X
রবিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২২, ৯ মাঘ ১৪২৮
সেকশনস

‘মেয়র আব্বাসের মাসে অবৈধ আয় দেড় কোটি টাকা’

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২১, ১৪:৫৮
রাজশাহীর পবা উপজেলার কাটাখালী পৌরসভার মেয়র হওয়ার সুবাদে একক আধিপত্য বিস্তার করেছেন। ‘ধরাকে সরা’ জ্ঞান করেছেন। পৌরসভায় জমি দখল, বহুতল ভবন নির্মাণ, সরকারি জায়গায় দোকান ও মার্কেট নির্মাণ, টেন্ডারবাজি, বালুঘাটের ট্রাক থেকে টোলের নামে চাঁদা তোলা হতো মেয়র আব্বাসের ইশারায়। করোনাকালীন অনুদানের কথা বলে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৮০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করেছেন মেয়র আব্বাস। সবমিলে মেয়র আব্বাসের মাসে অবৈধ আয় দেড় কোটি টাকা বলে জানিয়েছেন পৌরসভার কাউন্সিলররা।
 
একই সঙ্গে দলের প্রবীণ নেতাদের কোণঠাসা করে রেখেছেন। দলীয় কর্মসূচিতেও ঠাঁই মেলেনি ত্যাগী নেতাদের। এ নিয়ে পৌর আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। অথচ তার ছায়ায় জামায়াত-শিবির ও বিএনপির কর্মী-সমর্থক সংগঠিত হয়েছে এবং পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। এসব অভিযোগ করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারা।
 
পাশাপাশি নিজের নামে চত্বর ও বাবা আশরাফের নামে সড়কের নামকরণ করেছেন মেয়র। পৌর এলাকায় বাড়ি নির্মাণে চাঁদা, কাটাখালী হাটের দোকান, মাছ-মাংস ও সবজি পট্টিসহ সব জায়গায় চাঁদা তুলতো আব্বাসের লোকজন।
 
এসব অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে মারধর ও নির্যাতনের শিকার হতে হতো। প্রতিবাদকারীদের গভীর রাতে মাসকাটাদিঘি স্কুল অ্যান্ড কলেজের ক্যানটিনের পাশে রাতভর চালানো হতো নির্যাতন। গভীর রাতে ওই স্কুলে মেয়র আব্বাসের আড্ডা বসতো। একবার স্কুলের দরজা খুলতে দেরি হওয়ায় নাইট গার্ডদের মারধর করা হয়। আব্বাস মাসকাটাদিঘি স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি হওয়ায় চাকরি হারানোর ভয়ে এ নিয়ে মুখ খোলেননি কেউ।
 
পৌরসভার কয়েকজন কাউন্সিলর জানান, শ্যামপুর বালুরঘাট, কাটাখালী হাট ও বাজার, কাপাশিয়া হাটের ইজারার টাকার হদিস নেই। বিভিন্ন হাটবাজারের টেন্ডার ও ইজারা নিতেন আব্বাস। সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন তার স্বজনরা।
 
এদিকে, মেয়র আব্বাস চাকরি দেওয়ার নামে ২০-২৫ জনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। আব্বাসের চাকরি দেওয়ার ফাঁদে পা দেন তার ফুফাতো ভাই মো. হাফিজ। হাফিজের কাছ থেকে আব্বাস সাত লাখ টাকা নেন। কিন্তু চাকরি দিতে পারেননি। পরে হাফিজের মা আব্বাসের হাতে-পায়ে ধরে কিছু টাকা ফেরত নিয়েছেন। এসব কথা জানিয়েছেন মো. হাফিজ।
 
কাউন্সিলররা জানিয়েছেন, পৌরসভায় নিয়োগপ্রাপ্ত সুরাইয়া আক্তার নিপা, জানু, ফারুক ও সৈয়বুরকে চাকরিচ্যুত করেছেন মেয়র। একদিন বিকালে তাদের ডেকে বলে, তোমাদের কাল থেকে আসার দরকার নেই। তার এককথায় চাকরি চলে গেছে তাদের। এদের মধ্যে ফারুক ও সৈয়বুর দীর্ঘদিন চাকরিতে যোগদান না করতে পেরে কয়েক বছর আগে বদলি হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন।  
 
সুরাইয়া আক্তার নিপা বেলেন, ‘আমাদের সঙ্গে রাবেয়া বসরী, বিপ্লব প্রামাণিককে চাকরি থেকে ছাঁটাই করেছেন মেয়র। আমি টিকাদানকারী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলাম। রাবেয়া সহকারী কর আদায়কারী ও বিপ্লব ছিলেন লাইসেন্স সেবাদানকারী। আমি ২০০৪ সাল থেকে কাজ করে আসছিলাম। দেড় বছর আগে মেয়র আব্বাস আমাদের ডেকে বলেন, তোমাদের কাল থেকে আসার দরকার নেই। তারপর বিভিন্নভাবে অনুরোধ করেও চাকরি ফেরত পাইনি আমরা।’
 
