শর্ত ভেঙে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) পুকুর খননের মাটি বাইরে নেওয়ার সময় মাটিবোঝাই ট্রাক্টর উল্টে মেরাজ (২৮) নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। মো. মেরাজ রাজশাহীর কাটাখালী থানার কিসমত কুখন্ড গ্রামের বাসিন্দা মো. দুলালের ছেলে। তিনি মাটির হিসাবরক্ষক ছিলেন বলে জানা গেছে। সোমবার (২৬ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৩টার দিকে এ ঘটনা ঘটে বলে বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন মতিহার থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিদ্দিকুর রহমান।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুর খননের মাটি নিয়ে ওই ট্রাক্টরটি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ফায়ারসার্ভিস এলাকায় পৌঁছালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তা উল্টে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ট্রাক্টরে থাকা মেরাজের মৃত্যু হয়।
সংবাদ পেয়ে তাৎক্ষণিক পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, পরিচয় শনাক্তের পর মরদেহ মর্গে পাঠানো হয়েছে। পরিবারের পক্ষ থেকে ড্রাইভারের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, গতবছর মার্চে শহীদ শামসুজ্জোহা হলের পূর্বপাশের প্রায় ১০ বিঘা, সুইপার কলোনির পাশে পাঁচ বিঘা এবং শিক্ষক কোয়ার্টারের পাশে পৌনে ছয় বিঘা জমিতে পুকুর খননের টেন্ডার হয়। এতে ১০ বিঘা পুকুর খননের ইজারা পায় মাসুদ রানা। এছাড়া অহনা ট্রেডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান বাকি দুটি পুকুর খননের ইজারা পায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের মাটি যাচ্ছে ইটভাটায়!
মাসুদ রানা মতিহার থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দীনের ছোট ভাই। এছাড়া অহনা ট্রেডার্সের মালিক মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার। তবে কাগজ-পত্রে ডাবলু সরকারের নাম থাকলেও পুকুর খননের দেখভাল করছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভেয়ার মানিকুল ইসলাম।
অভিযোগ আছে, শর্তভঙ্গ করে বিগত একমাস ধরে খননরত পুকুরের মাটি ট্রাক ভর্তি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে নিয়ে যাচ্ছে দুই ইজারাদার। এ অবস্থায় নিষেধ করা হলেও ইজারাদাররা তা মানছে না বলে দায় এড়াচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। সর্বশেষ, গত ২৪ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সোবহানের উপস্থিতিতে ইজারাদারদের সঙ্গে বৈঠক করেন কৃষিপ্রকল্প অধিদফতর। এতে পুকুর খননের মাটি বাইরে না নেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু সিদ্ধান্ত অমান্য করে রাতের আঁধারে পুকুর খননের মাটি বাইরে নেওয়ার সময় গত রাতে এ দুর্ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনা কবলিত ট্রাক্টরটি সুইপার কলোনি সংলগ্ন পুকুর থেকে মাটি নিয়ে যাচ্ছিলো। অহনা ট্রেডার্সের নামে পাওয়া এই পুকুরের দেখভাল করছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্ভেয়ার মানিকুল ইসলাম। তার অধীনে কাজ করতো মেরাজ। প্রতিদিনের মাটির হিসাব রাখতে মেরাজ। ট্রাক্টরে করে সেহরি খাওয়ার উদ্দেশ্যে বাড়ি যাচ্ছিলেন মেরাজ। ওই ট্রাক্টরটি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ফায়ার সার্ভিস এলাকায় পৌঁছালে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে তা উল্টে যায়। এতে ঘটনাস্থলে মৃত্যু হয় মেরাজের।
নিষেধাজ্ঞার পরেও পুকুর খননের মাটি বাইরে নেওয়ার বিষয়ে রাবির কৃষি প্রকল্পের উপদেষ্টা মণ্ডলীর সভাপতি উপ-উপাচার্য আনন্দ কুমার সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তারা বার বার আমাদের শর্ত ভেঙেছে। সর্বশেষ গত ২৪ তারিখের মিটিংয়ে মাটি বাইরে নিবে না বলে মুচলেকা দিয়েছে। তারপরও অবৈধভাবে মাটি নিয়ে যাচ্ছিলো। তাদের এই কাজের জন্য একটা প্রাণ চলে গেল। পুলিশ তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও একটা ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। তবে রাবি প্রশাসন কি ব্যবস্থা নিচ্ছে সে বিষয়ে তিনি কিছু জানাতে পারেননি।
মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ডাবলু সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাতের বেলা অন্য পুকুরে (মাসুদের লিজ নেওয়া পুকুর) মাটি কাটা হচ্ছিলো। আমার নামে লিজ নেওয়া সুইপার কলোনির পুকুরের নিরাপত্তায় ছিল মেরাজ। রাতে মাটিবোঝাই গাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময় মেরাজ ওই ট্রাক্টরে চড়ে। কিছু দূর যাওয়ার পর এক্সিডেন্ট হলে তার মৃত্যু হয়।
তবে রাতের বেলা মাটি কাটার বিষয়টি অস্বীকার করেন ঠিকাদার মাসুদ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, মাটি সুইপার কলোনির পুকুরে (ডাবলু সরকারের নামে ইজারা নেওয়া পুকুর) কাটা হচ্ছিলো। ঘটনার পর থেকে ওই পুকুরের দেখভালের দায়িত্বে থাকা ছানা পলাতক। তার ফোন বন্ধ রয়েছে।









