‘বিরল স্থলবন্দর দিয়ে ভারত ও নেপালের সঙ্গে বাণিজ্য সম্প্রসারিত হবে’

Send
বিপুল সরকার সানি, দিনাজপুর
প্রকাশিত : ১২:০০, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৫, সেপ্টেম্বর ২৬, ২০২০

 

১

দেশে চালু হতে যাচ্ছে আরও একটি স্থলবন্দর। দিনাজপুরের বিরল উপজেলার ভান্ডারা ইউনিয়নের পাকুড়া মৌজায় এ স্থলবন্দরের অবস্থান। এই স্থলবন্দর বাংলাদেশের একমাত্র স্থলবন্দর, যা ব্যবহার করে একই সঙ্গে রেল ও সড়কপথে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও নেপালে পণ্য আমদানি-রফতানি করা যাবে। বন্দরের বাংলাদেশ অংশে রয়েছে দিনাজপুরের বিরল উপজেলা ও ভারত অংশে রয়েছে উত্তর দিনাজপুরের রাধিকাপুর। আর বন্দরটি নেপালের সঙ্গে সংযুক্ত হবে নেপালের ব্যবসায়িক এলাকা বীরগঞ্জের সঙ্গে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অল্প দিনের মধ্যেই বন্দরটি চালু হবে। সে লক্ষ্যে দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণের কাজ চলছে। এ নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে উচ্চ পর্যায়ে আলোচনাও চলছে। 

কেমন হবে এই স্থলবন্দর, কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে আর লাভই বা কেমন হবে,  বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় এসব বিষয়ে জানিয়েছেন বন্দরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন।

বাংলা ট্রিবিউন: বিরল দিয়ে নেপাল যাওয়া যাবে?

সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন: বিরল স্থলবন্দর দিয়ে নেপাল যাওয়া যাবে। তবে নেপালে যাওয়ার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক রুট পঞ্চগড়ের বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর। বিরল স্থলবন্দর দিয়ে শুধু মালামাল আমদানি-রফতানি হবে এবং এর জন্য এটি সবচেয়ে সুবিধাজনক বন্দর হবে।

৩

বাংলা ট্রিবিউন: এই বন্দর কবে নাগাদ চালু হতে পারে?

সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন: বন্দরের কাস্টমস, ইমিগ্রেশন অতিসত্বর চালু হবে। ইতোমধ্যে বন্দর দিয়ে যাত্রীদের ভারতীয় ভিসা দেওয়া শুরু হয়েছে। ট্রেন যোগাযোগ ভালো থাকায় এই বন্দরটি হবে পাসপোর্টধারী যাত্রীদের অন্যতম রুট। ইতোমধ্যে রাস্তা প্রশস্তকরণের কাজ শেষ হয়েছে। এতে পাসপোর্টধারী যাত্রীরা বন্দর এলাকা পর্যন্ত যাতায়াতের সুবিধা পাচ্ছেন। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রীরা বাস ও ট্রেনযোগে বন্দর এলাকাতে অনায়াসে আসতে পারবেন। বন্দর এলাকাতে ইমিগ্রেশন সুবিধা আগামী মাসে চালু হবে। আর রেলওয়ে পথে মালামাল আসা শুরু হয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: কী কী অবকাঠামোগত উন্নতি হয়েছে আরও কী কী করতে হবে?

সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন: যাত্রীদের জন্য ওয়েটিং রুম, কাস্টমস অফিস, ইমিগ্রেশন অফিসের কাজ শেষ হয়েছে। স্থলবন্দর এলাকার নিচু জায়গা মাটি দিয়ে ভরাট করে সমান করার কাজ চলছে। আগামী নভেম্বর থেকে স্থলবন্দর এলাকায় ট্রাক টার্মিনাল, ট্রান্সশিপমেন্ট ইয়ার্ড, বাউন্ডারি, গুদাম ঘর নির্মাণ, লোড-আনলোডিং পয়েন্ট নির্মাণসহ বিভিন্ন অবকাঠামোর কাজ শুরু হবে এবং আগামী বছরের জুনের মধ্যে তা শেষ হবে। এই সময়ের মধ্যে সড়কপথেও আমদানি-রফতানি চালু হবে।

৪

বাংলা ট্রিবিউন: এই স্থলবন্দর হলে এলাকার কী উপকার হবে?

সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন: বন্দরটি জেলা শহর থেকে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে। এখানে একই জেলায় অবস্থিত হিলি স্থলবন্দরের দূরত্ব ৭২ কিলোমিটার। পাশাপাশি সড়ক ও রেলপথে আমদানি-রফতানি করা যাবে। এই বন্দরটি হবে ভারত, বাংলাদেশ ও নেপালের সঙ্গে ত্রিদেশীয় বাণিজ্যের রুট। তাই সহজলভ্যতার পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। শুধু তাই নয়, বন্দরটি চালু হলে প্রায় ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। অর্থনীতিতে প্রভাব পড়বে। নেপাল যে মোংলা বন্দর ব্যবহার করতে চাইছে এই বন্দরটি হবে তার রুট।

বাংলা ট্রিবিউন: রেলপথ আছে, সেটা কী শুধুই পণ্য আনা নেওয়ায় ব্যবহার হবে? নাকি এই রেলপথ দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ সংযোগ হবে?

সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন: বন্দরটি আপাতত পণ্য আমদানি-রফতানির জন্যই চালু হবে। তবে ইমিগ্রেশন চালু থাকায় যাত্রী পারাপার থাকবে। রেলপথ দিয়ে ভারত-বাংলাদেশে যাত্রীরা যাওয়া-আসা করার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বিষয়। যেহেতু ভারত ও বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তাই ভবিষ্যতে সেটাও চালু হবে। বন্দরের ওপারেই রাধিকাপুর রেলওয়ে স্টেশন। এই স্টেশন থেকে ভারতের সব শহরেই রেলে করে যাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে বলাই যায় যে, আপাতত এই রুটটি যাত্রীদের জন্য বেশ সুবিধাজনক হবে। তবে সরাসরি ট্রেন যদি চলাচল করে তাহলে আরও সুবিধা হবে।

বাংলা ট্রিবিউন: জলপাইগুড়ি/শিলিগুড়ি হয়ে দার্জিলিং যাওয়া যাবে কিনা?

সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন: এই স্থলবন্দরের ভারতীয় অংশে রাধিকাপুর অবস্থিত। সেখান থেকে কিছু দূরেই রায়গঞ্জ। রায়গঞ্জ পশ্চিমবঙ্গের একটি সেন্টার বা পয়েন্ট, যেখান থেকে বিহার, শিলিগুড়ি/জলপাইগুড়ি ও কলকাতায় সহজেই যাওয়া যাবে। তাই সীমান্ত পার হয়েই সেখান থেকে শুধু শিলিগুড়ি/জলপাইগুড়িই নয়, অন্য শহরেও যাতায়াত সুবিধা হবে। তবে আপাতত বলা যায় যে, এই বন্দরটি পর্যটনকেন্দ্রিক হবে না। কারণ পর্যটন বা ভ্রমণের জন্য বাংলাবান্ধা বন্দরই সবচেয়ে সুবিধার।

২

বাংলা ট্রিবিউন: এই স্থলবন্দরে ভারতের লাভ বেশি নাকি বাংলাদেশের?

সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন: এই বন্দরটি চালু হলে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে বাংলাদেশ। কারণ এটি শুধু ভারত নয়, নেপালকেন্দ্রিক বন্দর হবে। এতে করে বাংলাদেশ দুটি দেশের সঙ্গে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারবে। নেপালের ব্যবসায়িক এলাকা বীরগঞ্জ। এই এলাকার সঙ্গে বিরল স্থলবন্দরের যোগসূত্র রয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: পণ্য আমদানি-রফতানির ক্ষেত্রে এখানে প্রধান পণ্য কী হবে, পাথর নাকি পেঁয়াজ?

সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন: এই বন্দর দিয়ে প্রধানত আমদানি করা হবে গম, চাল, ভুট্টাসহ বিভিন্ন প্রকারের খাদ্যশস্য, পেঁয়াজ, আদাসহ বিভিন্ন প্রকারের মশলা, পাথর ও কয়লা। আর রফতানি করা যাবে ব্যাটারি, তুলা, পাট ও টেকনোলজি পণ্য। এসব পণ্যের নেপালে বেশ চাহিদা রয়েছে।

বাংলা ট্রিবিউন: উত্তরাঞ্চলে অনেক বন্দর থাকতেও এই বন্দরের প্রয়োজনীয়তা কী?

সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন: নেপাল যে আমদানি-রফতানির জন্য রেললাইন ব্যবহার করতে চাইছে, সেটি হবে এই বন্দরের রেললাইন। শুধু তাই নয়, এই রেললাইনটি ভারতের সঙ্গেও পণ্য আমদানি-রফতানিতে ভূমিকা রাখবে। বন্দরটি চালু হলে আমদানি সহজলভ্য হবে। এই বন্দরের রেল দিয়ে একবারেই প্রায় তিন হাজার মে.টন পণ্য আসবে। যেখানে এই পরিমাণ পণ্য আসতে অন্য বন্দরে সময় লাগে দুই দিন। আবার ওই ট্রেনে করেই সমপরিমাণ পণ্য ভারত বা নেপালে যেতে পারবে। এদিকে রেলওয়ের পাশাপাশি ট্রাকের মাধ্যমেও আমদানি-রফতানি হবে। অর্থাৎ এই বন্দরে একদিনে যে পরিমাণে আমদানি-রফতানি হবে তা অন্য বন্দরের সময় লাগবে তিন দিন। আর অন্য বন্দরগুলো নেপালের সঙ্গে যুক্ত নয়, আবার রেল যোগাযোগও নেই। দেশের যশোর এলাকার রোহনপুরে শুধু রেল যোগাযোগ আছে, সেটিও আবার শুধু ভারতের সঙ্গে।

বাংলা ট্রিবিউন : বন্দর নিয়ে প্রত্যাশা কী?

সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন: আমার প্রত্যাশা সরকার ও স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষ অতিদ্রুত ত্রিদেশীয় সম্পর্ক মজবুত করার লক্ষ্যে রেলওয়ে ও সড়কপথে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম চালু করবে। তাতে করে অবহেলিত জনপদ দিনাজপুরের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা সমৃদ্ধ হবে এবং এই জেলা দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবে। এলাকার ব্যবসায়ীদের উন্নয়ন হবে, এলাকার মানুষের কর্মসংস্থান হবে, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে।

উল্লেখ্য, ব্রিটিশ আমল, স্বাধীনতার পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে দিনাজপুরের বিরলের এ অংশ দিয়ে অনিয়মিতভাবে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম চালু ছিল। পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দর না থাকায় রেলওয়ের মাধ্যমে আসা পণ্য খালাস হতো পার্বতীপুর কিংবা অন্যান্য স্থানে। রেলওয়ে ও সড়কপথে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত, নেপাল ও ভুটানের বাণিজ্যিক লেনদেনের সম্ভাবনা দেখে ২০০৫ সালে বিরল স্থলবন্দর স্থাপনের কার্যক্রম শুরু হয়। ২০০৬ সালে ভারত সরকার সীমান্তের ওপারে রাধিকাপুর পর্যন্ত মিটারগেজ রেলপথকে ব্রডগেজে রূপান্তর করে। কিন্তু বিরল স্থলবন্দর থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ না থাকায় ওই বছরই এই স্থলবন্দর দিয়ে ভারত, নেপাল ও ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্যিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। ২০১১ সালে পার্বতীপুর থেকে বিরল সীমান্ত পর্যন্ত মিটারগেজ রেললাইনকে ব্রডগেজে রূপান্তর করা হয়। ২০১৭ সালে ওই ব্রডগেজ রেলপথ দিয়ে বাণিজ্য শুরু হয়। বর্তমানে রেলপথ দিয়ে অনিয়মিতভাবে তেল, পাথর ও পেঁয়াজবাহী ট্রেন বাংলাদেশে প্রবেশ করে। স্থলবন্দর কাঠামোর মধ্যে সব ধরনের পণ্য খালাস করতে সাইট লাইন নির্মাণের প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া স্থলবন্দর পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ এবং সংযোগ সম্পন্ন হয়েছে। বন্দরটি চালু করতে এরই মধ্যে নৌ-পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, রেলপথ মন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন, বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কেএম তারিকুল ইসলাম, রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা, সড়ক ও জনপদ বিভাগের কর্মকর্তারা, বিজিবির কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা বন্দরটি পরিদর্শন করেছেন।

/টিটি/এমএমজে/

লাইভ

টপ
X