রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে প্রসূতি ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় দুই চিকিৎসককে গ্রেফতারের প্রতিবাদে রাজশাহীতেও ধর্মঘট পালন করছেন চিকিৎসকরা। এতে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নিতে এসে ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
সোমবার (১৭ জুলাই) ও মঙ্গলবার (১৮ জুলাই) নগরীর বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নিতে এসে হাজারো রোগী ফিরে গেছেন। বিভাগের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চিকিৎসার জন্য আসা রোগীরা নিজেদের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন।
রাজশাহী নগরীতে সবচেয়ে বড় পপুলার বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিমিটেড। যেখানে শতাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক চেম্বার করেন। এসব চেম্বারে রোগীদের ভিড় থাকে। পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হঠাৎ চিকিৎসকরা কর্মসূচিতে নামায় বিপাকে পড়েন রোগীরা।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে এই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে দেখা গেছে, রোগীরা চিকিৎসকের সিরিয়ালের জন্য এসে ফিরে যাচ্ছেন। এ সময় হাড় জোড়া ও পঙ্গু রোগ বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. দেবাশীষ রায়ের সিরিয়ালের জন্য স্ত্রীকে নিয়ে নাটোরের দত্তপাড়া থেকে এসেছেন মো. মনির সরকার।
তিনি বলেন, ‘স্ত্রীকে নিয়ে সকালে এসেছি। আসার পর জানতে পারলাম চিকিৎসকের চেম্বার বন্ধ। এতো দূর এসেছি। এখন কী করবো ভেবে পাচ্ছি না। স্ত্রী কোমরের ব্যথা নিয়ে কাতরাচ্ছেন। কোনও চিকিৎসক পাইনি।’
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রিসেপশনে বসেছিলেন কনসালট্যান্ট মো. জাহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সকাল থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চিকিৎসকের সিরিয়ালের জন্য এসে ফিরে গেছেন ৬০ জন। তাদের পরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। ধর্মঘট স্থগিত না হলে রোগী দেখবেন না বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।’
এদিকে, আশরাফ আলী নামের এক ব্যক্তি কয়েকটি ক্লিনিক ঘুরে পপুলারের সামনে রোগী নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি বলেন, আমার ছেলের গ্যাসের সমস্যা। হঠাৎ বেড়েছে। সরকারি হাসপাতালে গিয়েছিলাম। বারান্দা থেকে এক দালাল একটি ক্লিনিকে নিয়ে গিয়েছিল। এরপর ক্লিনিকে রেখেই লাপাত্তা দালাল। পরে কয়েকটি ক্লিনিকে চিকিৎসকের খোঁজ নিয়েছি। সবাই বলছেন, আজ চিকিৎসক বসবেন না।’
রাজশহীর বাইরে থেকে পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নিতে আসা কয়েকজন রোগী ও স্বজনরা জানান, ফোনে সিরিয়াল দিয়ে চিকিৎসার জন্য এসেছেন তারা। কিন্তু এসে দেখেন সব চিকিৎসকের চেম্বার বন্ধ। সিরিয়াল নেওয়ার আগে রোগীদের জানিয়ে দিলে এমন ভোগান্তিতে পড়তে হতো না তাদের।
পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রাজশাহী শাখার সিনিয়র অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার হোসেন আলী বলেন, ‘চেম্বার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চিকিৎসকরা। এখানে আমাদের করার কিছুই নেই।’
একই কথা বলেছেন ল্যাবএইডের রাজশাহী শাখার ম্যানেজার রেজাউল করিম। তিনি বলেন, ‘জরুরি চিকিৎসা ও অপারেশন কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। চিকিৎসকরা না বসলে চিকিৎসাসেবা শুরু হবে না।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজশাহীতে অনুমোদিত ৩৫০টি বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের প্রাইভেট চেম্বারে রোগী দেখা, টেস্ট রিপোর্ট প্রদানসহ সার্জারি বন্ধ রেখেছেন চিকিৎসকরা।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের চেয়ে দ্বিগুণ রোগী বেসরকারি এসব স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে চিকিৎসা নেন। এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চিকিৎসা নিতে আসেন বিভাগের প্রত্যেক জেলা-উপজেলার মানুষজন। চিকিৎসকদের এমন কর্মসূচিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা।
সোসাইটি অব সার্জন বাংলাদেশ রাজশাহী শাখার সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. নওশাদ আলী বলেন, ‘চিকিৎসকদের সাতটি সোসাইটি আছে। সবাই মিলে প্রাইভেট প্র্যাকটিস বন্ধ রেখেছি আমরা। কারণ এভাবে চিকিৎসকদের জেলে ঢুকিয়ে রাখা অন্যায়। কোনও চিকিৎসক রোগী মারতে চান না, বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কাজেই এই ধরনের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে আমাদের আজকের প্রতিবাদ।’
তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে গ্রেফতার দুই চিকিৎসকদের জামিন হওয়ায় আন্দোলন স্থগিত করা হয়েছে। বুধবার থেকে প্রাইভেট চেম্বার ও অপারেশন চলবে।’
এদিকে, মঙ্গলবার বিকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ কনফারেন্স রুমে আয়োজিত সভায় আন্দোলন স্থগিতের ঘোষণা দেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক ও সোসাইটি অব সার্জন বাংলাদেশের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম।








