‘আপনারা দেখেছেন লিপুর লাশ ড্রেনের ময়লা, পচা পানিতে পড়ে ছিল। এরপর আপনি আমি যে কেউ পড়ে থাকতে পারি। কিছুদিন আগে আমার শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল স্যারের লাশ উপুর হয়ে রাস্তার পাশে পড়ে ছিল। কেউ উপুর হয়ে, কেউ চিৎ হয়ে পড়ে থাকে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আপনারা শিক্ষক, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আপনারা ছাত্র, আমরা গর্ব করি এটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতি নেই, গবেষণা নেই, চারিদিকে শুধু বাণিজ্যিক মনোভাব আর হত্যাকাণ্ড।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কাজী মামুন হায়দার এসব কথা বলেন। শিক্ষক আকতার জাহান জলি ও শিক্ষার্থী মোতালেব হোসেন লিপুসহ অস্বাভাবিক সব মৃত্যুর সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে আয়োজিত শিক্ষার্থী সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। এতে ইংরেজি বিভাগসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, সামাজিক, রাজনৈতিক, স্বেচ্ছাসেবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মীরা অংশগ্রহণ করে একত্মতা প্রকাশ করেন।
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সভাপতি ড. প্রদীপ কুমার পাণ্ডে বলেন, ‘শিক্ষক হিসেবে ১৭ বছর ও শিক্ষার্থী হিসেবে আরও আট বছর, প্রায় ২৫ বছর ধরে এই ক্যাম্পাসে কতবার যে দাঁড়িয়েছি মৃত্যু, বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন, সমাবেশ, দীর্ঘসূত্রিতা এসব নিয়ে। আস্তে আস্তে আবার ভুলে যাওয়া, আরেকটা মৃত্যু আবার একই কায়দা।’
তিনি আরও বলেন, ‘একজন বিদেশি প্রশিক্ষক রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আসতে চান না। আমি জানতাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নাকি মৃত্যুপুরী। এখন তুলনা করে দেখছি যে, ওখানে বিদেশি প্রশিক্ষক গেলে কোনও পুলিশ প্রটোকল লাগে না, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলেই লাগে। আমাদের জন্য এটা ভীষণ লজ্জার। আমি জানি না প্রশাসন কীভাবে নেয় বিষয়টাকে। বারবার শুনতে হয়, রাজশাহীতে চাকরি করেন কীভাবে?’
দ্রুত তদন্ত কাজ শেষ করে বিচার প্রক্রিয়া শুরুর দাবি জানিয়ে ইংরেজি বিভাগের সভাপতি অধ্যাপক এএফএম মাসউদ আখতার বলেন, ‘আমরা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামোয় বাস করি। এ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেউ অন্যায়-অবিচারের শিকার হলে বা হত্যাকাণ্ডের মতো জঘণ্য বর্বরতার শিকার হলে বিচার বিভাগ তার কার্যক্রম কঠোরভাবে পরিচালনা করার কথা। কিন্তু হত্যাকাণ্ড ঘটলে আমাদের বিচারের দাবিতে রাস্তায় নামতে হয় এবং দিনের পর দিন সেটা চলতে থাকে। কখনও সেটার বিচার হয়, কখনও হয় না।’
সমাবেশে একত্মতা প্রকাশ করে নবাব আব্দুল লতিফ হলের প্রাধ্যক্ষ বিপুল কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী নিরাপদে বাস করবে এটাই চাই। আমরা ছাত্র-ছাত্রীদের মা, বোন, সহপাঠী, স্বজনদের করুণ অবস্থা আর দেখতে চাই না। আমরা অপরাধ দেখতে চাই না অপরাধের বিচার দেখতে চাই।’
গণযোগযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী রফিকুল ইসলামের সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সৌমিক আহমেদ ধ্রুব, নাট্যকলা বিভাগের নুরুল আমান, গণযোগাযোগ বিভাগের আতিক সাদ্দাম, আলী হোসাইন মিঠু প্রমুখ।
এর আগে বেলা ১১টার দিকে লিপু চত্বর থেকে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। মিছিলটি ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করে সিনেট ভবনের সামনে গিয়ে সমাবেশে মিলিত হয়। সমাবেশ শেষে মিছিল নিয়ে আবার লিপু চত্বরে এসে শেষ হয়।
প্রসঙ্গত, ২০ অক্টোবর নবাব আব্দুল লতিফ হলের ড্রেন থেকে লিপুর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। ওইদিন বিকেলে লিপুর চাচা বাদী হয়ে নগরীরর মতিহার থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। এ মামলায় লিপুর রুমমেট মনিরুল ইসলামকে গ্রেফতার দেখানো হয়।
আরও পড়ুন-
আহমদ শফীর সাক্ষাৎ চান ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ
প্রভাবশালী ব্যক্তিরা আইনের আওতায় এসেছেন: দুদক চেয়ারম্যান
/এফএস/







