বাবা-ছেলের পরিকল্পনায় এক পরিবারের চার জনকে গলা কেটে হত্যা: পুলিশ

নওগাঁ প্রতিনিধি
২২ এপ্রিল ২০২৬, ২২:৪০ আপডেট : ২৩ এপ্রিল ২০২৬, ১৮:৩৮

নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় জমিজমা সংক্রান্ত বিরোধের জেরে ‘নিকটাত্মীয়ের পরিকল্পনায়’ একই পরিবারের চার জনকে গলাকেটে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। এ ঘটনায় তিন জনকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাতে বুধবার (২২ এপ্রিল) বিকাল ৩টায় জেলা পুলিশের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।

গ্রেফতারকৃতরা হলেন- নিহত হাবিবুর রহমানের বোন শিরিন আক্তারের স্বামী শহিদুল ইসলাম (৩০), তার ছেলে শাহিন হোসেন ও হাবিবুরের আরেক বোনের ছেলে সবুজ রানা (২০)। তিন জনের বাড়ি উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে। তাদের কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহৃত ধারালো হাঁসুয়া এবং ছোরা উদ্ধার করা হয়েছে।

এর আগে সোমবার মধ্যরাতে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে হাবিবুর রহমানসহ (৩৫) তার পরিবারের চার জনকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের শিকার অন্য তিন জন হলেন, হাবিবুর রহমানের স্ত্রী পপি সুলতানা (৩০), তার ছেলে পারভেজ রহমান (৯) ও মেয়ে সাদিয়া খাতুন (৩)।

ঘটনার পর পরই হাবিবের ভাগনে সবুজ রানা, তার বাবা নমির উদ্দিন, দুই বোন ডালিমা বেগম ও হালিমা বেগমসহ ছয়-সাত জনকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে। শুরু থেকেই পুলিশ চার হত্যাকাণ্ডের পেছনে জমিজমার বিরোধকে সামনে রেখে এগোচ্ছিল। তবে ঘরের দেয়ালে দলিল চেয়ে ‘খুনিদের’ লেখা একটি বার্তা সেই ধারণাকেই প্রতিষ্ঠিত করে দেয়। সেখানে লেখা ছিল, ‘নমির তুই বেঁচে গেলি, দলিল দে। এবার তোর পালা।’

বিকালে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘বাহাদুরপুর গ্রামের নমির উদ্দিনের এক ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। হাবিবুরের বাবা ছেলে-মেয়েদের মধ্যে তার সম্পত্তি লিখে দেন। তিনি তার ১৭ বিঘা সম্পত্তির মধ্যে বসতবাড়িসহ ১৩ বিঘা সম্পত্তি ছেলে হাবিবুর রহমানকে লিখে দেন। বাকি সম্পত্তি তার মেয়েদের লিখে দেন। হাবিবুরকে বেশি সম্পত্তি লিখে দেওয়ায় বোন, ভগ্নিপতি ও ভাগনেদের সঙ্গে হাবিবুরের ঝামেলা শুরু হয়। বেশ কিছু দিন ধরে তাদের মধ্যে বিরোধ চলছিল।’

পুলিশ সুপার বলেন, ‘জমিজমা নিয়ে বিরোধের জেরে হাবিবুরের বোন শিরিন আক্তারের স্বামী শহিদুল ইসলাম, তার ছেলে শাহিন ও হাবিবুরের আরেক বোন হালিমা খাতুনের ছেলে সবুজ রানা হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন। সোমবার বিকালে হাবিবুর তার ভাগনে সবুজ রানাকে নিয়ে উপজেলার ছাতড়া বাজারে গরু কিনতে যান। হাবিবুর এক লাখ ৪০ হাজার টাকা নিয়ে গরু কিনতে গিয়েছিলেন। পরে গরু না কিনেই বাড়িতে ফিরে আসেন। বাড়ি ফিরে আসার পর গ্রামের একটি মাঠে গিয়ে সবুজ রানা, শহিদুল, শাহিনসহ হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছয় জন পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সোমবার রাত ৮টার দিকে হাবিবুরের বাড়িতে যান সবুজ। তিনি তার মামা-মামি ও মামাতো ভাই-বোনদের সঙ্গে খাবার খান। ওই সময় সবার অগোচরে ভাগনে শাহিন বাড়িতে প্রবেশ করে একটি ঘরে লুকিয়ে থাকেন। সবুজ খাবার খেয়ে বের হয়ে যান।’

পুলিশ সুপার বলেন, ‘বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়লে শাহিন মূল দরজা খুলে দেন। তখন সবুজ রানা, শহিদুলসহ খুনিরা পাঁচ জন বাড়িতে প্রবেশ করেন। তারা প্রথমে হাবিবুরের বাবা নমির উদ্দিনের ঘরে বাইরে থেকে শিকল লাগিয়ে দেন। এরপর হাবিবুরের ঘরে ঢুকে ঘুমন্ত অবস্থায় ছুরি দিয়ে গলা কেটে তাকে হত্যা করেন। স্ত্রী পপি সুলতানা দুই সন্তানকে নিয়ে পাশের ঘরে ছিলেন। হাবিবুরকে হত্যা করার সময় পপি বাথরুমে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হন। বাড়ির আঙিনায় বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পপির মাথায় হাঁসুয়া দিয়ে আঘাত করলে তিনি মাটিতে পড়েন। পরে তাকেও গলা কেটে হত্যা করা হয়। পরে হাবিবুরের পুরো পরিবারকে নির্বংশ করার উদ্দেশে তার দুই সন্তান পারভেজ রহমান ও সাদিয়াকে গলা কেটে হত্যা করা হয়।’

তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘সকালে ঘটনা জানাজানি হলে সবুজ রানা, শহিদুল ও শাহিন হাবিবের বাড়িতে আসেন। তখন তাদের কয়েকজনকে পুলিশ হেফাজতে নেয়। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে সবুজ রানা পুলিশের কাছে হত্যার কথা স্বীকার করেন। তার স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, রাতে গ্রামের একটি খড়ের গাদায় লুকানো হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হাঁসুয়া উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া গ্রামের একটি পুকুর থেকে বুধবার হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়। খুনিরা মনে করেছে, হাবিবুরকে নির্বংশ করলে পরবর্তীতে তার নামে থাকা সম্পত্তির ভাগিদার হবে। এই ভাবনা থেকেই তারা পরিবারের সবাইকে হত্যা করেছেন।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম ও জয়ব্রত পাল, সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল আল মামুন শাওন, পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) জেলার ওসি হাসিবুল্লাহ হাবিব, নিয়ামতপুর থানার ওসি মাহবুবুর রহমান।

এ ঘটনায় নিহত পপির বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন নিয়ামতপুর থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন। বিক্ষুব্ধ জনতা সবুজের বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেন। 

এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার বলেন, ‘থানা পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে কেউ যেন নিরপরাধ কোনও মানুষকে কষ্ট না দিতে না পারে। ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। গ্রেফতারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে অধিকতর জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চাওয়া হবে।’

/এএম/এমওএফ/
সম্পর্কিত
মাদ্রাসায় ভাঙচুর করা বিএনপি নেতাকে অব্যাহতি দিলেন আরেক বহিষ্কৃত নেতা
সেপ্টেম্বরে ধর্ষণের শিকার ৪৯ নারী-কন্যা, ৫২ জনকে হত্যা
শারীরিক প্রতিবন্ধী গৃহকর্মীকে ধর্ষণের মামলায় সেই গৃহকর্তা কারাগারে 
সর্বশেষ খবর
শেখ হাসিনার সেই দায়িত্ব রুমিন ফারহানা কাঁধে নিয়েছেন, অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে: নাদিয়া পাঠান
শেখ হাসিনার সেই দায়িত্ব রুমিন ফারহানা কাঁধে নিয়েছেন, অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে পারে: নাদিয়া পাঠান
ব্রাজিলের নির্বাচনে প্রার্থী ‘ট্রাম্প’, ‘ওবামা’, কেন জানেন?
ব্রাজিলের নির্বাচনে প্রার্থী ‘ট্রাম্প’, ‘ওবামা’, কেন জানেন?
গাড়ির আধুনিক প্রযুক্তিতে আড়িপাতার ঝুঁকি
গাড়ির আধুনিক প্রযুক্তিতে আড়িপাতার ঝুঁকি
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
একনজরে আজকের আলোচিত খবর
সর্বাধিক পঠিত
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কুষ্টিয়ার সেই শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে কুষ্টিয়ার সেই শিক্ষককে বাড়ি পৌঁছে দিয়েছে পুলিশ
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘বের করে দিলেন’ রুবিও
ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ‘বের করে দিলেন’ রুবিও
‘আম্মার উড়ে আসা নেতা’, কার ওপর গজব পড়ার কথা বললেন উমামা
‘আম্মার উড়ে আসা নেতা’, কার ওপর গজব পড়ার কথা বললেন উমামা
এলপিজি: বেশি দামে বিক্রি হলে কঠোর ব্যবস্থা
এলপিজি: বেশি দামে বিক্রি হলে কঠোর ব্যবস্থা
স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে বের হয়ে যা বললেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি
স্পিকারের সঙ্গে দেখা করে বের হয়ে যা বললেন ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি