‘শুধু জীবনটা আছে। সহায়-সম্বল নদীর ভাঙনে আর বানের জলে ভেসে গেছে। তিস্তার ভাঙনের ভয়ে সাত দিন ধরে চোখে ঘুম নেই। জায়গা-জমি সবই তো গেলো, কোথায় যাবো ছেলে মেয়ে নিয়ে। কোনও কিছু ভাবতে পারছি না।’ কথাগুলো বলছিলেন নীলফামারীর জলঢাকা উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের ডাউয়া বাড়ি গ্রামের মাবিয়া বেগম (৪৬)।
শুধু মাবিয়াই নয়, তার মতো আরও অনেকে সহায়-সম্বল হারানোর কথা বলেন। তিস্তার ভাঙনে শতাধিক পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে বসবাস করছে খোলা আকাশের নিচে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জলঢাকা উপজেলার শৌলমারী গ্রামের হারাগাছ বানপাড়ার ভাঙনের শিকার পরিবারগুলো ঘরবাড়ি অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। কেউ কাটছেন গাছ, কেউবা কাটছেন বাঁশ। আবার অনেকেই টিনের চালা দিয়ে মাথাগোজার ঠাঁই খুঁজছেন ফাঁকা জায়গায়। আবার অনেকেই গোখাদ্যের জন্য প্রয়োজনীয় খড়কুটো পালা করে রাখছেন উঁচু স্থানে।
ওই এলাকার নদী ভাঙনের শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক বাবুল হোসেন (৪৭) জানান, এক সপ্তাহের ব্যবধানে তিস্তা নদীর ভাঙনে ছয়টি ঘর, বসতভিটা ও ১৪ বিঘা ফসলি জমি নদী গর্ভে বিলিন হয়েছে। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে এই গ্রামের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, ‘নদীর ভাঙনে ডানতীর বাঁধসংলগ্ন প্রায় ৪০ বছরের একটি হাফিজিয়া মাদ্রাসাসহ শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ী নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে।’
একই এলাকার আলমগীর হোসেন বলেন, ‘তিস্তা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে, ফলে তিস্তার ডানতীর বাঁধসংলগ্ন মানুষের ঘরবাড়ি ভাঙছে। ভাঙনের শিকার ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো হারিয়েছে কমপক্ষে ৪০-৫০ একর জমি।’
শৌলমারী ইউনিয়নের বান পাড়ার বাসিন্দা ফয়জুল ইসলাম, এনামুল, সফিকুল ইসলাম ও দুলু মিয়া জানান, শুধু বানপাড়া নয়, পাশের কিশামত, নোহালী, গোপালঝাড়—এই তিন ইউনিয়নের প্রায় এক হাজার ৭০০ একর জমি নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার একর জমি হুমকির মুখে। মানুষ বাধ্য হয়ে বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। সেটিও আবার সর্বনাশা তিস্তা ভাঙতে শুরু করেছে।
পল্লি চিকিৎসক মমিনুর রহমান বলেন, ‘আগে থেকেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজনের জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্ত কোনও লাভ হয়নি। এ ব্যাপারে তারা কোনও পদক্ষেপ নেননি। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় বানভাসিদের ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। ভাঙনের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের লোকজন এসে সামান্য কিছু জিও ব্যাগ ফেলে গেছে; তাও আবার ভাঙন এলাকায় বোমা মেশিন বসিয়ে বালু তুলে। এটি কতখানি যুক্তিসঙ্গত তা উনারাই ভালো জানেন। কথা ছিল চর এলাকা থেকে বালি এনে ভাঙন এলাকায় ফেলার।’
জলঢাকা উপজেলার শৌলমারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রাণজিৎ কুমার পলাশ বলেন, ‘ভাঙনের খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে (পিআইও) সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকায় গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৮৩ পরিবারের তালিকা করে জেলা প্রশাসক বরাবরে আবেদন পাঠিয়েছি। দ্রুত তাদের আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে।’
ডালিয়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী প্রকৌশলী ফিরোজ আহম্মেদ জানান, বন্যার পানি নেমে যাওয়ায় নদীর তীব্র ভাঙনে ওইসব এলাকায় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রক্ষার কাজ চলমান আছে। আর বানপাড়ায় ২৫০ মিটারে পাইলিং এর কাজ চলছে। স্থায়ীভাবে সমস্যা সমাধানের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। আশা করি, স্থায়ী সমাধান হবে।’








