বাদীর কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে আসামির পক্ষে প্রতিবেদন দেওয়ার অভিযোগ

রংপুর প্রতিনিধি
১৫ জুলাই ২০২২, ২২:৫০আপডেট : ১৬ জুলাই ২০২২, ১১:১১

রংপুর সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শিখা রানী রায়ের বিরুদ্ধে মামলার বাদীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একইসঙ্গে আসামির কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে বাদীর বিরুদ্ধে পাঁচ মাস পর আদালতে প্রতিবেদন দিয়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।

এ ঘটনার অডিও ফাঁস হয়েছে। অডিওতে ঘুষ লেনদেনের কথোপকথন হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হলে টাকা ফেরত দেবে বলে বাদীর বাবা ও ভাইকে নির্যাতন করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে বলে জানিয়েছেন রংপুর সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালক।

মামলার এজাহার ও ভুক্তভোগী গৃহবধূর বরাত দিয়ে রংপুর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালতের সরকারি কৌঁসুলি রফিক হাসনাইন বলেন, পাঁচ বছর আগে রংপুর সদর উপজেলার বাঁশকাটা গ্রামের বাসিন্দা ও মহানগর পুলিশে কর্মরত কনস্টেবল ইসমাইল হোসেনের সঙ্গে ভুক্তভোগী নারীর বিয়ে হয়। বিয়ের পর মোটরসাইকেল কিনে দেওয়াসহ কিছু টাকা যৌতুক দাবি করেন ইসমাইল। তবে টাকা দিতে না পারায় স্ত্রীর ওপর নির্যাতন শুরু করেন। এরই মধ্যে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন স্ত্রী। তখনও স্ত্রীকে মারধর করেন। এতে প্রচুর রক্তক্ষরণ হলে তাকে নগরের একটি ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার গর্ভপাত হয়। 

রফিক হাসনাইন বলেন, চলতি বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি এ ঘটনায় রংপুরের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আদালত-১-এ ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে যৌতুক দাবি ও ভ্রূণ হত্যার অভিযোগে মামলা করেন স্ত্রী। মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা শিখা রানীকে নির্দেশ দেন আদালত। কিন্তু পাঁচ মাস তার কাছে ধরনা দিয়েও প্রতিবেদন পাননি গৃহবধূ। তিনি প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য ঘুষ দাবি করলে ১০ হাজার টাকা দেন। গত বুধবার গৃহবধূর বিপক্ষে আদালতে প্রতিবেদন দেন শিখা রানী। ওই দিন বিকালে গৃহবধূর বাবা ও ভাই ঘুষের টাকা ফেরত নিতে উপজেলা পরিষদে গেলে তাদের নির্যাতন করেন শিখা রানী।

ভুক্তভোগী গৃহবধূ বলেন, বিয়ের সময় সোনার গহনা ও আসবাবপত্রসহ ইসমাইলকে নগদ টাকা দেওয়া হয়। বিয়ের কিছুদিন পর ইসমাইল জানান পুলিশে চাকরি নিতে অনেক টাকা খরচ হয়েছে। এজন্য আমার বাবাকে পাঁচ লাখ টাকা দিতে হবে। টাকা দিতে না পারায় আমাকে নির্যাতন করতেন। ২০১৯ সালের ৭ মে আমাকে মারধর করে গুরুতর আহত করেন। তখন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় আসি। এরপর এলাকাবাসী ও স্বজনদের মধ্যস্থতায় এক খণ্ড জমি বিক্রি করে ইসমাইলকে তিন লাখ টাকা দেন আমার বাবা। এরই মধ্যে এক নারীর সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন ইসমাইল। বিষয়টি জানাজানি হলে মোটরসাইকেল কিনে দেওয়াসহ আরও পাঁচ লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। টাকা দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে আমার ওপর নির্যাতন শুরু হয়। নির্যাতন করে আমার পাঁচ মাসের গর্ভের সন্তান নষ্ট করা হয়। সেদিন আমার পেটে লাথি দেওয়ায় প্রচুর রক্তক্ষরণ হয়। তখন রংপুরের বুড়িরহাট রোডের ক্লিনিকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হই। তখন আমার কোনও খোঁজখবর নেননি ইসমাইল। এ ঘটনায় গত ১৫ ফেব্রুয়ারি তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করি। বিচারক সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেন সমাজসেবা কর্মকর্তা শিখা রানীকে।

