তনুর ভাইয়ের বন্ধুসহ নিখোঁজ চারজনের সন্ধান চায় পরিবার

মহিউদ্দিন মোল্লা, কুমিল্লা
১১ এপ্রিল ২০১৬, ১৯:১৮আপডেট : ১১ এপ্রিল ২০১৬, ১৯:৩৮

হিরু-পারভেজ-শাওন-সোহাগ কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর ভাই আনোয়ার হোসেনের বন্ধু মিজানুর রহমান সোহাগসহ বিভিন্ন সময়ে নিখোঁজ চারজনের সন্ধান চেয়েছে তাদের পরিবার। নিখোঁজ বাকি তিনজন হলেন- কুমিল্লা মহানগর যুবলীগের সদস্য রকিবুল ইসলাম শাওন, কুমিল্লার লাকসামের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম হিরু ও হুমায়ুন কবির পারভেজ।

তনুর ভাইয়ের বন্ধু সোহাগ
১৫ দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন নিহত তনুর ভাই আনোয়ার হোসেনের বন্ধু মিজানুর রহমান সোহাগ (২১)। তিনি র‌্যাবের হাতে আটক হয়েছেন বলে দাবি পরিবারের। সোহাগ ২০১৫ সালে কুমিল্লা সদর উপজেলার আলেকজান মেমোরিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। সেনানিবাস সংলগ্ন কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার নারায়ণসার গ্রামের নুরুল ইসলামের দুই ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে সোহাগ তৃতীয়। বিদেশে যাওয়ার জন্য তিনি প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

সোহাগের বাবা নুরুল ইসলাম জানান, ২৭ মার্চ রাত দেড়টায় সাদা পোশাকে প্রশাসনের লোক পরিচয়ে সোহাগকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি ৩০ মার্চ বুড়িচং থানায় এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেছেন।

তিনি বলেন, তনু হত্যার খবর টিভিতে দেখে তনুর ভাই তার বন্ধু বলে দাবি করেন সোহাগ। এরপর সোহাগ এলাকায় তনু হত্যাকাণ্ডের বিচার চেয়ে বিক্ষোভ করেন। এসব অভিযোগে তার ছেলেকে র‌্যাব তুলে নিয়ে গেছে বলে মনে করেন নুরুল ইসলাম। তিনি ছেলের সন্ধান দাবি করেন।

সোহাগের বড় বোন খালেদা আক্তার বলেন, সোহাগকে ঘুম থেকে তুলে নিয়ে যায়। তাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় আমরা তাদের পরিচয় জানতে চেয়েছি। তারা পরিচয় জানায়নি। উল্টো আমাদের শাসিয়েছে। সোহাগ কোনও অপরাধ করলে তার সাজা হবে। কিন্তু নিখোঁজ থাকাটা আমরা সহ্য করতে পারছি না। আমরা সোহাগকে ফেরত চাই।
আরও পড়ুন: রাজপথে সাইকেল চালানোর বিভিন্ন মূহুর্ত। নৃত্যশিল্পী মুনমুন যখন সাইক্লিস্ট

তনুর ভাই আনোয়ার হোসেন জানান, বুড়িচং উপজেলার কালাকচুয়া কাজীম উদ্দিন খন্দকার উচ্চ বিদ্যালয়ে সোহাগের সঙ্গে পড়েছি। এছাড়া তার বাড়ির কাছে কালাকচুয়া এলাকায় আমি ড্রাইভিং শিখতে যেতাম। সেখানে তার সঙ্গে কথা হতো। মাঝে মাঝে বিকালেও ওই এলাকায় গিয়ে তার সঙ্গে আড্ডা দিতাম। সোহাগ নিখোঁজ হয়েছে বলে শুনেছি। তার জন্য খারাপ লাগছে।

র‌্যাব-১১ কুমিল্লা ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানি-২ এর অধিনায়ক মেজর খুরশিদ আলম জানান, তনুর ঘটনায় সোহাগ নামে কাউকে আটক করা হয়নি।

উল্লেখ্য, গত ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের বাসার কাছেই তনুর লাশ পাওয়া যায়। ২১ মার্চ তার বাবা ইয়ার হোসেন অজ্ঞাতদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় মামলা করেন। হত্যার ২২ দিনেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মৃত্যুর কারণ ও অপরাধীদের শনাক্ত করতে পারেনি।

