সিলেট সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে ছয় মেয়র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এর মধ্যে জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. নজরুল ইসলাম বাবুল নির্বাচনি হলফনামায় বার্ষিক আয় ও অঢেল সম্পদের তথ্য উল্লেখ করেছেন। তার আয় ও সম্পদের ধারেকাছেও নেই অপর পাঁচ মেয়র প্রার্থী। তবে ছয় প্রার্থীই পেশা হিসেবে ব্যবসা উল্লেখ করেছেন।
গত ২৫ মে এই ছয় প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। এর পরদিন রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রার্থীদের হলফনামা পাওয়া যায়। প্রার্থীদের আয় ও সম্পদের বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তা ফয়সল কাদের বলেন, ‘হলফনামায় প্রার্থীরা নিজের আয়, সম্পদ-বিবরণীসহ প্রয়োজনীয় তথ্য মনোনয়নপত্রের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনে জমা দিয়েছেন। হলফনামায় কোনও তথ্য গোপন করলে কিংবা মিথ্যা তথ্য দিলে ওই ব্যক্তির প্রার্থিতা বাতিল হয়ে যাবে।’
আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী
হলফনামার তথ্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বিএ (অনার্স) পাস। পেশায় ব্যবসায়ী। বছরে আয় দুই লাখ ৯৫ হাজার ৮৪ টাকা। এর মধ্যে ব্যবসা থেকে এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৪২, বাড়ি ভাড়া থেকে ৪৭ হাজার ৫৪২ ও কৃষিখাত থেকে এক লাখ টাকা। অস্থাবর সম্পদ হিসেবে আছে নগদ ৪১ লাখ ৮৪ হাজার ৮৪৮ টাকা, ইলেকট্রনিকস সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে দুটি টিভি, একটি ফ্রিজ ও দুটি এসি। আসবাবপত্রের মধ্যে আছে দুই সেট সোফা, চারটি খাট, একটি টেবিল, ১০টি চেয়ার ও দুটি আলমারি। স্ত্রীর নামে আছে ৪৭ ভরি স্বর্ণালঙ্কার। স্থাবর সম্পদ হিসেবে নিজের নামে তিন বিঘা কৃষিজমি, ২৩ শতক অকৃষি জমি, একটি দালান ও একটি বাড়ি আছে। তবে কোনও মামলা নেই। ধারদেনাও নেই। তিনি নগরের পাঠানটুলা এলাকার নওশা মিয়া চৌধুরীর ছেলে।
হলফনামায় দেওয়া সম্পদ ও আয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী বলেন, ‘হলফনামায় যা যা উল্লেখ করেছি তা বৈধ সম্পদ এবং সঠিক। সব তথ্য যথাযথ দিয়েছি। কোনও তথ্য গোপন করিনি। এজন্য মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।’
জয়ী হলে নগরীকে স্মার্ট এবং উন্নত নাগরিক সুবিধার নগরে পরিণত করবো উল্লেখ করে এই আওয়ামী লীগ প্রার্থী বলেন, ‘একইসঙ্গে নগর ভবনকে জনবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলবো।’
মো. নজরুল ইসলাম
জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. নজরুল ইসলাম পেশায় ব্যবসায়ী। বর্তমানে ফিজা অ্যান্ড কোং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক। স্বশিক্ষিত এই ব্যবসায়ীর বছরে আয় ৬৭ লাখ ৪৯ হাজার ৫৬৯ টাকা। এর মধ্যে ব্যবসা থেকে ২১ লাখ ৩৭ হাজার ৭০, কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত পরিচালক ভাতা ৪০ লাখ, ব্যাংক থেকে সুদ পান চার লাখ ৬৯ হাজার ৮৪৯ ও অংশীদারি ফার্ম থেকে আয় এক লাখ ৪২ হাজার ৬৫০ টাকা।
এ ছাড়া অস্থাবর সম্পদ হিসেবে নিজের নামে আছে ৫২ লাখ ৮৯ হাজার ১১০ টাকা, ব্যাংকে জমা আছে ৫৬ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। কোম্পানিতে শেয়ার আছে ১৫ লাখ টাকার ও এক কোটি ১২ লাখ ৪৭ হাজার ২৬৪ টাকার সঞ্চয়পত্র রয়েছে। তিনি বিএমডব্লিউ একটি গাড়ি, টয়োটা প্রাডো একটি, চারটি কার্গোভ্যান, আটটি কাভার্ডভ্যান ও একটি মোটরসাইকেলের মালিক। তিন লাখ ২০ হাজার টাকার স্বর্ণালঙ্কার এবং দুই লাখ টাকার আসবাবপত্র রয়েছে। স্ত্রীর নামে আছে নগদ ১১ লাখ ১২ হাজার টাকা। কোম্পানিতে শেয়ার আছে পাঁচ লাখ টাকার, তিন লাখ টাকার স্বর্ণালঙ্কার ও দুই লাখ টাকার আসবাবপত্র আছে।
