X
মঙ্গলবার, ২৮ মে ২০২৪
১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

প্রতিবন্ধী সন্তা‌ন‌কে তাড়িয়ে দেওয়ায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেন মা

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ২২:৫৪আপডেট : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ২২:৫৪

সন্তানকে বিদ্যালয় থেকে তাড়িয়ে দেওয়ায় প্রতিবন্ধীদের জন্য বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন রিকতা আকতার বানু নামে এক নারী। তার প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি এখন দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় আলো ছড়াচ্ছে। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রমনা মডেল ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের পাড় ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে এই বিদ্যালয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা রিকতা আকতার চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সিনিয়র স্টাফ নার্স। মানব সেবাই তার পেশা। কোনোদিন কোনও রোগীকে অবহেলা করেননি। অথচ নিজের প্রতিবন্ধী কন্যাসন্তানকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা তাড়িয়ে দেন বিদ্যালয় থেকে। এরপর অনুভব করেন যাদের সন্তান শারীরিক কিংবা মানসিক প্রতিবন্ধী সেই অভিভাবকদের বুকে জমে আছে কত বেদনা। তাই গভীর বেদনা নিয়ে কারও দিকে না তাকিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে নিজের জমিতে গড়েন প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়। ২০০৯ সালে ২৬ শতক জমিতে নিজের অর্থায়নে দোচালা টিনের ঘর তৈরি করেন। চার শিক্ষক এবং ৬৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু হয় স্বপ্নের বিদ্যালয়টির। সে থেকে নানা প্রতিবন্ধকতা পেছনে ফেলে ধীরে ধীরে বেড়ে যায় বিদ্যালয়ের পরিসর। এটি এখন আলো ছড়াচ্ছে চিলমারী উপজেলায়।

স্থানীয় অভিভাবক মেনেকা বেগম বলেন, ‘আমার মেয়ের নাম সাদিয়া সুলতানা। বয়স ৯ বছর। অন্য বিদ্যালয়ে মেয়েকে ভর্তি করাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। ভর্তি নেয় নাই। পরে রিকতা আকতারের বিদ্যালয়ে ভর্তি করাই। বিদ্যালয়ের গাড়ি দিয়ে বাড়ি থেকে সন্তানকে নিয়ে যায়, আবার দিয়ে যায়। বিদ্যালয়ের পরিবেশ সুন্দর। মেয়েকে ভর্তি করাতে পেরে আমার অনেক উপকার হয়েছে। অনেকটা দুশ্চিন্তামুক্ত আছি।’ 

বিদ্যালয়টি এখন দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় আলো ছড়াচ্ছে

আরেক অভিভাবক লাভলী বেগম বলেন, ‘আমার সন্তান ওই বিদ্যালয়ে পড়ে। ৯ বছর বয়স পর্যন্ত কথা বলতে পারেনি। খুব দুশ্চিন্তায় ছিলাম। প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে ভর্তির পর এখন কথা বলতে শিখেছে। আগে আমি তাকে বিদ্যালয়ে দিয়ে এবং নিয়ে আসতাম। এখন আর দিয়ে আসা লাগে না। একায় আসতে-যেতে পারে।’

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এই বিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী সন্তানরা আসতে পারলে অনেক খুশি হয়। বাড়িতে রাখার চেয়ে বিদ্যালয়ে আসায় তাদের মানসিক উন্নতি হচ্ছে। অনেক শিশু এখানে থেকে স্বাভাবিক হয়ে যাচ্ছে। 

বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পেছনে আমার অনেক কষ্ট লুকিয়ে আছে বলে জানালেন রিকতা আকতার। তিনি বলেন, ‘মেয়েকে যখন বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছি, তারা বাহির করে দিলো। প্রতিবন্ধী বলে গালাগাল করেছে। অনেকে পাগলি বলেছে। এরপর কোথাও ভর্তি করাতে পারিনি। সে থেকে বুকের ভেতর যন্ত্রণা হতো। সেই যন্ত্রণা থেকে আমার এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। এরপর থেকে কোনোমতে চলছে।’ 

বিদ্যালয়ে বিভিন্ন জিনিসের সংকট আছে জানিয়ে রিকতা আকতার বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের জন্য বড় একটি পরিসর দরকার। খেলাধুলার জন্য তাদের সরঞ্জামের প্রয়োজন আছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারি বেতন-ভাতার আওতায় নিয়ে আসতে পারলে অনেক উপকার হতো। তখন অনেক সংকট কেটে যেতো।’ 

