনার টাকা নেই। ফলে কম দামে তারা চামড়া কিনেছেন।

তিনি জানান, মৌসুমি ব্যবসায়ীরা নিজেরা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা ঢাকায় ট্যানারি মালিকদের কাছে পাঠান না। তারা কেনার পর সেই চামড়া আবার প্রকৃত ব্যবসায়ীদের কাছেই বিক্রি করেন। কিন্তু এবার তাদের কাছ থেকে চামড়া কেনার আগ্রহ নেই প্রকৃত ব্যবসায়ীদের। এ কারণে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বিপাকে পড়েছেন।

রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ দফতর জানিয়েছে, কোরবানির আগে জেলায় গরু-মহিষ ছিল প্রায় এক লাখ। আর ছাগল ছিল দুই লাখ ২৮ হাজার। অন্যান্য পশু ছিল ৪২ হাজার। সব মিলে কোরবানির জন্য পশু ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার। জেলায় আড়াই লাখের মতো পশু কোরবানি হওয়ার কথা। তবে প্রকৃত হিসাবটা এখনও প্রস্তুত হয়নি।

আরও পড়ুন: চামড়া ডাস্টবিনে, হতাশ মাদ্রাসা ও এতিমখানা কর্তৃপক্ষ




 

/টিটি/এমওএফ/

লাইভ

টপ