কাউন্সিলরদের অভিযোগ, পৌর মেয়র আব্বাস কাউন্সিলরদের তোয়াক্কা করতেন না। সভা-সমাবেশ ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিজেই নিতেন। কাউন্সিলদের কাছে কাগজ পাঠিয়ে শুধু স্বাক্ষর নিতেন। মতপ্রকাশের অধিকার ছিল না কাউন্সিলদের। প্রতি বছর পৌর কর, রাজস্ব আদায়, ভূমি উৎস করের টাকা আসে। এসব টাকার হদিস নেই।
 
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মেয়র আব্বাস নিজের নির্মাণাধীন বাড়িতে যাওয়ার জন্য মাসকাটাদিঘি স্কুলের পশ্চিম পাশে অন্যের জমি দখল করে পিচের রাস্তা করেছেন। স্কুল মাঠের পশ্চিম-উত্তর পাশ থেকে ঢালাই রাস্তা করেছেন মাসকাটাদিঘি পূর্বপাড়া মসজিদ পর্যন্ত। এই রাস্তা তৈরি করতে বিলের জমির আইলের দুই পাশে আট ফুট করে নিয়েছেন। মূল্য পরিশোধের নামে প্রায় ২০ জন জমির মালিকের দলিলের ফটোকপি নিয়েছেন। পরে মূল্য পরিশোধ করেননি। ভয়ে ওসব জমির মালিক মুখ খোলেননি।
 
অভিযোগ রয়েছে, কাটাখালী হাটের ভেতরে বেশকিছু দোকান মেয়রের দখলে। আব্বাস মেয়র হওয়ার পর দাউদ কসাইয়ের জমি দখল করেছেন। সাবেক পবা উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুল কুদ্দুসের চার কাঠা জমি দখল করেছেন। প্রতিবাদ করায় হয়রানিমূলক মামলা হয় আব্দুল কুদ্দুস ও তার দুই ছেলে একে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে।
 
আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ‘ওই জমি আমার কেনা। ওখানে দুটি দোকান ছিল। পরে মেয়র আব্বাস দখল করেছেন। সেখানে বর্তমানে কনফেকশনারির দোকান রয়েছে মেয়রের।’
 
আব্দুল কুদ্দুস আরও বলেন, ‘শুধু আমাদের নয়, অনেক মানুষকে হয়রানি করেছেন মেয়র আব্বাস। আমাদের নামে মামলা দিয়ে বিষয়টি গোপন রাখা হয়। হঠাৎ শুনি পরোয়ানা জারি হয়েছে আমাদের নামে। আমরা কোর্টে হাজির হয়ে জামিন নিই। কয়েকবার হাজিরার পর মামলা নিষ্পত্তি হয়।’
 
পবা উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কাটাখালী পৌর আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোতাহার হোসেন বলেন, ‘মেয়র আব্বাসের কাছে প্রবীণ আওয়ামী লীগের নেতাদের মূল্যায়ন ছিল না। কারণ তার হাতে ছিল এমপি ও কেন্দ্রের এক নেতা। এ জন্য কাউকে তোয়াক্কা করতেন না। দখল ও চাঁদাবাজির রাজ্য গড়ে তুলেছেন মেয়র আব্বাস।’
 
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে কটূক্তি ও বঙ্গবন্ধুর ম্যুরাল নির্মাণ প্রতিহতের ঘোষণা দেওয়া আব্বাস আলীকে মেয়র পদ থেকে দ্রুত অপসারণের দাবি জানিয়েছেন কাটাখালী পৌরসভার ১২ জন কাউন্সিল। ২৬ নভেম্বর সকালে পৌরসভা ভবনে প্রতিবাদ সভায় এ দাবি জানান তারা।
 
প্রতিবাদ সভায় অংশ নেন ১২ জন কাউন্সিলর। এতে সভাপতিত্ব করেন কাটাখালী পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মঞ্জুর রহমান। তিনি মেয়রকে অপসারণে অনাস্থা প্রস্তাবের রেজুলেশন সাংবাদিকদের পড়ে শোনান। এ সময় তিনি বলেন, ২৫ নভেম্বর পৌরসভার ১২ জন কাউন্সিলরের জরুরি সভায় সর্বসম্মতিক্রমে মেয়রকে অপসারণে অনাস্থা প্রস্তাব গৃহীত হয়। রাতেই সেটি জেলা প্রশাসক বরাবর দেওয়া হয়েছে। কাটাখালী পৌরসভার কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মেয়র আব্বাসের আগ্রাসন থেকে মুক্তি চান। 
 
