X
রবিবার, ০৪ ডিসেম্বর ২০২২
১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

এত প্রশ্ন ফাঁস হলো কীভাবে?

আরিফুল ইসলাম রিগান, কুড়িগ্রাম
২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২০:৫২আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২, ২০:৫৮
দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের অধীনে চলমান এসএসসি পরীক্ষার গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, কৃষি ও রসায়ন—এই চারটি বিষয়ের পরীক্ষা অনিবার্য কারণবশত স্থগিত করা হয়েছে। বুধবার (২১ সেপ্টেম্বর) সকালে বোর্ডের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত নোটিশের মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়েছে। মূলত কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার একটি পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে এসএসসির ছয়টি বিষয়ের প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেয় শিক্ষা বোর্ড।

এরই মধ্যে জেলা শিক্ষা বিভাগ ও পুলিশের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে প্রশ্নফাঁসের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, এতগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁস হলো কীভাবে?

এদিকে, প্রশ্নফাঁসে জড়িত থাকার অভিযোগে ভূরুঙ্গামারীর নেহাল উদ্দিন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও কেন্দ্র সচিব লুৎফর রহমান, ওই বিদ্যালয়ের ইংরেজি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক আমিনুর রহমান রাসেল, ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক জোবায়ের হোসেন এবং অফিস সহকারী আবু হানিফের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমিটি। তাদের মধ্যে অফিস সহকারী আবু হানিফ পলাতক রয়েছেন। তাকে গ্রেফতারে পুলিশের অভিযান চলছে।

কীভাবে এতগুলো প্রশ্ন ফাঁস হলো?

গ্রেফতার শিক্ষকদের জিজ্ঞাসাবাদে প্রাপ্ত তথ্য এবং মামলার এজাহারের বরাত দিয়ে পুলিশ ও শিক্ষা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা জানান, চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র থানায় বাছাইয়ের (সর্টিং) সময় নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় পরীক্ষা কেন্দ্রের বাংলা প্রথমপত্রের প্রশ্নপত্রের প্যাকেটের ভেতর বাংলা দ্বিতীয়পত্র, ইংরেজি প্রথম ও দ্বিতীয়পত্র, গণিত, উচ্চতর গণিত, রসায়ন, কৃষি, জীববিজ্ঞান এবং পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্র ঢুকিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সিলগালা করা প্যাকেটের ওপর স্বাক্ষর করেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান। বাংলা প্রথমপত্রের পরীক্ষার দিন থানা থেকে বাংলা প্রথমপত্রের প্যাকেট এনে তা খুলে অন্য প্রশ্নগুলো কৌশলে সরিয়ে ফেলা হয়। পরে ফাঁস করা প্রশ্নের উত্তরপত্র তৈরি করে পরীক্ষার্থীদের কাছে চুক্তি ভিত্তিতে বিভিন্ন মূল্যে বিক্রি করা হয়। ইংরেজি প্রথমপত্র পরীক্ষা চলাকালীন পরীক্ষার আগেই কয়েকজন শিক্ষার্থীর কাছে হাতে লেখা উত্তরপত্র পৌঁছে যায়। স্থানীয় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়েছিল। বিষয়টি পরীক্ষা কমিটি প্রথমে আমলে না নিলেও ইংরেজি দ্বিতীয়পত্র পরীক্ষার আগে বের হওয়া উত্তরপত্রের সঙ্গে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মিলে গেলে নড়েচড়ে বসে প্রশাসন।

এরই মধ্যে সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে প্রশ্নফাঁসের সত্যতা পাওয়া যায়। পরে বোর্ড কর্তৃপক্ষ, পরীক্ষা কমিটি ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিষয়টি আমলে নিতে বাধ্য হন। তখন সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের আটক করে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রশ্নফাঁসের রহস্য উদঘাটন হয়।

কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র নেওয়ার নিয়ম কী?

পাবলিক পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে থাকা একাধিক শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষা বোর্ড থেকে প্রশ্নপত্র জেলা প্রশাসনে পাঠানো হয়। সেখান থেকে প্রশ্নপত্র উপজেলাভিত্তিক সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানো হয়। প্রথম পরীক্ষার আগেই কেন্দ্রভিত্তিক পরীক্ষার্থীর সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে বিষয়ভিত্তিক প্রশ্নপত্র বাছাইয়ের পর তা বোর্ড থেকে সরবরাহকৃত খামে প্যাকেট করে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার স্বাক্ষরসহ সিলমোহর করা হয়। এ সময় সংশ্লিষ্ট কেন্দ্র সচিব ও ট্যাগ কর্মকর্তা উপস্থিত থাকেন। পরবর্তীতে পরীক্ষার দিন সকালে থানা থেকে সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সিলমোহরকৃত খাম কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। পরীক্ষা শুরুর আগে এসএমএসের মাধ্যমে সেট কোডের নির্দেশনা পাওয়ার পর ট্যাগ কর্মকর্তার উপস্থিতিতে খাম থেকে প্রশ্নপত্র বের করে পরীক্ষার্থীদের দেওয়া হয়।

প্রশ্নফাঁসে জড়িত কারা?

