‘তিন মাস ধরি প্লাস্টিক আর সিন্যার তলত থাকি’

Send
আরিফুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত : ১৩:৪৫, আগস্ট ১২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:২১, আগস্ট ১২, ২০২০

বসতবাড়ি হারিয়ে ঝুপড়িতে থাকছেন রহিমা
‘তিন মাস আগত নদীত বাড়ি ভিটা সোউগ (সব) গেইছে। ঘরবাড়ি, জিনিসপত্র কিছুই আটকাবার পাই নাই। সেই থাকি প্লাস্টিক আর সিন্যার (পাটখড়ি) তলত থাকি। চরত এলা অভাব, খাবার খুব কষ্ট। চেয়ারম্যান মেম্বর কাইয়ো এখনা সাহায্য করবার আইসে নাই। ফির বোলে বান আইসপে, একটা ঘর না হইলে কেমন করি থাকি!’ বন্যা, ভাঙন আর খাদ্যকষ্টে নাজেহাল ব্রহ্মপুত্রে দ্বীপচর চর গুঁজিমারিতে আশ্রয় নেওয়া রহিমা বেগম নিজের কষ্টের কথা এভাবেই জানালেন।

রহিমা তিন মাস ধরে থাকেন পলিথিন আর আধা পচা পাটখড়ির ঝুপড়িতে। তবে ঘরের বেশিরভাগ অংশই বেষ্টনীহীন, ফাঁকা, এক পাশ থেকে অপর পাশ দেখা যায়। 
রহিমা বলেন, ভাঙনে সব হারিয়ে চর বাগুয়া থেকে চর গুঁজিমারিতে এসে ঝুপড়ি করে থাকছেন। তার স্বামী পোদ্দার আলী দীর্ঘদিন থেকে রোগাক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী। এক মেয়ের বিয়ে দিলেও যৌতুক দিতে না পারায় তাকে ফেরত পাঠিয়েছে জামাই। দুই ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে ওই ঝুপড়িতেই তাদের বাস। 
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা ইউনিয়নের চর বাগুয়ায় গত এক বছরে শতাধিক পরিবার গৃহহারা হলেও কারও ভাগ্যে পুনর্বাসনের সহায়তা মেলেনি বলে। সব হারিয়ে তারা আশ্রয় নিয়েছেন হাতিয়া ইউনিয়নের চর গুঁজিমারিতে। দীর্ঘমেয়াদি বন্যায় পানিবন্দি থাকলেও সরকারি ত্রাণ পাননি বলে অভিযোগ তাদের। 

নদী ভাঙন
সম্প্রতি চর গুঁজিমারিসহ সাহেবের আলগা ও হাতিয়া ইউনিয়নে গিয়ে দেখা যায়,  ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে একের পর এক বসতভিটা নদের গর্ভে চলে গেছে। কিছু ভিটার ক্ষতচিহ্ন এখনও দৃশ্যমান। বানের পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়িতে কাদা আর আবর্জনা। কেউ কেউ বসতভিটা মেরামতে ব্যস্ত হলেও অনেক পরিবার ভিটে হারিয়ে অস্থায়ী ব্যবস্থায় বসবাস করছেন। নৌকা দেখলেই স্থনীয়রা এগিয়ে আসেন সাহায্যের প্রত্যাশায়।
চর গুঁজিমারির বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম জানান, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে চরের শতাধিক পরিবার গৃহহারা হয়েছে। এছাড়া সদ্য শেষ হওয়া বন্যায় ওই এলাকায় বাড়িঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিসহ জমির আবাদ নষ্ট হয়েছে। অভাবের তাড়নায় মানুষ গরু, ছাগল ও মুরগি সস্তা দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। দীর্ঘদিন পানিবন্দি থাকায় কর্মহীন মানুষ আবাসন কষ্ট সহ খাদ্য কষ্টে দিন যাপন করছে।
আমিনুল বলেন, ‘ভাঙনে ভিটেহারা মানুষ চরের পশ্চিম অংশে একটি গুচ্ছ গ্রামে অস্থায়ীভাবে চালা তুলে থাকছেন। কিছু ছাত্র কয়েকটি পরিবারকে সাহায্য করলেও চেয়ারম্যান মেম্বারদের কেউ সাহায্য নিয়ে আসেনি।’
সাহেবের আলগা ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ড ইউপি সদস্য গোলাম মোস্তফা জানান, তার নিজের বাড়িও ভাঙনে বিলীন হয়েছে। তিনটি মসজিদ ও দু’টি বিদ্যালয়সহ তার ওয়ার্ডের শতাধিক পরিবার ব্রহ্মপুত্রে বিলীন হয়েছে। কিন্তু দুর্গতদের হাতে গোনা কয়েকটি পরিবারের জন্য খাদ্য সহায়তা ছাড়া পুনর্বাসনে আর কোনও বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।

দুর্গত এলাকা
সাহেবের আলগা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সিদ্দিক আলী মন্ডল জানান, বন্যায় যে পরিমাণ ত্রাণ পাওয়া গেছে তা দিয়ে সব দুর্গত পরিবারে সহায়তা করা সম্ভব হয়নি। আরও বরাদ্দ পেলে বঞ্চিতদের সহায়তা দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘ভিটেমাটি হারা পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে এখনও কোনও সহায়তা পাওয়া যায়নি।’
পুনর্বাসন প্রসঙ্গে উলিপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল কাদেরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি মিটিংয়ে থাকায় তাকে পাওয়া যায়নি। তবে উপজেলা পরিষদের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ওই উপজেলার ৮ ইউনিয়নের ২ হাজার ৯০ টি পরিবার ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার ভাঙনের শিকার। তবে এখন পর্যন্ত তাদের পুনর্বাসনে কোনও সহায়তা বরাদ্দ পাওয়া যায়নি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তার কার্যালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বন্যায় জেলায় ৫৬ ইউনিয়নের প্রায় তিন লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বানভাসিদের জন্য ৪০০ মেট্রিকটন জিআর চাল ও ১৬ লাখ টাকা নগদ উপ-বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ৮ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার, শিশু খাদ্যের জন্য ১০ লাখ এবং গো খাদ্যের জন্য ১২ লাখ টাকা উপ-বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। 

নদী ভাঙন কবলিত এলাকা
তবে বানভাসিদের জন্য খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা নেওয়া হলেও ভাঙনে ভিটেহারা পরিবারগুলোর জন্য এই মুহূর্তে কোনও সুখবর নেই। ছিন্নমূল অবস্থায় অনেক পরিবার জীবন নির্বাহ করলেও পরিসংখ্যান পাওয়ার আগ পর্যন্ত আপাতত খাদ্য সহায়তা ছাড়া তাদের পুনর্বাসনের কোনও বরাদ্দ নেই বলে জানিয়েছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আব্দুল হাই সরকার।
তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে কিছু টিন থাকলেও ভাঙনের শিকার পরিবারগুলোর চূড়ান্ত সংখ্যা না পাওয়ায় এই মুহূর্তে সেগুলো বিতরণ সম্ভব হচ্ছে না। আমরা সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিবেদন চেয়েছি। বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ক্ষতিগ্রস্তদের বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় পুনর্বাসিত করা হবে।’

/এসটি/এমএমজে/

লাইভ

টপ