রাজশাহীর কাটাখালীতে সংঘটিত ভয়াবহ দুর্ঘটনা বাসের আঘাতে উল্টে গিয়ে মাইক্রোবাসে আগুন ধরে মারা যাওয়া ১৭ যাত্রীর স্বজনদের আর্তনাদে ভারী হয়ে গেছে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বাতাস। মর্গের সামনে উপস্থিত স্বজনরা পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছেন। তবে আরও মর্মান্তিক ফুলমিয়ার কাহিনী। তিনিসহ তার পরিবারের ৫ সদস্যই নিহত। লাশ নেওয়ার কেউ না থাকায় এসেছেন প্রতিবেশীরা। এই ভয়াবহতার ভেতরেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ লাশের ময়না তদন্ত সম্পন্ন করে পরিবার সদস্যদের হাতে হস্তান্তর করেছে। আর আগেরদিনেই এ দুর্ঘটনায় হানিফ বাসের চালক আব্দুর রহিমকে একমাত্র আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়। শনিবার (২৭ মার্চ) বেলা ২টায় পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুর থানার মাহিন্দ্র বাইপাস থেকে বিশেষ অভিযানে তাকে গ্রেফতার করেছে কাটাখালী থানা পুলিশ। আব্দুর রহিম পুঠিয়ার বাড়ইপাড়া এলাকার ফজলুল হকের ছেলে।
এসব তথ্য নিশ্চিত করেন রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর) গোলাম রুহুল কুদ্দুস।
এদিকে ময়নাতদন্তের জন্য শনিবার ১২টার দিকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের হিমাগার থেকে লাশগুলো বের করলে অপেক্ষারত স্বজনরা শোকে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন। ময়নাতদন্তের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে শোকার্ত স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয়।
শনিবার সকালে রামেক হাসপাতালে মরদেহ নিতে এসেছেন স্বজনেরা। এসেছেন নিহত শহীদুল ইসলামের ছেলে নাজমুল হুদাও (২০)। তিনি কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন প্রথম বর্ষে। নাজমুল জানান, উপজেলা সদরে ব্যবসার সুবাদে সবার সঙ্গে সবার বন্ধুত্ব। তারা সবাই প্রতিবছর একসঙ্গে কোথাও না কোথাও বেড়াতে যেতেন। করোনার কারণে বেশকিছু দিন তাদের বেড়ানো হয়নি। তাই তারা রাজশাহীতে পিকনিক করার জন্য আসছিলেন।
নাজমুল আর জানান, খবরটা দ্রুত অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানেই দেখি। টিভি খুলে দেখি একই নিউজ দেখাচ্ছে। এরপর আব্বাকে ফোন করি। নম্বর বন্ধ পাই। গাড়িতে যারা ছিলেন তাদের কয়েকজনকে ফোন করে দেখি তাদের নম্বরও বন্ধ। তখন মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়ে।
ফুলমিয়াসহ তার পরিবারের পাঁচজন মারা যাওয়ায় মরদেহ নিয়ে যাওয়ার মতোও কেউ নেই। মরদেহগুলো নিতে এসেছেন প্রতিবেশীরা। অন্যান্য মরদেহ নেওয়ার জন্য নিহতদের স্বজনরা হাসপাতালে ভিড় করেছেন।
শনিবার বিকাল সোয়া চারটার দিকে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (সদর) গোলাম রুহুল কুদ্দুস বলেন, শনিবার বেলা ৩টা থেকে লাশ হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। তবে ডিএনএ নমুনা রেখে লাশ হস্তান্তর হচ্ছে। পরবর্তীতে ডিএনএ পরীক্ষা করে নিশ্চিত করে শনাক্ত করা হবে।
রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক ( সার্বিক) মুহাম্মদ শরীফুল হক জানান, সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি তদন্ত করতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিএম) আবু আসলামকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি করে দিয়েছেন জেলা প্রশাসক আবদুল জলিল। তবে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দিলে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে বলা যাবে। নিহতদের দাফনের জন্য প্রত্যেকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও লাশ তাদের বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
আরএমপি পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, হানিফ পরিবহনের বাসটি মহাসড়কের উল্টো দিকে গিয়ে খাদে পড়ে যায়। মাইক্রোবাস ও হানিফ পরিবহনের বাসটি ১৩০ কিলোমিটার গতিতে চলছিল। মাইক্রোর আগুনে লেগুনাটিও ভস্মীভূত হয়। তবে সেখানে কোনও যাত্রী বা চালক ছিলেন না।
উল্লেখ্য, শুক্রবার (২৬ মার্চ) দুপুর পৌনে দুইটার দিকে রাজশাহী মহানগরীর অদূরে কাটাখালীতে হানিফ পরিবহনের একটি বাস ও মাইক্রোবাসের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সঙ্গে সঙ্গে মাইক্রোবাসটিতে আগুন ধরে গেলে ঘটনাস্থলেই ১১ যাত্রী অগ্নিদগ্ধসহ দুর্ঘটনায় নিহত হন। বাকি ৭ জনকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আনা হলে সেখানে আও ৬ জন নিহত হন। আহতদের মধ্যে কেবল পাভেল নামে এক যুবক এখন সংকটাপন্ন অবস্থায় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। নিহতরা সবাই রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। তারা রাজশাহীতে একটি পার্কে পিকনিক করতে আসছিলেন। মাইক্রোবাসে চালকসহ মোট ১৯ জন ছিলেন।
এই দুর্ঘটনায় চিকিৎসাধীন পাভেলকে রাখা হয়েছে রামেক হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)। দুর্ঘটনায় তার বাবা মোখলেসুর রহমান (৪৫) ও মা পারভীন বেগম (৪০) নিহত হয়েছেন। তাদের বাড়ি পীরগঞ্জের ডারিকাপাড়া গ্রামে।
এছাড়া নিহত হয়েছেন পীরগঞ্জের রাঙ্গামাটি গ্রামের মো. সালাহউদ্দিন (৩৬), তার স্ত্রী শামসুন্নাহার (২৫), তাদের ছেলে সাজিদ (৮), মেয়ে সাফা (২), শামসুন্নাহারের বড় বোন কামরুন্নাহার (৩৭), উপজেলা সদরের মো. ভুট্টু (৪০), তার স্ত্রী মুক্তা বেগম (৪০), ছেলে ইয়ামিন (১৫), বড় মজিদপুরের ফুলমিয়া (৪০), তার স্ত্রী নাজমা বেগম (৩৫), ছেলে ফয়সাল (১৫) এবং মেয়ে সুমাইয়া (৮), সাবিহা (৩), দুরামিঠিপুরের ব্যবসায়ী শহীদুল ইসলাম (৪৬) এবং মাইক্রোবাসের চালক মো. হানিফ (৩০)। হানিফের বাড়ি পীরগঞ্জ উপজেলার পঁচাকান্দা গ্রামে।
সংঘর্ষে হতাহতের ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশাসহ বিভিন্ন ব্যক্তিরা। শোকবার্তায় তারা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন ও তাদের শোক সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।








