পাবনায় স্থায়ী হতে চেয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কথিত উপদেষ্টা মিয়া জাহিদুল ইসলাম আরেফী। পরিবারের সবাই যুক্তরাষ্ট্র থাকলেও গত কোরবানির ঈদ এবং ৩-৪ মাস আগে দুই দফা পাবনার বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। তার নাম মিয়া জাহিদুল ইসলাম আরেফী হলেও স্থানীয়রা তাকে বেলাল নামে চেনেন।
তার বাসার ভাড়াটিয়া মো. রইচ উদ্দিন জানান, ওনারা ১০ ভাইবোন। পৈতৃক বাড়ি সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায়। ওনার বাবা পাবনা জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ছিলেন। সেই সুবাদে পাবনা পৌর এলাকার শায়েস্থা খাঁ এলাকায় জমি কিনে বাড়ি করে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। পরে সবাই আমেরিকা চলে যান।
তিনি বলেন, গত কোরবানির ঈদ এবং ৩-৪ মাস আগে দুই দফা এখানে (পাবনার বাড়িতে) এসেছিলেন। আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ঢাকায় বিয়েও করেছেন এবং ঢাকাতেই থাকার চিন্তা করেছিলেন। তবে তার ব্যবহার-আচার খুবই ভালো। তার দুই ছেলে এবং এক কন্যা সন্তান রয়েছে।
প্রতিবেশী হাদুল মিয়া বলেন, বহু বছর আগে থেকই তারা আমেরিকা থাকেন। আমি তাকে চিনি না। ৩-৪ মাস আগে আমার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। তার বাড়ির সীমানা নিয়ে আমার সঙ্গে কথা হয়। আমাদের বাড়ির সামনে রাস্তা খারাপ, তখন আমাকে বলেন, তার নাকি মেয়রের সঙ্গে কথা হয়েছে এই রাস্তা ঠিক করে দেবেন। তারপর তিনি এখানে বাড়ি করবেন।
প্রতিবেশীরা জানান, পাবনায় তার তেমন আত্মীয়-স্বজন নেই। এ জন্য আসার পর পাবনা শহরের আবাসিক হোটেলে ছিলেন। পাবনার বাড়ি ১০ তলা করে সেখানে থাকার কথা বলতেন।
মিয়া জাহিদুল ইসলাম আরেফী ওরফে বেলালের বাবার নাম রওশন আলী। ১০ ভাইবোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তার ভাইদের মধ্যে স্বপন, তপন, বেলাল ও বাবুকে অনেকেই চেনেন। ১৯৭৫ সালে পাবনা জেলা স্কুল থেকে এসএসসি পাস করেন বেলাল। তার ভাইবোন সবাই বর্তমানে আমেরিকা প্রবাসী।
প্রায় দুই মাস আগে পাবনার এক সাংবাদিকের সঙ্গে তার সাক্ষাৎ হয় ভূমি অফিসের উপসহকারী কর্মকর্তা আফসার আলীর অফিস কক্ষে। সে সময় মিয়া আরেফী উপস্থিত সবার সামনে দাবি করেন, কর্পোরেট অফিসে দীর্ঘদিন সিইও হিসেবে চাকরি করার পর তিনি এখন ডেমোক্রেট দলের নেতা এবং জো বাইডেনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। তিনি আগামী জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিশেষ মিশনে কূটনৈতিক চ্যানেলে দেশে এসেছেন। তিনি ভোলা সফর করেছেন। সারা দেশে সফর করবেন।
উপস্থিত একজন কোথায় উঠেছেন বলে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘উঠেছি এক জায়গায়। আমি এখন এখানে আছি তা ডিসি-এসপি সবাই জানেন। আমার শরীরে চিপস লাগানো আছে। আমি কী করছি, কোথায় যাচ্ছি তা আমেরিকা থেকে নজরদারি করা হচ্ছে।’ তার কথা শুনে অফিসে উপস্থিত সবার মনে প্রশ্নের উদয় হয় তিনি জো বাইডেনের উপদেষ্টা কিন্তু কোনও প্রটোকল নেই- এটা কীভাবে সম্ভব?
এরপর তার ভূমি অফিসে যাওয়ার কারণ কয়দিন পর জানা যায়। তিনি তার মায়ের নামে খাজনা পরিশোধের জন্য উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তার কাছে আসেন। আমেরিকার নাগরিক হওয়ায় বাংলাদেশের আইডি কার্ড না থাকায় অপারগতার কথা জানান ভূমি কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার এক সহপাঠী শনিবার বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে উপদেষ্টা পরিচয়ে সংবাদ সম্মেলনের ছবি দেখে প্রথম মিয়া আরেফী বেলালকে চিনতে পারেন। তার দাবি, ছাত্রজীবনে বাটপারি করলেও আমেরিকায় থেকে আরও বড় বাটপার হয়েছে। সে আমেরিকা গিয়ে আবার ২৩ বা ২৭ তারিখে ঢাকায় আসে বলেও জানান তার অপর এক সহপাঠী।
আরেক সূত্রে জানা গেছে, দুই মাস আগে এই ব্যক্তি উল্লাপাড়ায় এসে পরিচয় দেন তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উপদেষ্টা। সম্প্রতি গ্রামবাসীকে এ উপলক্ষে দুটি গরু জবাই করে ভূরিভোজ করান।
মুখে মুখে খবর পৌঁছে যায় উল্লাপাড়া উপজেলা প্রশাসনের কানে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিষয়টি জানান সিরাজগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য তানভীর ইমামকে।
তানভীর ইমাম ডেকে পাঠান মিয়া আরেফীকে।
একটি সূত্র জানায়, তাকে তানভীর ইমাম জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনি আমেরিকার প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা অথচ আপনি কী তা বাংলাদেশ সরকারকে জানিয়েছেন? আপনার নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব তো আমাদের সরকারের। কিন্তু আপনি স্থানীয় প্রশাসনকে কেন তা জানাননি?’ এরকম প্রশ্নের সদুত্তর দিতে ব্যর্থ হন।
সূত্রটি আরও জানায়, তখন সংসদ সদস্য তানভীর ইমাম তাকে ভর্ৎসনা করেন এবং বাটপারি বা মিথ্যা পরিচয় দিলে পরিণতি শুভ হবে না বলে সতর্ক করে দেন।
এই ঘটনার পর তিনি ঢাকা চলে যান।
উল্লেখ্য, শনিবার (২৮ অক্টোবর) বিকালে রাজধানীতে বিএনপির সমাবেশকে কেন্দ্রে করে দলটির নেতাকর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এরপর সন্ধ্যায় নয়াপল্টনে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এই ব্যক্তিকে দেখা যায়। নয়াপল্টনের বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের উপদেষ্টা পরিচয় দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তার সঙ্গে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন উপস্থিত ছিলেন। সেই ভিডিও নিয়ে খবর প্রকাশ করলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়। রবিবার দুপুরে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে আটক করা হয়। বর্তমানে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।








