নওগাঁয় র্যাব হেফাজতে অসুস্থ হওয়ার পর হাসপাতালে মারা যাওয়া সুলতানা জেসমিনের (৪২) পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে র্যাবের একটি টিম। সোমবার (৩ এপ্রিল) বিকাল ৩টার দিকে তদন্ত টিমের ওই দল সুলতানা জেসমিনের ছেলে সৈকত ও ভগ্নিপতি আমিনুল হককে ডেকে নিয়ে কথা বলেছেন।
আমিনুল হক বলেন, ‘গত ২২ মার্চ (বুধবার) জেসমিনকে গ্রেফতারের পর অসুস্থ হলে প্রথমে নওগাঁ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিলে ২৪ মার্চ (শুক্রবার) মৃত্যু হয়। যেহেতু আমি ও জেসমিনের ছেলে সৈকত ছিলাম, সেহেতু এই সময়ের মধ্যে যা কিছু ঘটেছে তা আমাদের কাছে জানতে চেয়েছে র্যাবের টিম। তদন্ত টিম আমাদের দুজনের বক্তব্য লিখিত আকারে গ্রহণ করেছে।’
এদিকে, র্যাবের কাছে পুরো ঘটনার বর্ণনা দিলেও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি জেসমিনের ছেলে সৈকত।
যা উল্লেখ আছে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে...
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের বিভাগীয় ও ময়নাতদন্ত টিমের প্রধান অধ্যাপক ডা. কফিল উদ্দিন বলেন, ‘আটকের পর মানসিক চাপ থেকেই সুলতানা জেসমিনের মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হয়। আর এই কারণে তার মৃত্যু হয়েছে। তবে আমরা তার শরীরে দুটো জখম পেয়েছি। যা খুবই ছোট। এর একটি কপালের বাঁ পাশে ছোট কাটা। যেটির পরিমাণ ২ দশমিক ৫ সেন্টিমিটার। অর্থাৎ এক ইঞ্চিরও কম। এ ছাড়া ডান হাতের কনুইয়ের ভেতরের দিকে দুই সেন্টিমিটার স্থানে একটি ফোলা জখম ছিল। এটি সাধারণত চিকিৎসা গ্রহণের জন্য রোগীর হাতে ক্যানোলা করার সময় হয়। শরীরের শিরা-উপশিরা খুঁজে না পাওয়া গেলে একাধিকবার সিরিঞ্জিং করা হয়। তখন এই ধরনের সোয়েলিং (ফোলা) হয়। তাই জেসমিনের মরদেহের ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত মতামতে আমরা বলেছি, এই যে দুটি ইনজুরি রয়েছে তা মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট নয়। তার মৃত্যু হয়েছে শক (মানসিক চাপ) থেকে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণেই।’
কী ঘটেছিল?
বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অফিসে যাওয়ার পথে সুলতানা জেসমিনকে রাস্তা থেকে মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যায় র্যাব। আইনশৃঙ্খলা সংস্থাটির দাবি, একজন সরকারি কর্মকর্তার ফেসবুক আইডি হ্যাক করে চাকরি দেওয়ার নামে অনেকের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ছিল জেসমিনের বিরুদ্ধে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দিলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। তবে আটক হওয়ার ঘণ্টা খানেকের মধ্যে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন।
র্যাব বলছে, নওগাঁয় র্যাবের কোনও ক্যাম্প না থাকায় তাকে আটকের পর পাশের জয়পুরহাট ক্যাম্পে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কথা ছিল। কিন্তু তার আগেই অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে নওগাঁ সদর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ বিষয়ে র্যাব-৫-এর অধিনায়ক রিয়াজ শাহরিয়ার বলেন, ‘যে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে প্রতারণার অর্থ লেনদেন হতো, সেটির সূত্র ধরে জেসমিনের সম্পৃক্ততার বিষয়টি সামনে আসে। ক্যাম্প যেহেতু দূরে, তাই আটকের পর গাড়ির ভেতরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তখন র্যাব সদস্যরা তার মোবাইল নিয়ে লক খুলতে বললে ঘাবড়ে যান, ঘামতে থাকেন। একপর্যায়ে তিনি পাসওয়ার্ড দিলে আমরা অভিযোগের কিছু সত্যতা পাই। এ নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের মধ্যে তিনি বমি করতে শুরু করেন। তখন আমরা তাকে দ্রুত নওগাঁ সদর হাসপাতালে নিয়ে যাই।’
রিয়াজ শাহরিয়ার বলেন, ‘নওগাঁ সদর হাসপাতালে সন্ধ্যা পর্যন্ত চিকিৎসাধীন থাকার পর অবস্থার অবনতি হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। রাজশাহীতে নেওয়ার পর তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শুক্রবার সকালে মারা যান। সকালে তার মৃত্যু হলেও স্বজনদের কাছে লাশ হস্তান্তর করা হয় শনিবার বিকালে। ময়নাতদন্ত শেষে লাশ স্বজনদের বুঝিয়ে দেয় র্যাব। এ ঘটনায় এখনও কেউ অভিযোগ দেয়নি, মামলাও হয়নি।’