প্রশ্ন বাছাইয়ের পর খামের ভেতর ঢুকিয়ে সেই খামের ওপর ভূরুঙ্গামারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু স্বাক্ষরের পূর্বে তিনি সেই খামের ভেতর কোন কোন প্রশ্ন ঢোকানো হয়েছে—তা যাচাই করেছিলেন কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ট্যাগ কর্মকর্তা ও অন্যান্য শিক্ষকের উপস্থিতিতে কীভাবে একটি বিষয়ের প্রশ্নপত্রের খামে এতগুলো বিষয়ের প্রশ্নপত্র ঢোকানো হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান এবং সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ট্যাগ কর্মকর্তা আদম মালিক চৌধুরীসহ পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমিটি প্রশ্নফাঁসের দায় এড়াতে পারেন কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জেলার শিক্ষক-অভিভাবকরা।

মামলার এজাহার ও সংশ্লিষ্ট তদন্ত কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তে প্রশ্নফাঁসের প্রমাণ পাওয়ার পর নড়েচড়ে বসে প্রশাসন। বিষয়টি জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নজরে এলে নেহাল উদ্দিন পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমানের অফিস কক্ষে অভিযান চালিয়ে ব্যাগের ভেতর থেকে গণিত, উচ্চতর গণিত, রসায়ন, কৃষি, জীববিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের প্রশ্নপত্র উদ্ধার করে পুলিশ। এসব বিষয়ের পরীক্ষা এখনও অনুষ্ঠিত হয়নি। খবর পেয়ে ভূরুঙ্গামারীতে ছুটে যান দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. কামরুল ইসলাম, সচিব প্রফেসর মো. জহির উদ্দিন, কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রেজাউল করিম, পুলিশ সুপার আল আসাদ মো. মাহফুজুল ইসলাম ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (ডিইও) শামসুল আলম। তারা সংশ্লিষ্টদের মঙ্গলবার মধ্যরাত পর্যন্ত জিজ্ঞসাবাদ করেন। পরে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান এবং সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রের ট্যাগ কর্মকর্তা আদম মালিক চৌধুরীকে বাদ দিয়ে কেন্দ্র সচিব ও দুই সহকারী শিক্ষকসহ অফিস সহকারীর নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা করা হয়। ট্যাগ কর্মকর্তা আদম মালিক চৌধুরী বাদী হয়ে এ মামলা করেন। ছয় বিষয়ের প্রশ্নপত্র উদ্ধার হলেও বুধবার সকালে চার বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করে শিক্ষা বোর্ড।

প্রশ্নফাঁসের দায় নিচ্ছেন না কেউ

সরকারের কঠোর নজরদারি ও সতর্কতার পরও প্রশ্নফাঁসে নিজেদের দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ভূরুঙ্গামারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রহমান বলেন, ‘আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। প্রশ্ন বিতরণের দায়িত্বে আমি ছিলাম না। আমি কোনও কথা বলতে পারবো না, আপনাকে ধন্যবাদ।’ আর কোনও প্রশ্নের সুযোগ না দিয়ে তিনি ফোনের সংযোগ কেটে দেন।

প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ট্যাগ কর্মকর্তা ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আদম মালিক চৌধুরী বলেন, ‘আমি কোনোদিন দায়িত্বে অবহেলা করিনি। এটি কীভাবে হয়েছে তা বলতে পারবো না। তদন্তের অপেক্ষায় আছি। তদন্তের স্বার্থে কিছু বলতে পারছি না।’
 
যা বলছেন দায়িত্বশীলরা

সার্বিক বিষয়ে জানতে উপজেলা পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ কমিটির সভাপতি ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দীপক কুমার দেব শর্মাকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।

ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মামলার এজাহারের ভিত্তিতে তিন শিক্ষককে গ্রেফতার করেছি। তাদের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আরও দুই শিক্ষককে আটক করে থানায় আনা হয়েছে। তদন্তে যাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ছয় বিষয়ের প্রশ্নফাঁসের বিষয়ে জানতে চাইলে দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চারটি বিষয়ের পরীক্ষা পরিবর্তন করেছি। এগুলো সবই আমরা দেখছি। মামলার এজাহারের বিষয়টি বিবেচনা করে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেবো। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।’
 
/এএম/
আমাদের সমাজে মিস ওয়ার্ল্ডের কি দরকার আছে?
আমাদের সমাজে মিস ওয়ার্ল্ডের কি দরকার আছে?
ককটেল বিস্ফোরণ: বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মীর নামে পুলিশের মামলা
ককটেল বিস্ফোরণ: বিএনপির শতাধিক নেতাকর্মীর নামে পুলিশের মামলা
১৮৭ রানের জবাবে চাপে বাংলাদেশ
১৮৭ রানের জবাবে চাপে বাংলাদেশ
‘জানুয়ারি থেকে স্কুলে কোডিং, ডিজাইন ও অ্যানিমেশন শেখানো হবে’
‘জানুয়ারি থেকে স্কুলে কোডিং, ডিজাইন ও অ্যানিমেশন শেখানো হবে’
সর্বাধিক পঠিত
১১ মাসে নাগরিকত্ব ছাড়লেন ৪০১ বাংলাদেশি
১১ মাসে নাগরিকত্ব ছাড়লেন ৪০১ বাংলাদেশি
মেসি-আলভারেজের গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
মেসি-আলভারেজের গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা
‘পুলিশ প্রটোকলে’ বিদায় নিলেন রাঙ্গাবালীর ইউএনও
‘পুলিশ প্রটোকলে’ বিদায় নিলেন রাঙ্গাবালীর ইউএনও
হাসপাতালে কী হয়েছিল মাইশার সঙ্গে?
আঙুলের অপারেশন করতে গিয়ে মৃত্যুহাসপাতালে কী হয়েছিল মাইশার সঙ্গে?
সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিনের তোলা বিল ৬ মাসের মধ্যে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ
সাবেক স্পিকার জমির উদ্দিনের তোলা বিল ৬ মাসের মধ্যে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