ঢাকায় আত্মসমর্পণ, রাজশাহীতে যুদ্ধ

দুলাল আবদুল্লাহ, রাজশাহী
১৬ ডিসেম্বর ২০২১, ১২:০০আপডেট : ১৬ ডিসেম্বর ২০২১, ১৫:১৯

নয় মাসের গণহত্যা, নারী ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ ও লুটতরাজের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪.৩১ মিনিটে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমর্পণ দলিয়ে সই করেন পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজি। আত্মসমর্পণের খবর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মাধ্যমে জানতে পারেন সারাদেশের মানুষ। আত্মসমর্পণের এমন খবর পেয়ে রাজশাহীর সর্বস্তরের জনতা রাজপথে নেমে আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠেন। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে রাজশাহী। বিভিন্ন জায়গায় আত্মগোপনে থাকা মুক্তিকামী মানুষ সেদিন বিজয়ের উল্লাসে রাস্তায় নেমে আসে। কিন্তু তখনও শত্রুমুক্ত হয়নি রাজশাহী।

১৮ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত রাজশাহীতে পতাকা তুলছেন ৭ নম্বর সেক্টরের সাব সেক্টর ৪-এর কমান্ডার মেজর গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী (বীর বিক্রম)

রাজশাহীর মুক্তিযোদ্ধারা জানান, ১৬ ডিসেম্বর বিকাল ৪টার দিকে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে এটা রেডিওতে আগেই জানতে পেরেছিলেন। পাকিস্তানি বাহিনীর পরাজয়ের খবর শোনার জন্য অধীর আগ্রহে ছিলেন তারা। আত্মসমর্পণের সঙ্গে সঙ্গে রাজশাহীর স্বাধীনতাকামী মানুষ বাইরে বের হয়ে এসেছিলেন। আনন্দে উদ্বেলিত হয়ে মুক্তিযোদ্ধারা সেদিন আকাশের দিকে তাক করে কয়েক রাউন্ড ফায়ার করেছিলেন। ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানে সেদিন রাজশাহীর আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়েছিল। যারা স্বজন হারিয়েছিলেন তারা অপেক্ষার প্রহর গুনছিলেন। রক্তের দাগ না মুছলেও বিজয়ের উল্লাসে মেতে ছিল স্বজনহারা অনেক পরিবার। অনেকে স্বজনের খোঁজে বের হন। বিভিন্ন টর্চার সেল থেকে উদ্ধার করা হয় নির্যাতনের শিকার অনেককে।

রাজশাহীতে মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় মিছিল

সেদিন বাঙালি-অবাঙালি, স্বাধীনতার পক্ষে-বিপক্ষে সবাই রাজপথে নেমেছিলেন। স্বাধীনতার বিপক্ষের শক্তি রাজাকার-আলবদর-আল শামস এই আত্মসমর্পণকে মেনে নিতে পারেনি। ১৬ ডিসেম্বর তারা আত্মসমর্পণের খবরকে ‘গুজব’ বলে অ্যাখ্যা দিয়ে রাজশাহীতে দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তা সফল হয়নি। স্বাধীনতাবিরোধীদের অনেকে সেসময় মুখোশ খুলে বিজয়ের উল্লাসে অংশ নিয়েছিল। একই সঙ্গে নিজেদের স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি বলে ঘোষণাও দিয়েছিল।

বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান রাজা

মুক্তিযুদ্ধকালীন ৭ নম্বর সেক্টরের অধীন রাজশাহী ৪ নম্বর সাব-সেক্টরের গেরিলা লিডার ও রাজশাহী মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান রাজা বলেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের পরপর রাজশাহীর মুক্তিযোদ্ধাসহ সর্বস্তরের মানুষ “জয় বাংলা” ধ্বনিতে রাজপথ প্রকম্পিত করেন। তবে তখনও রাজশাহী শত্রুমুক্ত হয়নি। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর তাদের জনবল নিয়ে চলে যেতে পারেনি। দুই দিন পর ১৮ ডিসেম্বর রাজশাহী শত্রুমুক্ত হয়। এই দুই দিনে বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছিল। যুদ্ধ হয়েছিল। পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর যারা পালাতে পারেনি তাদের দু’একজনকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাও ঘটেছিল। এর মধ্যে পাকিস্তানি ক্যাম্পগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। তবে ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর থেকে জেলার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা মানুষ শহরে প্রবেশ করতে থাকেন। মুক্তিযোদ্ধারাও আসেন। ১৭ ডিসেম্বর অনেক মুক্তিযোদ্ধা রাজশাহী নগরীতে পৌঁছে যান। ১৮ ডিসেম্বর রাজশাহী নগরীর মাদ্রাসা মাঠে ৭ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর গিয়াস উদ্দীন স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে রাজশাহীকে শত্রুমুক্ত ঘোষণা করেন। সেদিন হাজার হাজার মানুষ রাজশাহীর ঐতিহাসিক এই ময়দানে সমবেত হয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বরণ করে নেন। পরবর্তী সময়ে মেজর গিয়াস উদ্দীন রাজশাহী প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করেন।’