যুবলীগ নেতা শাওন
দুই বছর ধরে নিখোঁজ কুমিল্লা মহানগর যুবলীগের সদস্য রকিবুল ইসলাম শাওন। শাওনের পরিবারের অভিযোগ, কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার এক এসআইয়ের সঙ্গে বাক-বিতণ্ডার পর ওই রাতে র‌্যাব সদস্যরা তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায়।

শাওনের পরিবারের সূত্র জানায়, ২০১৪ সালের ২৯ মার্চ ভোরে র‌্যাব সদস্যরা কুমিল্লা মহানগরী থেকে রিভলবারসহ এনামুল নামে একজনকে গ্রেফতার করে। পরে এনামুলকে নিয়ে তারা নগরীর মুন্সেফ কোয়ার্টার এলাকার বাসিন্দা কাজী আবদুল মতিনের বাসায় যায়। আবদুল মতিনের ছেলে শাওনকে ঘুম থেকে উঠিয়ে মাইক্রোবাসে তোলা হয়। তখন ওই মাইক্রোবাসে এনামুল বসা ছিলেন। পরের দিন র‌্যাব-১১ কুমিল্লার ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানি-২ এর ডিএডি জাহাঙ্গীর আলম এনামুলকে কোতোয়ালি মডেল থানায় হস্তান্তর এবং তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। কিন্তু রকিবুলকে থানায় হস্তান্তর করা হয়নি।

এ ঘটনায় রকিবুলের স্ত্রী ফারজানা আক্তার ২০১৪ সালের ৩১ মার্চ কোতোয়ালী মডেল থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। এ ঘটনায় ২৭ এপ্রিল কুমিল্লার আদালতে র‌্যাব-১১ এর ১৫ সদস্যের বিরুদ্ধে অপহরণের অভিযোগ এনে মামলা করেন শাওনের মা আনোয়ারা বেগম।

শাওনের মা আনোয়ারা বেগম বলেন, নাতি রাইসা জানতে চায় তার বাবা কোথায়। তাকে বলি, তোমার বাবা ঢাকায় চাকরিতে। তাকে আর কত মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া যায়!

এ বিষয়ে র‌্যাব-১১ কুমিল্লার ক্রাইম প্রিভেনশন কোম্পানি-২ এর তৎকালীন অধিনায়ক মেজর শাহেদ হাসান রাজীব বলেছিলেন, শাওনের পরিবারের অভিযোগ সঠিক নয়। আমরা তাকে তুলে আনিনি।

বিএনপি নেতা হিরু ও হুমায়ুন
কুমিল্লার লাকসামে সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা সাইফুল ইসলাম হিরু ও হুমায়ুন কবির পারভেজ অপহরণের দুই বছরেও উদ্ধার হননি। স্বজনদের অভিযোগ, র‌্যাব তাদের অপহরণ করেছে। তবে দুষ্কৃতিকারীরা তাদের অপহরণ করেছে বলে পুলিশ আদালতে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। পুলিশি প্রতিবেদনে নারাজি দিয়েছেন মামলার বাদী হুমায়ুন কবির পারভেজের ছোট ভাই গোলাম ফারুক।

২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর দুই বিএনপি নেতাকে অপহরণ করা হয়। এদিকে, নিখোঁজ ওই দুই নেতার ফিরে আসার অপেক্ষায় প্রহর গুণছেন স্বজনরা। 

আরও পড়ুন:  এসিডদগ্ধ সুবর্ণা চাকরি করার ‘অপরাধেই’ স্ত্রীর মুখে এসিড নিক্ষেপ

মামলার অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৭ নভেম্বর সন্ধ্যায় দুটি মাইক্রোবাসে র‌্যাব-১১ এর একটি দল লাকসাম উপজেলা বিএনপি সভাপতি সাইফুল ইসলাম হিরুর লাকসামের দৌলতগঞ্জ বাজারের বাংলাদেশ ফ্লাওয়ার মিলে অভিযান চালায়। সেখানে ৯ জনকে আটক করে। অভিযানের ঘণ্টা খানেক পর সড়ক পথে অ্যাম্বুলেন্স যোগে লাকসাম থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে উপজেলা বিএনপি সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম হিরু, পৌরসভা বিএনপি সভাপতি হুমায়ুন কবির পারভেজ ও বিএনপি নেতা জসিম উদ্দিনকে র‌্যাব-১১ এর ওই দল পথে আটক করে। ওই দিন রাতেই আটককৃতদের মধ্যে সাইফুল ইসলাম হিরু এবং হুমায়ুন কবির পারভেজ ছাড়া জসিমউদ্দিনসহ আটককৃত ১০ জনকে র‌্যাব-১১ এর ক্রাইম প্রিভেনশন-২ কুমিল্লা শাকতলার ডিএডি শাহজাহান আলী (পরিচিত নং- ৬০৬২) লাকসাম থানায় হস্তান্তর করেন। কিন্তু ওই দুই নেতার সন্ধান আজও মেলেনি। পরের দিন লাকসাম থানা পুলিশ ওই ১০ জনকে একটি হত্যা মামলায় আটক দেখিয়ে কুমিল্লার আদালতে পাঠায়।

