মৌলভীবাজারের নাসিরপুর ও বড়হাটে ‘জঙ্গি আস্তানা’ হিসেবে ব্যবহৃত সেই দুটি বাড়ি এখন দুই তত্ত্বাবধায়কের জিম্মায় রয়েছে। এর মধ্যে লন্ডন প্রবাসী মো. সাইফুর রহমানের বাড়ির কেয়ারটেকার জুয়েল আহমদ বুঝে পেয়েছেন বড়হাটের বাড়ি। আর স্থানীয় ইউপি সদস্য সৈয়দ মুজাহিদ আলীকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে নাসিরপুরের বাড়িটি। তারাই এখন সেগুলোর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
২০১৭ সালে ৯ আগস্ট বাড়ি দুটি বুঝিয়ে দেন মৌলভীবাজার পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আব্দুস ছালেক। তিনিই এ দুটি জঙ্গি আস্তানার ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে হওয়া দুটি মামলার প্রধান তদন্তকারী কর্মকর্তা। তার ভাষ্য, ‘মৌলভীবাজারের দুটি জঙ্গি আস্তানার বাড়ির মালিক একজনই। তিনি লন্ডনে থাকেন। সিআইডিতে মামলাটি হস্তান্তরের পর কেয়ারটেকার জুয়েল আহমদ ও স্থানীয় ইউপি সদস্য মুজাহিদকে এগুলো বুঝিয়ে দিয়েছি।’
ওসি মো. আব্দুস ছালেক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ ঘটনার সঙ্গে আর কারও জঙ্গি সম্পৃক্ততা আছে কিনা, এমনকি সিলেটের আতিয়া মহলে জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের কোনও মিল আছে কিনা, তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।’
নাসিরপুরের বাড়ি থেকে বড়হাটের বাড়ির দূরত্ব প্রায় ২০ কিলোমিটার। কেয়ারটেকার জুয়েল আহমদের দাবি, ‘বেলাল নামে একব্যক্তি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জানিয়ে ভাড়া নেয় নাসিরপুরের বাড়িটি। বেলালের মাধ্যমে মাহফুজ নামে এক ব্যক্তি বড়হাটের বাড়িটি ভাড়া নেয় ৭ হাজার ২০০ টাকায়।’
দুটি জঙ্গি আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পর বাড়ির মালিক লন্ডন প্রবাসী মো. সাইফুর রহমান আর দেশে ফেরেননি। তার বরাত দিয়ে মৌলভীবাজার ১ নং খলিলপুর ইউনিয়নের নাসিরপুর এলাকার ইউপি সদস্য বাংলা ট্রিবিউনকে বলেছেন, ‘যে কোনও সময় তার দেশে ফেরার কথা রয়েছে। কারণ তার ছেলেমেয়েরা লন্ডনে লেখাপড়া করছেন। দেশে ফিরে জঙ্গিবিরোধী কর্মকাণ্ডে সচেতনতার লক্ষ্যে তরুণদের নিয়ে উঠান বৈঠক করার ইচ্ছে আছে তার। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসনের সহযোগিতায় সামাজিক কর্মকান্ডে যুক্ত হতে চান তিনি।’
ইউপি সদস্য আরও জানিয়েছেন, বাড়ির কেয়ারটেকার জুয়েল আহমদ হলেন লন্ডন প্রবাসী সাইফুরের মামাতো বোনের জামাই। আগেও বাড়ি দুটি ছিল তারই দায়িত্বে। এখন অপরিচিত লোকজন বাড়িতে এলে প্রশাসনকে জানিয়ে তারপর ভাড়া দেন বলেও দাবি তাদের।
জঙ্গি আস্তানা দুটিতে অভিযানের পর স্থানীয়দের মনে কোনও আতঙ্ক রয়ে গেছে কিনা জানতে চাইলে এই ইউপি সদস্য বলেন, ‘না, বাড়ি দুটি নিয়ে মানুষের মনে আর কোনও আতঙ্ক নেই। প্রথম দিকে স্কুলের ছাত্রছাত্রী বা স্থানীয়রা বাড়িগুলোর সামনে অথবা আশপাশ দিয়ে যাতায়াতের সময় একটু আতঙ্কে থাকতো। এখন কারও মনে আর কোনও আতঙ্ক নেই।’
জানা গেছে, লন্ডন প্রবাসী সাইফুর রহমান মা-বাবার একমাত্র ছেলে। তাদের রেখে যাওয়া প্রচুর সম্পত্তি আছে তার। ইউপি সদস্যের মন্তব্য— তিনি একজন দানশীল ব্যক্তি। নাসিরপুর, কালারগাঁও ও বরাকেরপুল এলাকায় যাত্রী ছাউনি ও সড়ক বাতি স্থাপন করে দিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অবদান রাখছেন ওই প্রবাসী।
গত বছরের ২৯ মার্চ রাতে বড়হাট ও নাসিরপুরের দুটি জঙ্গি আস্তানা ঘিরে রেখেছিল পুলিশ ও র্যাব। পৃথক দুটি বাড়িতে জঙ্গি আস্তানার খোঁজ পেয়ে আশেপাশে দুই কিলোমিটার জুড়ে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। নাসিরপুরে সোয়াত টিমের প্রধান মনিরুল ইসলামের নেতৃত্বে ‘অপারেশন হিটব্যাক’ পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে আত্মঘাতী বোম্ব বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ওই আস্তানায় শিশুসহ ৭ জন নিহত হয়।
নাসিরপুরে ‘অপারেশন হিটব্যাক’ চলাকালে মৌলভীবাজার পৌরসভার বড়হাটের জঙ্গি আস্তানা ঘিরে রাখে পুলিশ ও র্যাব। পরে বড়হাটের জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে নামে সোয়াট টিম। এর নাম দেওয়া হয় ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’। এতে নিহত হয় নারীসহ তিন জঙ্গি।
নাসিরপুরে ‘অপারেশন হিটব্যাক’ ও বড়হাটে ‘অপারেশন ম্যাক্সিমাস’ চলাকালে আত্মঘাতী বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে দুই শিশুসহ নিহত হয় মোট ১০ জন। এর মধ্যে নাসিরপুরে নিহত পুরো একটি পরিবারের ৭ জন ও বড়হাটে নিহত একজনের পরিচয় শনাক্ত করা গেলেও বাকি দুই জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। ওসি মো. আব্দুস ছালেক বলেন, ‘ইতোমধ্যে একজন শনাক্ত হয়েছে। শিগগিরই আরেক জঙ্গির পরিচয় শনাক্ত করে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করবো।’
এদিকে পরিচয় পাওয়া আট জনের লাশ নিতে অনীহা দেখান স্বজনেরা। এ কারণে বেওয়ারিশ দুই লাশের সঙ্গে পৌর এলাকায় পৃথক সময়ে ১০ জনের লাশ দাফন করে মৌলভীবাজার পৌরসভা কর্তৃপক্ষ।
জানা গেছে, নাসিরপুর জঙ্গি আস্তানার মামলা নং-০১, তারিখ ০১.০৪.২০১৭ ও বড়হাটের জঙ্গি আস্তানার মামলা নং-৪, তারিখ ১.০৪.২০১৭। সন্ত্রাসবিরোধী আইন/২০০৯ (সংশোধনী-২০১৩)-এর ৬ (২) ৭/৮/৯/১০/১২/১৩ ধারায় পৃথক দুটি মামলা রুজু করেন মৌলভীবাজার মডেল থানার ওসি অকিল উদ্দিন।







