দেশজুড়ে পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা, অসাধু ব্যবসায়ীদের জরিমানা শুরু

Send
বাংলা ট্রিবিউন ডেস্ক
প্রকাশিত : ২১:৪৯, সেপ্টেম্বর ১৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ০৫:৩৯, সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২০

হুট করে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করায় অস্থিরতা বেড়েছে পেঁয়াজের বাজারে।বাজারে মোটেও সংকট নেই, উৎপাদনও হয়েছে বিপুল পরিমাণে, আমদানিও হয়েছে হাজার হাজার ট্রাক। তারপরও ভারত সরকারের ঘোষণা শুনেই কিছু মুনাফাখোর ব্যবসায়ী একদিনেই অস্থির করে ফেলেছে সারা দেশের পেঁয়াজের বাজার। প্রশাসনও কঠোর অবস্থানে রয়েছে। দেশের বিভিন্ন জেলায় শুরু হয়েছে পেঁয়াজের আড়তদার ও খুচরা দোকানদারদের বিরুদ্ধে অভিযান। সারা দেশ থেকেই এসব খবর জানিয়েছেন  আমাদের প্রতিনিধিরা।

ভুক্তভোগীরা জানান, গত বছরের অভিজ্ঞতার পর এ বছর দেশে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। এত বেশি উৎপাদন যে সরকারি-বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় মিসর, তুরস্ক ও প্রতিবেশী মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দেশের বাজারে বিপুল পরিমাণ পেঁয়াজ থাকা সত্ত্বেও ভারত আবারও পণ্যটি রফতানির ঘোষণা দিলে দেশের কৃষকরা তাদের স্বার্থ নষ্ট হওয়ার ভয়ে আমদানি না করতে সরকারের কাছে আবেদনও জানিয়েছিল। বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিও প্রথমে বলেছিলেন, ভারতের পেঁয়াজ আর নেবেন না। কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাকও বলেছিলেন, দেশে যথেষ্ট পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে, এ বছর পেঁয়াজের সংকট হবে না। এরপরও নানা পক্ষের চাপ ও ভবিষ্যতের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে গত মার্চের শুরুর দিকেই ভারত থেকে পেঁয়াজ আমদানির অনুমোদন দেয় সরকার। গত ২৭ মার্চ করোনা পরিস্থিতির কারণে দেশজুড়ে লকডাউন শুরু হওয়ার আগেই দেশের ভেতরে চলে আসে বিপুল পরিমাণ ভারতীয় পেঁয়াজ। এমনকি কাঁচাপণ্য হওয়ার কারণে লকডাউনের মধ্যেও হিলি, পেট্রাপোল ও ভোমরা বন্দরের ওপারে আটকে থাকা পেঁয়াজবাহী ভারতীয় ট্রাকগুলোকে পণ্য খালাস করার অনুমতি দেওয়া হয় বিশেষ বিবেচনায়। লকডাউনের পরও ভারত থেকে যেসব পণ্য আমদানি হয়েছে তার ৭০ শতাংশই পেঁয়াজ। অথচ ভারত সরকার হুট করে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দেওয়ার ঘোষণা দিতে না দিতেই আবারও অস্থিরতা শুরু হয়েছে পেঁয়াজের বাজারে।

লক্ষ্মীপুরে এক পেঁয়াজের আড়তে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান।

মুনাফাখোর ব্যবসায়ী কারা?

কথায় কথায় বলা হয়, মুনাফাখোর ব্যবসায়ীদের কারসাজিতেই পেঁয়াজের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছে। তো এই মুনাফাখোর ব্যবসায়ী কারা? অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আমদানিকারক, পেঁয়াজের আড়তদার- মূলত এদের দায়ী করা হলেও মুনাফালোভী আসলে প্রতিটি বাজারের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী থেকে গলির দোকানদাররাও। গতকাল ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে মৌখিকভাবে ও রাতে আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন দিয়ে পেঁয়াজ রফতানি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব দোকানদারের বেশিরভাগই নতুন করে আড়ত থেকে কোনও পেঁয়াজ না কিনেই আগে তাদের স্টকে থাকা পেঁয়াজের দাম দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অর্থাৎ এ ঘোষণাকে ধান্দা হিসেবে নিয়ে ক্রেতাদের ওপর চড়াও হয়েছেন তারা। স্বাভাবিক ব্যবসায়ের বদলে হুজুগ তুলে এমন মুনাফা লোটার চেষ্টা ধর্মীয়ভাবে গর্হিত, রাষ্ট্রের আইনেও অসাধু কারবার হিসেবে চিহ্নিত।

