নাটোরের লালপুর ও বাগাতিপাড়া উপজেলায় ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী ও সুপারভাইজার নিয়োগে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ তুলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের (ইউএনও) কার্যালয় ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন ছাত্রদল এবং যুবদলের নেতাকর্মীরা। এ সময় ইউএনও কার্যালয়ের দরজায় লাথি, ফুলের টব ভাঙচুর ও সাংবাদিকদের মারধর করে ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ঘটনার ধারণ করা ছবি-ভিডিও মুছে ফেলা হয়।
বুধবার (১২ আগস্ট) বেলা ১১টা থেকে বিক্ষোভ করেন ছাত্রদল-যুবদলের নেতাকর্মীরা। বেলা ২টার দিকে ইউএনও কার্যালয়ে ভাঙচুর চালানো হয়। এ সময় দুই উপজেলার ইউএনওরা অবরুদ্ধ অবস্থায় কার্যালয়ে ছিলেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে। বিকাল ৪টা পর্যন্ত বাগাতিপাড়ায় নেতাকর্মীরা ইউএনও কার্যালয়ের সামনে এবং লালপুরে উপজেলা পরিষদ ভবনের হলরুমে বিক্ষোভ করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শী ও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং ইউএনও কার্যালয়ের কর্মচারীরা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বুধবার সকালে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহের জন্য সুপারভাইজার ও কর্মী নিয়োগ পরীক্ষার ফল ঘোষণা করা হয়। সেখানে আওয়ামী লীগের লোকজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এমন অভিযোগ তোলেন যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে প্রতিবাদ জানিয়ে স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করেন। বাগাতিপাড়ার মালঞ্চি রেলগেট এলাকা থেকে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সোহেল রানার নেতৃত্বে মিছিলটি ইউএনওর কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেয়। সেখানে গিয়ে ইউএনওর বিরুদ্ধে ফ্যামিলি কার্ডের তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগে বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
একপর্যায়ে সেখানে উত্তেজনা সৃষ্টি হলে বিক্ষোভকারীরা ইউএনওর কক্ষের সামনে ভাঙচুর করে ইউএনওকে অবরুদ্ধ করে রাখেন। এ সময় ঘটনার ছবি-ভিডিও ধারণ করলে অন্তত পাঁচ জন সাংবাদিককে মারধর ও লাঞ্ছিত করা হয়। তাদের ফোন ছিনিয়ে নিয়ে ছবি-ভিডিও মুছে দেওয়া হয়। তবে ঘটনাস্থলে পুলিশ থাকলেও কোনও ব্যবস্থা নেয়নি। এমনকি সাংবাদিকদের মারধর করলেও কোনও রকম বাধা দেয়নি পুলিশ।
স্থানীয় দুজন সাংবাদিক জানিয়েছেন, ঘটনার তথ্য সংগ্রহ এবং ভাঙচুরের ছবি-ভিডিও ধারণ করার সময় স্টার নিউজের জেলা প্রতিনিধি তারিকুল ইসলাম, এনটিভি অনলাইনের প্রতিনিধি সজিবুল ইসলাম, ঢাকা পোস্টের প্রতিনিধি আশিকুর রহমান, দৈনিক মানবজমিনের প্রতিনিধি রাশিদুল ইসলাম ও নেক্সাস টেলিভিশনের প্রতিনিধি শরিফুল ইসলামসহ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীকে মারধর করেছেন যুবদল-ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
এনটিভি অনলাইনের প্রতিনিধি সজিবুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও মারধরের ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি আমরা।’
তবে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে ছাত্রদল নেতা সোহেল রানা বলেন, ‘ইউএনও এই নিয়োগ পরীক্ষার ফলাফল তৈরিতে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম-দুর্নীতি করেছেন। পরীক্ষা দেয়নি এমন ব্যক্তিকে পাস করিয়েছেন। আমরা এই ফলাফল মানি না। তবে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেনি। কারা মারধর করেছে, দেখি নাই।’
এ বিষয়ে বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দেবাশীষ বসাক বলেন, ‘ঘটনাটি নিয়ে বিক্ষুব্ধ পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখে বিস্তারিত পরে জানানো হবে।’
বাগাতিপাড়া মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল হান্নান বলেন, ‘আমি ঘটনাস্থলে আছি। ফ্যামিলি কার্ড শুমারির নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়ম-দুর্নীতি নিয়ে ছেলেরা মিছিল করছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করছি।’
অন্যদিকে লালপুর ইউএনও কার্যালয় সূত্র জানায়, দুপুর ১২টার দিকে ৪০ থেকে ৫০ জন মিছিল করতে করতে কার্যালয়ের সামনে আসেন। তারা ইউএনওর গাড়ি ঘিরে ফ্যামিলি কার্ড শুমারির তথ্য সংগ্রহকারী নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে স্লোগান দিতে থাকেন। পরে তারা মিছিল নিয়ে দোতলায় ইউএনও কার্যালয়ে ঢুকে পড়েন। এ সময় উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ, বিএনপি সমর্থিত বিলমাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান, গোপালপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র নজরুল ইসলাম, ঈশ্বরদী ইউপির চেয়ারম্যান মো. রঞ্জুসহ নেতাকর্মীরা বিক্ষোভকারীদের দাবিদাওয়া নিয়ে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলেন। খবর পেয়ে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। বিকাল ৪টা পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীরা উপজেলা পরিষদের হলরুমে ও ইউএনও নিজ কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ঘটনার সময় সাংবাদিক রাশিদুল ইসলাম ও সজিবুল ইসলামকে কিলঘুষি মেরে তাদের মোবাইল কেড়ে নেন বিক্ষোভকারীরা। পরে মোবাইলে ধারণ করা ঘটনার ছবি-ভিডিও মুছে দেন।
উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘এটা দলীয় কোনও বিক্ষোভ নয়। ফলাফলে কিছু অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। এ কারণে চাকরিবঞ্চিতরা বিক্ষোভ করছেন। আমরা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছি। যারা ভাঙচুর করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে পুলিশ।’
এ বিষয়ে লালপুরের ইউএনও মো. বরকত উল্লাহকে একাধিকবার কল দিলেও ধরেননি। তবে তার ব্যক্তিগত সহকারী মাসুদুর রহমান বলেন, ‘নিয়োগের ফলাফল বাতিল চেয়ে কিছু লোক বিক্ষোভ করছে। স্যার অফিস কক্ষে আছেন। দুপুরের খাওয়াদাওয়া হয়নি আমাদের। বিএনপি নেতাকর্মীরা হলরুমে বসে আছেন। তাদের সঙ্গে থানার ওসি কথা বলছেন। বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা চলছে।’
এ ব্যাপারে লালপুর থানার ওসি শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইউএনও কার্যালয়ে এসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করি। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছি আমরা।’