যে মেয়েকে ঘিরে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছি সে মেয়ে এখন অনেকটাই সুস্থ উল্লেখ করে এই সংগ্রামী নারী বলেন, ‘আমার মেয়ে এখন বিদ্যালয় আসলে, বিদ্যালয় বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি যায় না। সব শিক্ষার্থীর সঙ্গে আনন্দে মেতে থাকে। অন্য শিক্ষার্থীরাও হাসি-খুশিতে মেতে থাকে। তা দেখে আমার মন ভরে যায়। একটা কথা কী জানেন, প্রতিবন্ধী সন্তানকে সাধারণ বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পড়াতে না চাওয়া এবং এই অপমানের কষ্ট একমাত্র মা-বাবা ছাড়া আর কেউ বুঝতে পারার কথা নয়।’ 

রমনা মডেল ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের পাড় ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে এই বিদ্যালয়

এই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহিন শাহ বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয় ২০২০ সালে এমপিওভুক্ত হয়। তিন শতাধিক শিক্ষার্থীর জন্য ৪৩ জন শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন। এর মধ্যে ২১ জন শিক্ষক-কর্মচারী এমপিওভুক্ত। বাকিরা এমপিওভুক্ত হননি। সরকারি সহায়তায় বিদ্যালয়টি প্রসারিত করা গেলে অনেক উপকার হতো। শিক্ষার্থীদের জন্য খেলনাসহ অন্যান্য সরঞ্জাম কেনা গেলে আরও মানসম্মত পাঠদান করা সম্ভব হবে।’ 

এ বিষয়ে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাঈদুল আরীফ বলেন, ‘রিকতা আকতারের প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করেছি। ইতোমধ্যে বিদ্যালয়ে সরকারি সহায়তা এসেছে। বিদ্যালয়ে এখন যেসব জিনিসের সংকট আছে, তা নিরসনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করা হয়েছে। আশা করছি, সব ধরনের সহযোগিতা আসবে। সেইসঙ্গে আমাদের সহযোগিতাও অব্যাহত থাকবে।’

/এএম/
সম্পর্কিত
সর্বশেষ খবর
খুলনায় ১৮১ মিলিমিটার বৃষ্টি, ডুবে গেছে রাস্তাঘাট
খুলনায় ১৮১ মিলিমিটার বৃষ্টি, ডুবে গেছে রাস্তাঘাট
মীরসরাইয়ে গাছ পড়ে বসতবাড়ি বিধ্বস্ত, অন্ধকারে দেড় লাখ মানুষ
মীরসরাইয়ে গাছ পড়ে বসতবাড়ি বিধ্বস্ত, অন্ধকারে দেড় লাখ মানুষ
দিনব্যাপী ভুগিয়েছে মেট্রোরেল
দিনব্যাপী ভুগিয়েছে মেট্রোরেল
গর্ভধারণ এখনও ‘অসুস্থতা’ আর ‘ফিসফাসের’ বিষয়?
নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস আজগর্ভধারণ এখনও ‘অসুস্থতা’ আর ‘ফিসফাসের’ বিষয়?
সর্বাধিক পঠিত
প্রায় ২ ঘণ্টা বন্ধের পর মেট্রোরেল চলাচল স্বাভাবিক
প্রায় ২ ঘণ্টা বন্ধের পর মেট্রোরেল চলাচল স্বাভাবিক
উপকূল অতিক্রম করে ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ এখন খুলনায়
ঢাকাসহ বেশিরভাগ অঞ্চলে ভারী বৃষ্টিউপকূল অতিক্রম করে ঘূর্ণিঝড় ‘রিমাল’ এখন খুলনায়
সর্বোচ্চ উপকার পেতে কাঠবাদাম কীভাবে খাবেন?
সর্বোচ্চ উপকার পেতে কাঠবাদাম কীভাবে খাবেন?
জমেছে রাজশাহীর আমের হাট, কেজি ৭০ টাকা
জমেছে রাজশাহীর আমের হাট, কেজি ৭০ টাকা
১৯ উপজেলায় নির্বাচন স্থগিত
১৯ উপজেলায় নির্বাচন স্থগিত