তিনি বলেন, এরপর শিখা রানীর সঙ্গে কয়েকবার যোগাযোগ করি। তিনি প্রতিবেদন দিতে ঘুষ চান। অনেক কষ্টে ১০ হাজার টাকা দিয়ে আসি তার অফিস সহকারী সামিউলের কাছে। টাকা দেওয়ার পরও প্রতিবেদন দিতে গড়িমসি করেন। আদালত সাত কার্যদিবসের কথা বললেও পাঁচ মাস ধরে সময়ক্ষেপণ করেন। এরই মধ্যে মামলার আসামি ইসমাইল হোসেনের কাছ থেকে এক লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে আমার বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন দেন। গত বুধবার আদালতে গিয়ে বিষয়টি জানতে পারি। এরপর আদালতের সরকারি কৌঁসুলি রফিক হাসনাইনকে বিষয়টি জানাই। তিনি শিখা রানীর সঙ্গে মোবাইলে কথা বললে ঘুষের টাকা ফেরত দেবে বলে জানান। বুধবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে স্বজনদের নিয়ে শিখা রানীর অফিসে গিয়ে টাকা আনতে বলেন। তার কথা অনুযায়ী আমার বাবা ও ভাই অফিসে গেলে শিখা রানী ও তার অফিসের কর্মচারীরা নির্যাতন ও লাঞ্ছিত করে বের করে দেন। আহত অবস্থায় তারা রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।

সরকারি কৌঁসুলি রফিক হাসনাইন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রথমত আদালতের আদেশ অনুযায়ী সাত কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দেননি শিখা রানী। দ্বিতীয়ত বাদীর কোনও বক্তব্য শোনেননি এবং কাগজপত্র দেখেননি। তৃতীয়ত তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নামে ১০ হাজার টাকা বাদীর কাছ থেকে ঘুষ নেওয়ার কথা স্বীকার করে ফেরত দিতে স্বজনদের অফিসে ডেকে মারধর করেছেন। বিষয়টি আদালতে উপস্থাপন করা হবে।’

এদিকে, ফাঁস হওয়া ৪৪ সেকেন্ডের অডিওতে ভুক্তভোগীর পরিচয় দিয়ে একজন পুরুষ তদন্ত প্রতিবেদন কবে দেবেন তা জানতে চান। অন্য প্রান্তে নারী কণ্ঠে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘যত তাড়াতাড়ি আমাদের সন্তুষ্ট করতে পারবেন, তত তাড়াতাড়ি রিপোর্ট পাবেন।’ এ সময় পুরুষ কণ্ঠে আরও বলা হয়, ‘যে ১০ হাজার দিয়েছি, তা দিয়েই কাজটা করে দেন।’ তখন নারী কণ্ঠে বলা হয়, ‘দেখি অফিসে গিয়ে আগে কথা বলি।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে শিখা রানী বলেন, ‘সন্তুষ্ট বলতে কাগজপত্রের কথা বলেছিলাম। তবে আমার অফিস সহকারী ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। টাকা ফেরত দেবো বলেছি। এজন্য তাদের নির্যাতন করা হয়নি। আর অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে ঘুষ নেওয়া হয়নি।’ 

আদালত সাত কার্যদিবস বললেও কেন প্রতিবেদন দিতে পাঁচ মাস লাগলো জানতে চাইলে শিখা রানী বলেন, ‘এ বিষয়ে কোনও কথা বলতে চাই না।’

এ ব্যাপারে রংপুর সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালক আবদুল মতিন বলেন, ‘১০ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার সত্যতা পেয়েছি আমরা। অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার পাশাপাশি বিষয়টি আদালতকে জানানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

/এএম/
সম্পর্কিত
কারামুক্ত স্বামীকে জড়িয়ে কাঁদলেন স্ত্রী, আবার ধরে নিয়ে গেলো ডিবি পুলিশ
মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ের মামলাজট নিরসনের উদ্যোগ জোরদারের দাবি মন্ত্রীর
ইকরার মৃত্যু: জামিন পেলেন অভিনেতা জাহের আলভীর মা
সর্বশেষ খবর
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
আফগানিস্তানের সঙ্গে ড্র করলো বাংলাদেশ 
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
বিশ্বের সেরা ১০০ উপন্যাস : বাছাই ও বির্তক
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
ঢাকায় পৌঁছেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান 
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
পুলিশের নজরবন্দি আইভী
সর্বাধিক পঠিত
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
দায়িত্ব ছাড়ার প্রসঙ্গে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উদাহরণ টানলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
যুদ্ধবিরোধী প্রস্তাব পাসের পর এবার কী ঘটবে ইরানে
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ড: নিজেকে নির্দোষ দাবি ডলারের
আপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি
সংবাদ সম্মেলনে ইউএনও মুনমুন নাহার আশাআপা ডাকায় নয়, বাসি মিষ্টি পাওয়ায় জরিমানা করেছি