কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে সার নিয়ে কৃষকের সংকট কাটছে না। আমন এবং সবজি ক্ষেতসহ রবি মৌসুমের আগাম সবজি চাষে চাহিদার বিপরীতে সারের বরাদ্দ নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে। কৃষি বিভাগের দাবি এবং কৃষকের চাহিদার মধ্যে বিস্তর পার্থক্য দেখা গেছে।
সার বরাদ্দে শুভঙ্করের ফাঁকি দেখছেন কৃষকরা। বিপণন কেন্দ্রের সংখ্যা বাড়িয়ে চাপ কমানো গেলেও সারের চাহিদা কমানো যায়নি। খোদ কৃষি বিভাগের অনুমোদিত মাত্রায় প্রয়োগে জেলায় যে সার প্রয়োজন সরকারি বরাদ্দ তার অর্ধেক। এ ছাড়াও বিতরণে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন কৃষকরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত বছরের তুলনায় এ বছর মাসভিত্তিক (জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর) সারের বরাদ্দ বাড়িয়েছে কৃষি বিভাগ। সূত্র বলছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের তুলনায় এ বছর ইউরিয়া বরাদ্দ বেশি হলেও ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের তুলনায় ইউরিয়া বরাদ্দ ৫৫০ টন কম। তবে ডিএপির বরাদ্দ বেড়েছে ৬৬৫ টন।
কৃষি বিভাগের দাবি, ভূরুঙ্গামারীতে কৃষকদের অতিরিক্ত সার প্রয়োগের প্রবণতা রয়েছে। কৃষকরা খেয়ালখুশি মতো সার প্রয়োগ করছেন। বেশিরভাগ আমন ক্ষেতে আর ইউরিয়া কিংবা ডিএপি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। অনেকে রবি মৌসুমকে সামনে রেখে আগাম সার সংগ্রহ করছেন। সেই সারের জন্য ‘হাহাকার’ করছেন। তবে কৃষি বিভাগের এই দাবির সঙ্গে কৃষকদের মত ভিন্ন।
বিতরণে বৈষম্য
সার প্রাপ্তিতে স্বজনপ্রীতি এবং বৈষম্যের অভিযোগ তুলে কৃষকরা বলছেন, কেউ একাই সার পায় চার-পাঁচ বস্তা, আবার কেউ চার জন মিলে পায় এক বস্তা। অনেক প্রভাবশালী ব্যক্তি মৌসুমের জন্য প্রয়োজনীয় সার একবারে নিয়ে ঘরে রেখেছেন।
সার প্রাপ্তিতে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগও আছে। স্থানীয় প্রশাসনের অভিযানে কয়েকটি স্থান থেকে মজুতকৃত সার উদ্ধার হওয়ার ঘটনা কৃষকদের এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে।
উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকরা বিভিন্ন পয়েন্টে গিয়ে চাহিদা অনুযায়ী সার না পেয়ে ক্ষোভ আর হতাশা নিয়ে ফিরে যাচ্ছেন। তাদের দাবি, জমিতে সারের প্রয়োজন দেখা দিলেও তারা পাচ্ছেন না। আগাম সবজি চাষ বিঘ্নিত হচ্ছে।
সার বিতরণে স্থানীয় ডিলারদের অনিয়মের অভিযোগ করে ভূরুঙ্গামারীর বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ ভরতেরছড়া গ্রামের কৃষক আবু বক্কর বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সারের জন্য ঘুরতে ঘুরতে জান শ্যাষ। বারে বারে একে লোক সার পায়। আমরা ঘুইরাও পাই না। নিয়ম করি দেইক, তাইলে সবাই পায়। সার দেয় মুখ দেইখা।’
এই কৃষকের অভিযোগের সত্যতা মিলেছে ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লক্ষ্মীর মোড়ের নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রে। গত বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় ওই বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, কেউ একাই এক বস্তা সার নিয়ে যাচ্ছেন, আবার কাউকে কাউকে তিন-চার জন মিলে এক বস্তা সার নিতে হচ্ছে। এরপরও অন্তত দুইশ কৃষক সার না পেয়ে ফেরত যান। প্রকাশ্যে হতাশা আর ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
কৃষকদের অভিযোগ, যারা ডিলার কিংবা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পরিচিত তারা অগ্রাধিকার পাচ্ছেন। বাকিরা ফেরত যাচ্ছেন। তবে খুচরা বিক্রেতা ও ডিলারের প্রতিনিধিরা সেই অভিযোগ অস্বীকার করেন।
বৃহস্পতিবার ওই বিক্রয় কেন্দ্রের সার বিক্রেতা মতিয়ার রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সার পাইছি ৪০ বস্তা (৩০ বস্তা ডিএপি, ১০ বস্তা টিএসপি)। তিনশোর বেশি কৃষক। দুই-তিন জন মিলে একটা করে বস্তা নিছে। তাও কুলান যায় না। ইউরিয়া এক বস্তাও পাই নাই। এই ওয়ার্ডে আরও অন্তত দেড়শো বস্তা সার দরকার।’
