রেল ও সড়কপথে ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে আমদানি-রফতানির উপযোগী পরিবেশ থাকায় দিনাজপুরে বিরল স্থলবন্দর তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সে অনুযায়ী বন্দরের ভিত্তি প্রস্ততরের ফলকও উন্মোচন করা হয়। কিন্তু ফলক উন্মোচনের পর ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত চালু হয়নি বিরল স্থলবন্দর । নানা জটিলতায় বন্দরটি চালু না হওয়ায় সরকার হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
স্বাধীনতার আগে ও পরে যে ক’টি স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রফতানি কার্যক্রম চালু ছিল তার মধ্যে অন্যতম দিনাজপুরের বিরল স্থলবন্দর। ব্রিটিশ আমলেও এই বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রফতানি হতো। দেশের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে রেল ও সড়কপথে ভারত, ভুটান ও নেপালের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেনের উপযোগী পরিবেশ থাকায় বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে তৎকালীন সরকার বিরল স্থলবন্দরকে মানসম্মত বন্দর করার পরিকল্পনা করে।
স্থলবন্দর নির্মাণ করতে ২০০৫ সালে বিরল স্থলবন্দর স্থাপনের লক্ষ্যে কিশোরীগঞ্জ সীমান্ত ফাঁড়ি এলাকার চকশংকর মৌজার ১৭ একর জমি সরকারিভাবে অধিগ্রহণ করা হয়। পূর্ণাঙ্গ বন্দর করার লক্ষ্যে ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর দিনাজপুর-২ (বিরল-বোচাগঞ্জ) আসনের তৎকালীন স্থানীয় সংসদ সদস্য ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক সেনাপ্রধান লে. জে. মাহাবুবুর রহমান বিরল স্থলবন্দরের ভিত্তি প্রস্তরের ফলক উন্মোচন করেন। এসময় বিরল ল্যান্ড পোর্ট লিমিটেড নামে একটি বেসরকারি অপারেটরের সঙ্গে বন্দর পরিচালনার জন্য চুক্তি করা হয়।
বাংলাদেশের সঙ্গে স্থল-বাণিজ্যের আশায় ভারত সরকার রাধিকাপুর পর্যন্ত মিটার গেজ রেলপথকে ডুয়েল গেজ স্থাপন করে ব্রডগেজে রূপান্তর করে। কিন্তু বিরল বন্দরের চকশংকরপুর থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ না থাকায় ২০০৬ সালেই নেপাল-ভুটান-ভারতের সঙ্গে বিরল স্থলবন্দরে আমদানি-রফতানি বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। পরে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর একাধিকবার মন্ত্রী, এমপি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা এই বন্দর পরিদর্শন করেন। ২০১০ সালে একনেকের সভায় পার্বতীপুর হতে বিরল সীমান্ত পর্যন্ত মিটারগেজ রেললাইনকে ডুয়েলগেজ স্থাপন করে ব্রডগেজ রেললাইনে রূপান্তর করতে প্রকল্প অনুমোদিত হয়। ২০১১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি বিরল শুল্কবন্দরের মিটার গেজ রেলপথকে ডুয়েল গেজ স্থাপন করে ব্রডগেজে রূপান্তরের কাজ শুরু হয় এবং বর্তমানে তা সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু বন্দরে যানবাহন চলাচলের জন্য সাড়ে ৩ কিলোমিটার লিংক রোড নির্মাণের কথা থাকলেও এখনও তা হয়নি।
বিরল স্থলবন্দরের জন্য অধিগ্রহণ করা ১৭ একর জমি পড়ে আছে। প্রথম দিকে স্থলবন্দরের যে সাইনবোর্ড ও ভিত্তিপ্রস্তর ছিল সেটিও এখন নেই।
ওই এলাকার কৃষক মজিবর রহমান বলেন, ‘স্থলবন্দর হলে আমাদের কর্মসংস্থান হবে। পাশাপাশি এলাকায় উন্নয়ন আসবে। এজন্য এলাকার কৃষকরা জমিগুলো সরকারের নিকট কমদামে বিক্রি করে। এখন স্থলবন্দরও হয় না, জমিগুলো চাষও করতে পারি না।’
বিজয় কুমার, আকাশসহ কয়েকজন যুবক জানায়, যদি স্থলবন্দর হতো তাহলে আমাদের মতো বেকার যুবকদের অনেক উন্নতি হত।
২০০৮ সালের নির্বাচনের সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিরল স্থলবন্দর চালু করা হবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
বিরল উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক প্রভাষক মিজানুর রহমান জানান, বিএনপির আমলে এই বন্দরের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করায় এটি চালু করা হচ্ছে না।
সরকারের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়া বিরল ল্যান্ডপোর্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সহিদুর রহমান পাটোয়ারী মোহন জানান, চুক্তি অনুযায়ী সরকার বন্দরকে চালুর উপযোগী করে অপারেটরের কাছে বুঝিয়ে দেবে এবং অপারেটর দুই বছরের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ বন্দর হিসেবে বাস্তবায়ন করবে। চালুর ২৫ বছর পর্যন্ত অপারেট করবে। যেহেতু বন্ধ থাকা বিরল স্থলবন্দরটি সরকার এখনও চালুর উপযোগী করতে পারেনি বিধায় পূর্ণাঙ্গ বন্দর বাস্তবায়নে দেরি হচ্ছে। দিনাজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য খালিদ মাহমুদ চৌধুরী জানান, কোনও প্রকার পরিকল্পনা ও অবকাঠামো ছাড়াই স্থলবন্দর চালু করার প্রক্রিয়া শুরু করে তৎকালীন জোট সরকার। যার ফলে বন্ধ হয়ে যায় স্থলবন্দরটি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন সময়ে স্থলবন্দরটি পরিদর্শন করা হয়েছে। স্থলবন্দর চালুর জন্য মিটারগেজ রেললাইনকে ব্রডগেজ করার কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। লিংক রোডের কার্যক্রমও শুরু করা হবে। সরকারের পরিকল্পনায় বিরল স্থলবন্দর চালু করার প্রক্রিয়া রয়েছে।