মৌলভীবাজারের একটি আড়তে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান

দেশজুড়ে প্রশাসনের অভিযান শুরু

পেঁয়াজের কৃত্রিম সংকটটি গত বছরও এসব অসাধু ব্যবসায়ী করেছিল। ফলে তাদের চিহ্নিত করা এ বছর প্রশাসনের পক্ষে মোটামুটি সহজ। এ কারণে দেশের বিভিন্ন জেলায় পেঁয়াজের আড়ত, পাইকারি ও খুচরা দোকানগুলোতে অভিযান চালিয়েছে জেলা-উপজেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত। সবখানেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারকরা কাউকে শাস্তি দেওয়ার আগে তার কাছে বর্ধিত মূল্যে পেঁয়াজ কেনার চালানপত্র বা ইনভয়েস দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু দেশের কোথাও বর্ধিত মূল্যে বা উচ্চমূল্যে পেঁয়াজ কেনার কোনও চালানপত্র বা মেমো বা ইনভয়েস দেখাতে পারেননি দোকানদাররা। এ কারণেই অতি মুনাফালোভী এসব ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা ও জরিমানা করে তা আদায় করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। জেলা প্রশাসন থেকে বলা হয়েছে, আদালতগুলোর এমন অভিযান অব্যাহত থাকবে। 

বেনাপোলের একটি আড়তে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান

বেনাপোল প্রতিনিধি জানান, ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে পর্যাপ্ত পরিমাণ পেঁয়াজ আড়তে মজুত রেখে হুট করে দাম বাড়ানোর কারণে বেনাপোলের ৩ ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শার্শা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুলক কুমার মণ্ডল।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পুলক কুমার মণ্ডল এ আদালত পরিচালনা করেন।

আদালত জরিমানাপ্রাপ্ত  প্রতিষ্ঠান  মেহেরাব স্টোরের মালিক সুরুজ মিয়াকে ভোক্তা অধিকার আইনের ৩৮, ৩৯, ৪০ ধারায় ১৫ হাজার টাকা, মেসার্স খান এ সবুর বাণিজ্যভাণ্ডারের মালিক সবুর খানকে ৫ হাজার টাকা ও মিম বাণিজ্যভাণ্ডারের মালিক মো. শুকুর আলীকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, লক্ষ্মীপুরে অভিযান চালিয়ে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করা ও মাল ক্রয়ের চালান দেখাতে না পারায় ২টি আড়তকে ৬ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার দুপুরে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আবু ওয়াদুদের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সহকারী কমিশনার (সাধারণ) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শারমিন আক্তার সুমী।

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, লক্ষ্মীপুর শহরে বাজার পরিদর্শনকালে দেখা গেছে ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন এবং পেয়াজ ক্রয়ের চালানপত্র (ইনভয়েস) চাইলে দেখাতে পারেননি। তাই রিহান ট্রেডার্সের মোহাম্মদ সুজনকে ৪ হাজার টাকা ও কবির ট্রেডার্সের এমরান হোসেনকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।

গত সপ্তাহে পেঁয়াজ ছিল ৩০ টাকা কেজি। সপ্তাহের ব্যবধানে তা ৬৫ টাকা দরে বিক্রি করছিল এসব প্রতিষ্ঠান। পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি।

ঠাকুরগাঁওয়ের একটি আড়তে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান

ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি জানান, ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করেছে এ খবর পত্রিকায় আসতেই ঠাকুরগাঁওয়ের পেঁয়াজ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দাম দ্বিগুণ-তিণগুন বাড়িয়ে দেয়। আর এই বাড়তি দামে পেঁয়াজ বিক্রির দায়ে পৌর শহরের কাঁচামালের আড়তে অভিযান চালিয়ে ব্যবসায়ীদের জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকালে সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন সেখানে অভিযান চালিয়ে এ জরিমানা করেন।