এদিকে, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের তথ্য উদঘাটিত হওয়ার পরপরই বিএনপির শীর্ষ ওই দুই নেতাকে অপহরণ ও গুমের অভিযোগ এনে গত ১৮ মে র‌্যাব-১১ এর তৎকালীন সিও কর্নেল তারেক সাঈদ, র‌্যাব-১১ কোম্পানি কমান্ডার-২ মেজর শাহেদ রাজীব, ডিএডি শাহজাহান আলী, এসআই কাজী সুলতান আহমেদ, এসআই অসিত কুমার রায়কে আসামি করে কুমিল্লার আদালতে মামলা করেন হুমায়ুন কবির পারভেজের বাবা আলহাজ্ব রঙ্গু মিয়া। সম্প্রতি রঙ্গু মিয়া মারা গেলে বাদী করা হয় তার ছেলে গোলাম ফারুককে।

নিখোঁজ হুমায়ুন পারভেজের ছোট ভাই মামলার বাদী গোলাম ফারুক বলেন, আমরা পুলিশের এ তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখান করে আদালতে এর বিরুদ্ধে অনাস্থা দিয়েছি। কারণ পুলিশের দায়েরকৃত প্রতিবেদনের সঙ্গে সাক্ষীদের বক্তব্যের কোনও মিল নেই। এ ছাড়াও পুলিশ মামলার এজহারভূক্ত আসামিদের এ মামলায় আটক না দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই মনগড়া প্রতিবেদন দাখিল করেছে।

নিখোঁজ সাইফুল ইসলাম হিরুর স্ত্রী ফরিদা ইসলাম বলেন, দিবালোকের মতো সত্যি র‌্যাব ওই দিন আমার স্বামী সাইফুল ইসলাম হিরু ও বিএনপি নেতা হুমায়ুন কবির পারভেজকে আটক করে নিয়ে গেছে। কিন্তু অপহরণের মূল হোতাদের বাদ দিয়ে পুলিশ সাজানো ও ভিত্তিহীন তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। মামলার এজাহারভূক্ত আসামিদের এ মামলায় আটক দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই সকল সত্য প্রকাশিত হবে।

মামলার আইনজীবী অ্যাডভোকেট বদিউল আলম সুজন বলেন, মামলায় বাদী পক্ষের ১২ জন এবং নিরপেক্ষ পাঁচজন সাক্ষীর সাক্ষ্যতে ওই দুইজনকে র‌্যাব কর্তৃক আটকের কথা বলা হলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা মূল আসামিদের রক্ষা করতে মনগড়া প্রতিবেদন দিয়েছেন। তাই নারাজি আবেদনে মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবীরা পুলিশি প্রতিবেদনে নারাজি ছাড়াও উক্ত মামলা সরাসরি এফআইআর অথবা বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রার্থনা করেন।

আরও পড়ুন: বাঁশ এবার গাইবান্ধায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শৌচাগারে রডের বদলে বাঁশ!

/বিটি/এজে/

সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
প্রায় দ্বিগুণ হচ্ছে বিমানের ছয় হাজার কর্মীর ভাতা
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
পুলিশের পোশাকে ‘ধর্ষককে’ নেওয়া হলো থানায়, ১৩ দিনে আদালতে অভিযোগপত্র
ইরানি ইসলামি শাসনবিরোধী শিল্পী মারজান সাত্রাপির প্রয়াণ
ইরানি ইসলামি শাসনবিরোধী শিল্পী মারজান সাত্রাপির প্রয়াণ
হজে গিয়ে পাসপোর্ট হারালে যা করবেন
হজে গিয়ে পাসপোর্ট হারালে যা করবেন
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী