পদ্মা নদীর উত্তাল ঢেউয়ের সঙ্গেই কেটেছে জাহেরা বেগমের ৫৫ বছরের জীবন। এই নদীকে ঘিরেই ছিল তাদের সংসার, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার লড়াই। কিন্তু সেই নদীই যে শেষ পর্যন্ত তার জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়াবে, তা ভাবতেও পারেননি তিনি।
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) দুপুরে মাঝনদীতে ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকাডুবির পর আগের তিনবারের মতো এবারও প্রাণে বেঁচে ফিরেছেন জাহেরা। এটি ছিল তার জীবনে চতুর্থবারের মতো নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা। কিন্তু এবার তিনি ফিরলেও ফিরতে পারেননি তার স্বামী কাওসার আলী ও ছেলে জিয়ারুল হক। দুজনেই তলিয়ে গেছেন পদ্মায়। মঙ্গলবার নৌকাডুবির ঘটনায় তার স্বামী ও ছেলের লাশ দুদিন পর উদ্ধার করেছে নৌ পুলিশ। বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকালে কুষ্টিয়ার হার্ডি থেকে বাবার এবং দুপুরে রাজশাহীর পবা উপজেলা থেকে ছেলের লাশ উদ্ধার করা হয়।
নিহতরা হলেন- রাজশাহীর কাটাখালী থানার শ্যামপুর শান্তিনগর এলাকার বাসিন্দা ও নৌকার মাঝি কাওসার আলী (৬০) এবং তার ছেলে জিয়ারুল হক (৩০)। নৌ পুলিশের রাজশাহী অঞ্চলের পুলিশ সুপার (এসপি) মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার নৌকাডুবির পর থেকেই স্থানীয় ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল ও নৌ পুলিশ যৌথভাবে নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান চালায়। তবে পদ্মা নদীতে প্রবল স্রোত থাকায় মরদেহ দুটি দুর্ঘটনাস্থল থেকে অনেক দূরে ভেসে যায়। বৃহস্পতিবার সকাল ৮টার দিকে কুষ্টিয়ার বাংলাবাজার পাকশী সেতু-সংলগ্ন পদ্মা নদীতে কাওসার আলীর লাশ ভাসতে দেখে স্থানীয় লোকজন পুলিশকে খবর দেন। পরে নৌ পুলিশ গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে। অন্যদিকে, দুপুর ১টার দিকে পবা উপজেলার সাতবাড়িয়া চর এলাকার পদ্মা নদী থেকে জিয়ারুল হকের লাশ উদ্ধার করা হয়।
কাটাখালী থানার শ্যামপুর বালুঘাট এলাকায় জাহেরা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। স্বামী আর শ্বশুরকে একসঙ্গে হারিয়ে পাথর হয়ে বসে আছে জিয়ারুলের স্ত্রী সায়েরা খাতুন। তাকে জড়িয়ে ধরে স্বজনরা কাঁদছেন। বাবা আর দাদাকে হারিয়ে অবুঝ দুই সন্তান তামিম (১১) ও তাসমিরা (৭) যেন কথা বলাই ভুলে গেছে।
কান্নায় ভেঙে পড়ে সায়েরা খাতুন বলেন, ‘আমার স্বামী আর শ্বশুর দুজনেই চইলা গেলো। ঘরে এখন উপার্জন করার আর কোনও মানুষ নাই। আমরা এই ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে কী করে চলবো? সরকার যেন আমাদের দিকে একটু নজর দেয়। আমরা শুধু বাঁচতে চাই।’
নদীর পাড়ে বাঁধের ওপর বসে অপলক দৃষ্টিতে পদ্মার দিকে তাকিয়ে আছেন জাহেরা বেগম। বিলাপ করতে করতে তার গলার স্বর বসে গেছে। ৫৫ বছরের জীবনে এর আগেও তিনি তিনবার নৌকাডুবির কবলে পড়েছিলেন। সাঁতার জানা থাকায় প্রতিবারই ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করে তীরে ফিরেছেন।
জাহেরা বলেন, ‘এর আগেও পটলের নৌকাসহ তিনবার গাঙে ডুব্যাছি, মরতে মরতে বাঁচিছি। এবারও সাঁতার কেটে বাঁচনু, কিন্তু নিজের চোখে স্বামী আর ব্যাটার ডুবে যাওয়া দেখনু। দুজনে চইলা গেলো। কীভাবে বাঁচবো খোদা। আমারে না নিয়ে তাদের ক্যানে নিলো?’
বছর দশেক আগে ভারতীয় সীমান্ত লাগোয়া চর খিদিরপুর গ্রামে ছিল তাদের আদি বসতভিটা। পদ্মা নদী সেই বাড়ি গ্রাস করলে তারা নিঃস্ব হয়ে এই পারে চলে আসেন। জমিজমা হারালেও নদীকে ছাড়তে পারেননি তারা। পানের বরজে ঝাউগাছের চাহিদাকে কাজে লাগিয়ে চরের ঝাউগাছ কেটে চারঘাটের টাঙনে বিক্রি করেই চলত তাদের সংসার।
বছরখানেক আগে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা কেনেন কাওসার আলী। প্রতি সপ্তাহে আড়াই হাজার টাকা কিস্তি শোধ করতে হতো। মঙ্গলবার দুপুরে সেই নৌকাটিতে করে জাহেরা, তার স্বামী ও ছেলেসহ কয়েকজন চরে ঝাউগাছ কেটে ফিরছিলেন। কিন্তু রাজশাহীর বড়কুঠির সামনে মাঝনদীতে আকস্মিক দমকা বাতাসে নদী উত্তাল হয়ে ওঠে এবং নৌকাটি ডুবে যায়। জাহেরাসহ ছয় জন সাঁতরে ও অন্য নৌকার সহায়তায় বাঁচলেও কাওসার ও জিয়ারুল তলিয়ে যান।
রাজশাহী মহানগর যুবদলের সদস্যসচিব মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম রবি বলেন, ‘এই মর্মান্তিক ঘটনায় আমরা গভীরভাবে ব্যথিত। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় জাহেরা বেগমের পিতৃহারা দুই নাতনির দায়িত্ব আমরা নিয়েছি। পরিবারের পাশে আমাদের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে প্রাণহানি কমাতে মাঝিদের মধ্যে লাইফ জ্যাকেট বিতরণ করেছি। আমরা চাই না পদ্মার বুকে আর কোনও নৌকাডুবিতে কোনও মায়ের বুক খালি হোক।’

পদ্মায় নৌকাডুবি: দুই দিন পর উদ্ধার বাবা-ছেলের মরদেহ