জানা যায়, শহরের গোবিন্দনগরস্থ সমবায় মার্কেটের কাঁচাবাজারের আড়তে পেঁয়াজ ক্রয়মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে বলে ক্রেতাসাধারণ অভিযোগ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আড়তে অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় সমবায় মার্কেটের মেসার্স আল আমিন ট্রেডার্সে ক্রয়মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে অতিরিক্ত দামে পেঁয়াজ বিক্রির প্রমাণ পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত ব্যবসায়ী আব্দুল জব্বারকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

এ সময় তিনি আড়তের বেশ কিছু পাইকারি ও খুচরা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ঘুরে দেখেন এবং তাদের ইনভয়েস চেক করেন। তিনি অতিরিক্ত দামে পেঁয়াজ বিক্রি না করতে ব্যবসায়ীদের নির্দেশ দেন। ক্রয়মূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে অতিরিক্ত দামে বিক্রি বন্ধে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলে জানান নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ আল মামুন।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি আড়তে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় চড়া দামে পেঁয়াজ বিক্রি করার দায়ে দুই ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিকালে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী কসবার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবা খানমের নেতৃত্বে গঠিত ভ্রাম্যমাণ আদালত কসবা পুরাতন বাজারে অভিযান চালিয়ে তাদের অর্থদণ্ড দেন।

এ সময় মেসার্স মোস্তাক ব্রাদার্সকে ৫ হাজার ও মহাদেব সাহা এন্টারপ্রাইজকে ৩ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হয়।

এ ব্যাপারে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী কসবা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হাসিবা খান বলেন, বিকালে কসবা পুরাতন বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য মনিটরিং করা হয়। এ সময় দেখা যায় নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে এক রাতের ব্যবধানে পাইকারি ব্যবসায়ী মেসার্স মোস্তাক ব্রাদার্স এবং মহাদেব সাহা কেজিতে ২০ টাকা দেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করছেন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে বেশি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করায় এবং সরকার নির্ধারিত পণ্যের বিক্রিকৃত মূল্য তালিকা না থাকায় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর ৪০ ধারায় মেসার্স মোস্তাক ব্রাদার্সকে ৫ হাজার ও মহাদেব সাহাকে ৩ হাজার অর্থদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পেঁয়াজের বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

নরসিংদীর একটি আড়তে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান

নরসিংদী প্রতিনিধি জানান, বাজারে পেঁয়াজের দাম বৃদ্ধি করে অধিক মুনাফা আদায়কারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে নরসিংদী জেলা পুলিশ। নরসিংদীর পুলিশ সুপার প্রলয় কুমার জোয়ারদারের নির্দেশে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকাল থেকেই নরসিংদীর বড় বাজারসহ বিভিন্ন থানা পর্যায়ে বাজার মনিটরিং শুরু করে পুলিশ।

পুলিশ জানায়, সোমবার নরসিংদীর বিভিন্ন বাজারে ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছিল। ২৪ ঘণ্টা না পার হতেই মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) খুচরা বাজারে ৮০ থেকে ৮৫ টাকায় বিক্রি শুরু হয়। এ কারণে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত শহরের নরসিংদী বাজার, বটতলা ও শাপলা চত্বর বাজারে জেলা পুলিশের একাধিক টিম মনিটরিংয়ের মাধ্যমে পেঁয়াজের বর্তমান মূল্য যাচাই করা এবং গুদামে পেঁয়াজের মজুত করা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখে।

বাজার বণিক কমিটির সভাপতি মো. বাবুল সরকার বলেন, বাজারে দেশি পেঁয়াজ ৭০ টাকা ও ভারতীয় পেঁয়াজ ৬০ টাকা কেজির থেকে বেশি দামে ব্যবসায়ীরা বিক্রি করবেন না। অতিরিক্ত দামে বিক্রি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

হিলি প্রতিনিধি জানান, দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে বাড়তি দামে পেঁয়াজ বিক্রি করার দায়ে তিন পেঁয়াজ ব্যবসায়ীকে ২ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

মঙ্গলবার দুপুরে নবাবগঞ্জ উপজেলা সদরের কাঁচাবাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে নবাবগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আল মামুন এই জরিমানা আদায় করেন।

নবাবগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আল মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, স্থানীয়দের মাধ্যমে জানতে পারি যে ভারত পেঁয়াজ রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে এমন খবরে পেঁয়াজ ব্যবসায়ীরা ৫০ টাকা কেজির পেঁয়াজ দাম বাড়িয়ে ১০০ থেকে ১২০ টাকা করে নিচ্ছে। দেশে যেহেতু এ মুহূর্তে পেঁয়াজের সংকট নেই তাই অভিযোগটি গুরুতর। তাই এমন অভিযোগের ভিত্তিতে দুপুরে বাজারে অভিযান চালিয়ে বাড়তি দাম নেওয়ায় তিন পেঁয়াজ ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। পেঁয়াজের বাজার নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।

মৌলভীবাজারের একটি বড় মুদি দোকানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান

মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, পেঁয়াজসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখতে মৌলভীবাজারে জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে ২০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করেছেন।

১৫ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বিকেলে সদর উপজেলার পশ্চিমবাজার এলাকায় মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের নির্দেশনায় দু’জন ম্যাজিস্ট্রেট ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।

এ সময় পেঁয়াজ ও চালের বাজারমূল্য যাচাই করা হয় এবং মূল্য তালিকা যথাযথভাবে প্রদর্শন না করা, ক্রয় ও বিক্রয় রসিদের কপি যথাযথভাবে সংরক্ষণ না করা, পণ্য বিক্রিতে অতিরিক্ত লাভ করা ইত্যাদি অপরাধে কৃষি বিপণন আইন-২০১৮-এর আওতায় সাতটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট সাতটি মামলায় ২০ হাজার পাঁচশত টাকা অর্থদণ্ড প্রদান ও আদায় করা হয়।

ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন নির্বাহী  ম্যাজিস্ট্রেট মো. আরিফুল ইসলাম ও ম্যাজিস্ট্রেট মো. রফিকুল ইসলাম।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, মৌলভীবাজার শহরের পশ্চিমবাজার এলাকায় সাতটি প্রতিষ্ঠানেরে বিরুদ্ধে দেওয়া সাতটি মামলায় ২০ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করেছেন। 

নীলফামারীর একটি পেঁয়াজের আড়ত

নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, জেলায় একদিনের ব্যবধানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে প্রতি কেজিতে ৩০ টাকা। গত সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) ওই পেঁয়াজ ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও আজ মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিক্রি হয়েছে ৯০ টাকা দরে। আবার খুচরা বাজারে কোনও কোনও দোকানদার ১০০ টাকা কেজি দরেও বিক্রি করছে।
জেলা শহরের কিচেন মার্কেটের ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা বলছেন, গত সোমবার দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৬০ টাকা দরে। আর ভারতীয় পেঁয়াজের বিক্রি হয়েছিল ৫০ থেকে ৫২ টাকা। সেখানে আজ প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ৩০ টাকা। একদিনের ব্যবধানে এমন অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিতে নাভিশ্বাস ঊঠেছে সাধারন মানুষের। অস্বস্তির এমন বাজারে বিক্রিও কমেছে ব্যবসায়ীদের।
মঙ্গলবার বেলা ১২টার দিকে ওই বাজার ঘুরে দেখা যায়, পেয়াজের দামের ঊর্ধ্বগতি। পাইকারি দোকানে প্রকারভেদে প্রতি কেজি ৮০ থেকে ৯০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। খুচরা দোকানে বিক্রি হয়েছে ১০০ টাকা দরে।
ওই বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী নূর আমীন (৪৫) বলেন, ‘মঙ্গলবার সকালে আড়তে প্রতি মণ পেঁয়াজের দাম ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়। বেলা ১১টার দিকে তা কমে দাম ধরেছে ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ২০০ টাকা। সেখানে গত সোমবার প্রতি মণের (৪০ কেজি) দাম ছিল ২ হাজার থেকে ২ হাজার ২০০ টাকা। তিনি জানান, সোমবার আড়তে দাম কম থাকায় বাজারে দাম কম ছিল। তা আজ মঙ্গলবার দাম বাড়ায় বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন,‘আমরা আড়ত থেকে যে দামে কিনে আনি তার চেয়ে কেজিপ্রতি সামান্য লাভ করে বাজারে বিক্রি করি। আড়তে দাম বেশি ধরলে আমাদের করার কিছু নেই।’
অপর পাইকারি ব্যবসায়ী রাশেদুল ইসলাম (৩৫) বলেন, ‘পেঁয়াজ আমাদের স্টকে থাকে না। প্রতিদিন মোকাম থেকে কিনে এনে বিক্রি করতে হয়। আড়তের দামের চেয়ে সামান্য লাভ করে খুচরা ব্যবসায়ী ও ভোক্তাদের মাঝে বিক্রি করি। গতকালের তুলনায় মঙ্গলবার অস্বাভাবিক দামে ভোক্তারা যেমন অস্বস্তিতে পড়েছে তেমনি ব্যবসায়ীদেরও বিক্রি কমেছে।’
বাজারের খুচরা ব্যবসায়ী বুলু মিয়া (২৫) বলেন,‘ এক সপ্তাহ আগে প্রতি কেজি দেশি পেঁয়াজ বিক্রি করেছি ৪০ টাকা দরে। সোমবার সে পেঁয়াজ বিক্রি করেছি ৬০ টাকা দরে। আজ মঙ্গলবার দেশি পেঁয়াজ বিক্রি হয়েছে ৯০ টাকা দরে। আর আমদানি করা পেঁয়াজ বিক্রি করেছি ৮০ থেকে ৮৫ টাকা দরে।’
ওই বাজারের ক্রেতা সোনালী ব্যংকের সাবেক ব্যবস্থাপক রবিউল হক বলেন, ‘প্রতি কেজি পেঁয়াজ বাজারে ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল। গত এক সপ্তাহের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দাম বেড়ে গত সোমবার ৬০ টাকায় পৌঁছে। আজ খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজের কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ৩০ টাকা। একদিনের ব্যবধানে এমন দাম বাড়ার বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হয়েছে আমার কাছে।’
অপর ক্রেতা পৌর শহরের হাড়োয়া মহল্লার বাসিন্দা মমিনুল ইসলাম (৪৪) বলেন, ‘আমি প্রতি সপ্তাহে একবার বাজার করি। আজকে বাজারে এসে দেখি পেঁয়াজের দাম বেশি। নিরুপায় হয়ে দেড় কেজি পেঁয়াজ কিনেছি ১৩৫ টাকা দিয়ে। বাড়তি দাম দিয়ে পেঁয়াজ কেনায় অন্য বাজারে টাকার ঘাটতি পড়েছে। ফলে কষ্ট করে সপ্তাহটি কাটাতে হবে।’
জেলা মার্কেটিং কর্মকর্তা এরশাদ আলম খান বলেন, ‘আমরা নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছি। আজ (মঙ্গলবার) বিকালে বড়বাজারে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও র‌্যাবের অংশগ্রহণে অভিযান চালানো হয়। পেঁয়াজের বাজারে এটি অব্যাহত থাকবে।’

পটুয়াখালীর একটি আড়তে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান

পটুয়াখালী সংবাদদাতা জানান, জেলায় পেঁয়াজ ও চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অতিরিক্ত মূল্য এবং ওজনে কম দেওয়ায় তিন দোকানিকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

আজ মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর ১টার দিকে পটুয়াখালীর বিসিক শিল্প নগরীর মাঝগ্রাম ও লাউকাঠি এলাকায় পটুয়াখালী ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ও র‌্যাব-৮ পটুয়াখালী ক্যাম্পের একটি অভিযানিক দল যৌথ উদ্যোগে এ অভিযান পরিচালনা করেন।

র‌্যাব-৮ পটুয়াখালী ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কোম্পানি কমান্ডার মো. রবিউল ইসলাম জানান, দুপুর ১টার দিকে পটুয়াখালীর বিসিক শিল্পনগরী মাঝগ্রাম ও লাউকাঠি এলাকায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় ধার্যমূল্যের চেয়ে অধিক মূল্যে পেঁয়াজ ও চালসহ পণ্য বিক্রয় করা ও ওজনে কারচুপি বা কম দেওয়া এবং পণ্যের মোড়ক সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করার অপরাধে মো. রেজাউল করিমকে ৬ হাজার টাকা, মো. খলিলুর রহমানকে ৩০ হাজার টাকা ও মো. আনোয়ার হোসেনকে ৪ হাজার টাকাসহ মোট ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ সেলিম বলেন, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর ৩৭/৪০ ধারা মোতাবেক অর্থদণ্ড দেওয়া হয়। দোকানিদের এ সময় চাল-ডাল, তেল ও পেঁয়াজসহ নিত্যপণ্যের মূল্য তালিকা প্রদর্শনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাজার মনিটরিংয়ের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।

/টিএন/এমওএফ/

লাইভ

টপ