রাজশাহীর বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘১৬ ডিসেম্বর ঘোষণার পরও আমি দুই দিন গ্রামে ছিলাম। তাই ১৬ ডিসেম্বর রাজশাহী শহরের পরিস্থিতি দেখা হয়নি। কারণ তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো ছিল না। মানুষের উল্লাস দেখতে আসতে পারিনি।’

বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুল ইসলাম

রাজশাহীর বীর মুক্তিযোদ্ধা তৈয়বুর রহমান বলেন, ‘পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করবে এটা ১৬ ডিসেম্বরের আগেই আমারা জানতে পেরেছিলাম। আত্মসমর্পণের আগে ১৫ ডিসেম্বর সকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আমিসহ সাত জনের একটি টিম রাজশাহী অভিমুখে রওনা হই। এই সাত জনের মধ্যে চার জন ছিলেন ইপিআর সদস্য। ওই সময় রাজশাহীতে অবস্থানরত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওপর বেশকিছু অভিযান চালানো হয়। ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রাজশাহীতে পৌঁছে যাই আমরা। রাতে রাজশাহী কলেজের কলা ভবনে আশ্রয় নিয়েছিলাম। পরদিন ১৬ ডিসেম্বর সকাল থেকে ১২টা পর্যন্ত নগরীর বোয়ালিয়া ক্লাব, সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা হল, উপশহরের বেশকিছু ক্যাম্পে অভিযান চালান মুক্তিযোদ্ধারা। ওই দিন আত্মসমর্পণকে গুজব বলে রাজশাহীতে দাঙ্গা লাগানোর চেষ্টা করেছিল রাজাকাররা। সেদিন মুক্তিযোদ্ধাদের অভিযানে জোহা হলে আটকে রাখা সবাই মুক্ত হয়ে যান। এরই মধ্যে অনেক ব্যক্তিকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী। পরে পাকিস্তানি আর্মির আত্মসমর্পণের খবরে রাজশাহীর সর্বস্তরের মানুষ রাজপথে এসে আনন্দ-উল্লাস করেন। বলতে গেলে ১৬ ডিসেম্বরই মূলত রাজশাহী শত্রুমুক্ত হতে থাকে। ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে রাজশাহী শত্রুমুক্ত হয়।’

/এএম/
সম্পর্কিত
‘মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে অন্য কোনও ঘটনার তুলনা হয় না’
নোয়াখালীতে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনমুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করলে গণঅভ্যুত্থান হবে, রাজাকারদের পাকিস্তানে পাঠানো হবে
মা-বাবার পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত তোফায়েল আহমেদ
সর্বশেষ খবর
পিতার সৃজনকর্ম নিয়ে আলোচক যখন নুহাশ হুমায়ূন
পিতার সৃজনকর্ম নিয়ে আলোচক যখন নুহাশ হুমায়ূন
রাশিয়া যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান
রাশিয়া যাচ্ছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
শুরু হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ভাতা পরিশোধ
শুরু হচ্ছে বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ভাতা পরিশোধ
সর্বাধিক পঠিত
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকায় আনা জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বেকায়দায় আমদানিকারক
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম দুই ওয়ানডের দল ঘোষণা বাংলাদেশের
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
হতাশা থেকে আত্মহত্যা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতিরিক্ত পরিচালকের, ধারণা পুলিশের
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী
মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহে সফল ঋতব্রত, নেপথ্যে কী