ভরা পদ্মা। বিকালে হঠাৎ উত্তাল হয়ে উঠল নদী। ঝোড়ো হাওয়া আর প্রবল স্রোতের মধ্যে বাড়ির পথে ছোট্ট একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা। সেটিতে মায়ের কোলে ছিল মাত্র ২০ দিনের শিশু তানিশা। মুহূর্তেই ডুবে গেলো নৌকা। পানিতে ভেসে গেলেন ১২ যাত্রী।
চারদিকে তখন শুধু পানি আর পানি। কেউ নৌকার কাঠের পাটাতন, কেউ বস্তা, কেউ ভাসমান কাঠ কিংবা বৈঠা ধরে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করছেন। আর শিশুটিকে বাঁচাতে মরিয়া মা তানিয়া খাতুন আঁকড়ে ধরে ছিলেন তানিশাকে। কিন্তু প্রবল স্রোতে একপর্যায়ে মায়ের হাত থেকে ছুটে পানিতে তলিয়ে যায় শিশুটি। মুহূর্তের সেই আতঙ্কের মধ্যেই আবার তানিশাকে খুঁজে পান তানিয়া। এবার আর ছাড়েননি। দুই পা দিয়ে শিশুটিকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে পানির ওপরে তুলে রাখেন। নাতনিকে বাঁচাতে তানিশার নানা ইব্রাহিমও এক হাত উঁচু করে ধরে সাঁতরে চলেন।
এভাবেই প্রায় এক ঘণ্টা ২০ মিনিট মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে পানিতে ভেসে থাকেন তারা। প্রবল স্রোত তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায় ভারতীয় জলসীমার দিকে। পরে ভাসমান অবস্থায় তানিশাসহ ১০ বাংলাদেশিকে দেখতে পেয়ে স্পিডবোট নিয়ে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)।
ঘটনাটি ঘটেছে শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার বাখের আলী এলাকা থেকে জোহুরপুর বেলপাড়ার দিকে যাওয়ার পথে পদ্মা নদীতে। তানিশা চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার জহুরপুর (বকরীপাড়া) গ্রামের মো. সোহেল ও তানিয়া খাতুন দম্পতির ২০ দিনের সন্তান।
নৌকা ডুবতেই যে যার মতো বাঁচার চেষ্টা
বিজিবি ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার বিকাল ৫টার দিকে বাখেরআলী এলাকার আলীমনগর ঘাট থেকে ১২ যাত্রী নিয়ে একটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা জহুরপুরটেক গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়। পদ্মা নদীর মধ্যে গিয়ে নৌকাটি ডুবে যায়। এ সময় মো. ওয়াসিম (২৩) সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হন। বাকি ১১ জন নিখোঁজ হন। পরে বিএসএফের সদস্যরা তাদের মধ্যে ১০ জনকে জীবিত উদ্ধার করেন। তবে একই গ্রামের মো. মোস্তফা (৬০) এখনো নিখোঁজ।
বাখের আলী বিজিবি ক্যাম্পের সুবেদার শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘নৌকাডুবির পর তানিশাকে তার মা শক্ত করে ধরে রেখেছিলেন। একই সঙ্গে নৌকার ধানের গুঁড়া, বৈঠা ও কাঠের পাটাতনের ওপর ভর করে তারা ভেসে ছিলেন। একপর্যায়ে প্রবল স্রোতে শিশুটি মায়ের হাত থেকে ছুটে পানিতে তলিয়ে যায়। পরে তানিয়া খাতুন তাকে খুঁজে পান এবং আবারও শক্ত করে আঁকড়ে ধরেন।’
ফরিদপুর বিওপির কোম্পানি কমান্ডার শহিদুল ইসলাম বলেন, শিশুটির নানা ইব্রাহিম সাঁতার জানতেন। অন্যদিকে নারীরা নৌকার পাটাতন, বৈঠা ও বস্তা ধরে ভেসে ছিলেন। তাঁরা এক ঘণ্টার বেশি সময় পানিতে ভেসেছিলেন।
নারায়ণপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রবিউল ইসলাম রবু বলেন, ‘প্রথমে তানিশাকে তার মা তানিয়া খাতুন আঁকড়ে ধরেছিলেন। প্রবল স্রোত ও ঝড়ের কারণে একপর্যায়ে শিশুটি তার হাত থেকে ছুটে পানিতে ডুবে যায়। পরে তানিয়া তাকে খুঁজে পেয়ে দুই পা দিয়ে আঁকড়ে ধরে পানির ওপরে তুলে রাখেন।’
তিনি বলেন, ‘শিশুটির কষ্ট দেখে তানিশার নানা ইব্রাহিম নাতনিকে এক হাত উঁচু করে ধরে সাঁতরে প্রাণে বাঁচেন। এভাবে প্রায় এক ঘণ্টা ২০ মিনিট পানিতে ভেসে থাকার পর বিএসএফ সদস্যরা তাদের উদ্ধার করেন।’
বিএসএফের হাতে উদ্ধার, নিস্তেজ ছিল তানিশা
সন্ধ্যা আনুমানিক ৫টা ৫০ মিনিটে ৭১ ব্যাটালিয়ন বিএসএফের খান্দুয়া ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার বিজিবিকে নৌকাডুবির বিষয়টি জানান। তিনি জানান, বিএসএফ ১০ বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করেছে। তাদের মধ্যে চার জন পুরুষ, তিন জন নারী ও তিন জন শিশু ছিলেন। ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার লালগোলা থানার তারানগরের বাসিন্দা শ্যামলাল মণ্ডল তখন ঘটনাস্থলে ছিলেন। তিনি বলেন, বিএসএফ সদস্যরা বাংলাদেশিদের উদ্ধার করে নদীর তীরে নিয়ে আসেন। তখন ২০ দিনের তানিশা প্রায় নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল। পরে বিএসএফ সদস্যরা দ্রুত শিশুটিকে স্থানীয় একটি চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যান। চিকিৎসকেরা পরীক্ষা করে জানান, শিশুটি সুস্থ আছে।
পতাকা বৈঠকের পর দেশে ফিরলেন ১০ জন
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫৩ বিজিবি ব্যাটালিয়ন জানায়, বিএসএফের কাছ থেকে বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। রাত ৯টা ৫৫ মিনিটে ফরিদপুর বিওপি কমান্ডার ও খান্দুয়া বিএসএফ ক্যাম্প কমান্ডারের মধ্যে কোম্পানি কমান্ডার পর্যায়ে পতাকা বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে উদ্ধার হওয়া ১০ বাংলাদেশিকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে তাদের নিকটাত্মীয় মো. ইসমাইল হোসেনের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
৫৩ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘শনিবার ৭১ বিএসএফ ব্যাটালিয়নের খান্দুয়া ক্যাম্পের সদস্যরা স্পিডবোট নিয়ে বাংলাদেশিদের উদ্ধার করেন। রাতেই উদ্ধার হওয়া ১০ বাংলাদেশিকে বিএসএফ সদস্যরা বিজিবির কাছে হস্তান্তর করেন। পরে বিজিবি তাদের স্বজনদের জিম্মায় ছেড়ে দেয়।’ তিনি বলেন, ‘উদ্ধার হওয়া ১০ বাংলাদেশির মধ্যে তানিশাসহ নয় জন রাতে সুস্থ অবস্থায় দেশে ফিরেছে।’
উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন—মো. রাসেল (২৬), মো. ইব্রাহিম (৫০), সওদাগর (৪০), মো. ইব্রাহিম (৬০), সখিনা (৪৫), নিলুফা (৩৫), তানিয়া (২২) ও তাঁর ২০ দিনের শিশু তানিশা, সানাউল্লাহ (৯) এবং আল আমিন (৯)। তাঁদের সবার বাড়ি চাঁপাইনবাবগঞ্জের জহুরপুর (বকরীপাড়া) গ্রামে।
এখনও নিখোঁজ মোস্তফা
নৌকাডুবির পর সাঁতরে তীরে ওঠেন ওয়াসিম। পরে বিএসএফ ১০ জনকে উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে দেয়। তবে একই গ্রামের মৃত আলতাব হোসেনের ছেলে মো. মোস্তফা (৬০) এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। তার সন্ধানে উদ্ধার তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছে বিজিবি।
প্রবল স্রোত, ঝড়ো হাওয়া আর মৃত্যুভয়ের মধ্যে প্রায় সোয়া ঘণ্টা পদ্মার পানিতে ভেসে থাকার পর ২০ দিনের তানিশার জীবিত ফিরে আসাকে স্থানীয় লোকজন অলৌকিক ঘটনা বলছেন। কখনও মায়ের বুক, কখনও নানার উঁচু করে ধরা এক হাত, আবার কখনও নৌকার পাটাতন, বস্তা কিংবা ভাসমান কাঠ—মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে গেছে বেঁচে থাকার অবলম্বন। শেষ পর্যন্ত মায়ের প্রাণপণ চেষ্টায় পদ্মার বুক থেকে জীবিতই ফিরেছে ছোট্ট তানিশা।