ইউনিয়নের ক্যাম্প মোড়ে মেসার্স জনার্দ্দন চন্দ্র সাহা নামে বিসিআইসি অনুমোদিত ডিলারের প্রতিনিধি আবুল হাসেম বলেন, ‘এই ইউনিয়নে যে পরিমাণ সার লাগে, সে সার পাচ্ছি না।’
দুধকুমার নদের গুনাইয়েরকুটি চরে গিয়ে দেখা গেছে, কৃষকরা বিস্তৃর্ণ চরে আগাম বেগুন চাষ শুরু করেছেন। কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা হয়। তাদের অভিযোগ, চাষের এই সময় ইউরিয়া ও ডিএপি সারের প্রয়োজন পড়লেও তারা নাগাল পাচ্ছেন না।
গুনাইয়েরকুটি গ্রামের কৃষক মোজাম্মেল হক জানান, ডিলার পয়েন্টে সবাইকে ১০ কেজি করে সার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু কিছু মানুষ স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে কয়েক বস্তা করে সার পায়। অথচ সাধারণ কৃষকরা ৪-৫ বার করে ঘুরেও সার পান না। এতে ক্ষোভ বাড়ছে।
কৃষি বিভাগের অনুমোদিত হারে সারের বরাদ্দ নেই
কৃষি বিভাগ ও কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হেক্টর প্রতি যে পরিমাণ সার প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হয় কুড়িগ্রামে বরাবরই তার চেয়ে বরাদ্দ কম। এই কম বরাদ্দ আর আকুতি নিয়ে সাধারণ কৃষকদের চাষাবাদ করতে হয়।
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, এ বছর জেলায় মোট ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। সবজি ২ হাজার ২৫০ হেক্টর। এ ছাড়া রবি মৌসুমের আগাম বেগুন রয়েছে ৩৪৫ হেক্টর জমিতে, যার পরিমাণ প্রতিদিন বাড়ছে। ফুলকপি এবং বাঁধা কপি আছে প্রায় ২০০ হেক্টরে। শুধু ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় রোপা আমন আবাদ হয়েছে ১৬ হাজার ৯০০ হেক্টর এবং সবজি ৪৪০ হেক্টর। আগাম বেগুন চাষ হয়েছে ২৭৩ হেক্টর, যার লক্ষ্যমাত্রা ৬৯০ হেক্টর।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, মৌসুমে প্রতি হেক্টর রোপা আমন ক্ষেতে ইউরিয়া প্রয়োগের অনুমোদিত মাত্রা ১৯৫ কেজি, বেগুনে ২৬০ কেজি, ফুলকপিতে ২৬০ কেজি এবং বাঁধাকপিতে লাগে ৩৯০ কেজি।
এই হিসাবে দেখা যায়, জেলায় ১ লাখ ২১ হাজার ১৭৫ হেক্টর রোপা আমনের জন্য ইউরিয়া সার লাগে ২৩ হাজার ৬২৯ টন। ২০০ বিঘা জমির কপির জন্য ৬৫ টন এবং ৩৪৫ হেক্টর বেগুনের জন্য লাগে প্রায় ৯০ টন। অর্থাৎ কুড়িগ্রামের মাঠে যে ফসল রয়েছে, তার জন্য শুধু ইউরিয়া প্রয়োজন ২৩ হাজার ৭৮৪ টন। এর মধ্যে শুধু ভূরুঙ্গামারী উপজেলার আমন ও আগাম বেগুনের জন্য ইউরিয়া প্রয়োজন ৩ হাজার ৩৬৫ টন ।
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, গত জুলাই, আগস্ট এবং সেপ্টেম্বর মাসে কুড়িগ্রামের জন্য ইউরিয়া বরাদ্দ হয়েছে ১২ হাজার ৪৮৩ টন। এর মধ্যে ভূরুঙ্গামারী উপজেলার জন্য বরাদ্দ ১ হাজার ৪০৩ টন। অর্থাৎ চাহিদার প্রায় অর্ধেক। একইভাবে উল্লেখিত ফসলগুলোর জন্য জেলায় টিএসপি সারের প্রয়োজন প্রায় ৬ হাজার ১৬৪ টন। আর শুধু আমনের জন্য ডিএপি দরকার ১০ হাজার ৯০৫ টন। কিন্তু বিগত তিন মাসে জেলায় টিএসপি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২ হাজার ১০৪ টন এবং ডিএপি ৫ হাজার ৬৭ টন।
ঘাটতি বলতে নারাজ কৃষি বিভাগ
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কৃষক বোরো মৌসমে অনুমোদিত হারে যে নন-ইউরিয়া সার ব্যবহার করেন তার প্রায় ৫০ শতাংশ সার মাটিতেই থেকে যায়। সে কারণে আমন মৌসুমে অর্ধেক কম লাগে। তবে সব মৌসুমে ইউরিয়া অনুমোদিত মাত্রায় দিতে হয়। একই জমিতে ডিএপি দিলে আর টিএসপি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। বরং ৫ শতাংশ ইউরিয়া কম লাগে।’
অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বরাদ্দ ঘাটতির প্রশ্নের জবাবে উপপরিচালক বলেন, ‘এটা ঘটাতি নয়। এভাবেই বরাদ্দ ও ব্যবহার হয়ে আসছে। আমন মৌসুমে অনেক জমি উর্বর থাকে। এই সময় নিয়মিত বৃষ্টি হয়। সে কারণে অনেক জমিতে ইউরিয়া ব্যবহারের প্রয়োজন কম পরে। বরং তখন সার দিলে ফসল নুয়ে পড়ে।’
ভূরুঙ্গামারীতে নিয়মিত বরাদ্দের বাইরে অতিরিক্ত ইউরিয়া এবং ডিএপি সার চাওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।