কাউন্সিলর মঞ্জুর রহমান বলেন, ‘পৌরসভার ফান্ডে রাজস্ব আদায়ের প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকা ছিল। এখন চা খাওয়ার টাকা নেই। হঠাৎ পৌর ফান্ডের টাকা গায়েব হয়ে গেছে। বিষয়টি তদন্ত করা জরুরি।’
 
তিনি বলেন, ‘করোনাকালীন অনুদান দেওয়ার জন্য কাটাখালী বাজারের কাপড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ৮০ লাখ টাকা চাঁদাবাজি করেন মেয়র আব্বাস। কিন্তু ওই টাকা কাউকে দেননি। কারোনাকালে চা ব্যবসায়ীদের অনুদান দেওয়ার নামে কয়েক লাখ টাকা পৌরসভার ফান্ড থেকে হাতিয়ে নেন আব্বাস। অথচ কোনও চায়ের দোকানদার অনুদান পাননি।’
 
কাউন্সিলর মঞ্জুর বলেন, ‘মেয়র আব্বাসের প্রতি মাসে অবৈধ আয় দেড় কোটি টাকা। বিষয়টি গর্ব করে আমাদের বলতেন তিনি। বিষয়টি সব কাউন্সিলর জানেন।’
 
প্রতিবাদ সভায় ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আব্দুল মজিদ বলেন, পৌরসভার কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ৩৬ মাসের বেতন-ভাতা বকেয়া আছে। ফান্ডে টাকা থাকার পরও মেয়র আব্বাস বেতন-ভাতা দেননি।
 
কাউন্সিলর মঞ্জুর রহমান আরও বলেন, ‘মেয়র আব্বাস কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জোর করে বিভিন্ন কাগজে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করতেন। কেউ স্বাক্ষর না করলে চাকরিচ্যুতসহ নানাভাবে হুমকি দিতেন। তার কোনও কাজের প্রতিবাদ করলে কাউন্সিলর ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গালিগালাজ করতেন।’
 
তিনি বলেন, ‘আত্মীয়-স্বজনদের নামে ঠিকাদারি লাইসেন্স করে নগর অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ মেয়র নিজে করতেন। আত্মীয়-স্বজনদের নামে হাটবাজার ও যানবাহনের টোল আদায়ের ইজারা নিয়েছেন। এসব টোল আদায়ের নামে নিজের লোকজন দিয়ে চাঁদাবাজি করতেন। এসব নিয়ে কেউ প্রতিবাদ করলে হত্যার হুমকি দিতেন।’ 
 
এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে কাটাখালী পৌরসভার মেয়র আব্বাস আলী বলেন, ‘এখন সবাই অভিযোগ করতেছে। আগে করেনি কেন? এসব নিয়ে আমি কোনও মন্তব্য করতে চাই না।’
 
এরই মধ্যে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যুরাল স্থাপন নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে মেয়র আব্বাস আলীকে রাজধানীর কাকরাইলের ইশা খাঁ হোটেল থেকে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব। বুধবার (১ ডিসেম্বর) সকালে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে র‌্যাবের মুখপাত্র খন্দকার আল মঈন বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করেছি। জিজ্ঞাসাবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বক্তব্যটি তার বলে স্বীকার করেছেন আব্বাস।
/এএম/
সম্পর্কিত
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত আ.লীগ নেতার মৃত্যু
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত আ.লীগ নেতার মৃত্যু
সিরাজগঞ্জের ৩ এমপি করোনায় আক্রান্ত 
সিরাজগঞ্জের ৩ এমপি করোনায় আক্রান্ত 
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২
এক বিটকয়েন ৩৫ লাখ টাকা, আটক ২
এক বিটকয়েন ৩৫ লাখ টাকা, আটক ২

লাইভ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত আ.লীগ নেতার মৃত্যু
সড়ক দুর্ঘটনায় আহত আ.লীগ নেতার মৃত্যু
সিরাজগঞ্জের ৩ এমপি করোনায় আক্রান্ত 
সিরাজগঞ্জের ৩ এমপি করোনায় আক্রান্ত 
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২
চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২
এক বিটকয়েন ৩৫ লাখ টাকা, আটক ২
এক বিটকয়েন ৩৫ লাখ টাকা, আটক ২
রংপুরে ৫০ কোটি টাকার প্রকল্পে বড় জালিয়াতি
রংপুরে ৫০ কোটি টাকার প্রকল্পে বড় জালিয়াতি
© 2022 Bangla Tribune