স্থাবর সম্পদের মধ্যে রয়েছে ১২৮ দশমিক ২৮ শতক অকৃষি জমি। নগরের কাজিরবাজারের সিলভ্যালি টাওয়ারে রয়েছে দুই হাজার ৩৪০ স্কয়ার ফিটের একটি ফ্ল্যাট। বাগবাড়ী এলাকায় ২০০ স্কয়ার ফিটের বিল্ডিং, আখালিয়ায় ১১০০ স্কয়ার ফিটের টিনশেড বাড়ি, টুকেরবাজারে ৭ দশমিক ৫ শতক জমির ওপর ১২০০ স্কয়ার ফিটের টিনশেড বাড়ি ও বড়শালা মৌজায় ৫৪ শতক জমির ওপর এক হাজার ৮০০ স্কয়ার ফিটের ভবন রয়েছে। চার মামলার আসামি ছিলেন। এর মধ্যে তিনটি থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন। তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের একটি মামলা তদন্তাধীন।
আইডিএলসি ফাইন্যান্সের সিলেট শাখায় এক কোটি ১৩ লাখ ৬০ হাজার ৫২৩ ও ফিজা অ্যান্ড কোং কোম্পানিতে চার কোটি ১৫ লাখ ৮৩ হাজার ৪৭৪ টাকাসহ পাঁচ কোটি ২৯ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৭ টাকার ঋণ আছে। নগরের সাগরদিঘী পাড়ের আফতাব মিয়ার ছেলে নজরুল ইসলাম।
হলফনামায় তথ্য গোপনের সুযোগ নেই, তাই সবকিছু সঠিকভাবে উল্লেখ করেছি জানিয়ে নজরুল ইসলাম বলেন, ‘নগরবাসী চার মেয়াদে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মেয়র দেখেছেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। আমি নির্বাচিত হলে সিলেটকে স্মার্ট ও আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তুলবো।’
মাহমুদুল হাসান
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী মাহমুদুল হাসান এলএলবি পাস। বর্তমানে ট্রাভেলস ব্যবসায়ী। বার্ষিক আয় তিন লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ব্যবসা থেকে দুই লাখ ৪০ হাজার ও বাড়ি ভাড়া থেকে আয় এক লাখ ৪০ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পদ হিসেবে আছে নগদ এক লাখ ৮৫ হাজার টাকা, ব্যাংকে জমা আছে এক লাখ ৬৫ হাজার টাকা, এক লাখ ৫০ হাজার টাকার মোটরসাইকেল, ৩০ হাজার টাকার কম্পিউটার ও ২০ হাজার টাকার আসবাবপত্র আছে। স্ত্রীর নামে আছে ২০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার। স্থাবর সম্পদ হিসেবে যৌথ মালিকানায় একটি দোকান আছে। কোনও ধারদেনা নেই। তিনি নগরের সোনারপাড়ার মনসুর আহমদের ছেলে।
মো. জহিরুল ইসলাম
জাকের পার্টির প্রার্থী মো. জহিরুল ইসলামের শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি পাস। স্বর্ণ ব্যবসায়ী জহিরের বছরে আয় ২০ লাখ টাকা। তার ওপর নির্ভরশীলদের বছরে আয় সাত লাখ টাকা। অস্থাবর সম্পদ হিসেবে আছে নগদ ২০ লাখ টাকা, ব্যাংকে জমা ১০ লাখ টাকা, চার ভরি স্বর্ণ, চার লাখ টাকার ইলেকট্রনিকস সামগ্রী ও পাঁচ লাখ টাকার আসবাবপত্র আছে। স্থাবর সম্পদ হিসেবে নিজের নামে দুটি বাড়ি আছে। তবে বাড়ি দুটি কোথায় তা উল্লেখ করেননি। কোনও মামলা নেই। কোনও ঋণ নেই। বর্তমান ঠিকানা লালদিঘিরপাড় ব্র্যাক ব্যাংকের চারতলা উল্লেখ করেছেন। হলফনামায় স্থায়ী ঠিকানা লিখেছেন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার আশরাফপুর গ্রামে। তার বাবার নাম মো. আদম আলী।
মো. আব্দুল হানিফ
স্বতন্ত্র মেয়র প্রার্থী ছাত্রলীগের সাবেক নেতা মো. আব্দুল হানিফ পেশায় ব্যবসায়ী। এইচএসসি পাস এই প্রার্থী ব্যবসা থেকে বছরে দুই লাখ ৯০ হাজার টাকা আয় করেন। অস্থাবর সম্পদ হিসেবে নিজের নামে ব্যাংকে জমা আছে ১৭ লাখ ৭০ হাজার, একটি গাড়ি, দুই লাখ টাকার স্বর্ণ, ৫০ হাজার টাকার ইলেকট্রনিকস সামগ্রী ও ৫০ হাজার টাকার আসবাবপত্র। স্ত্রীর নামে ব্যাংকে জমা আছে ২০ লাখ ৫০ হাজার ও দুই লাখ টাকার স্বর্ণ। তবে স্থাবর সম্পদ নেই, নেই ধারদেনাও। তার বিরুদ্ধে মামলা নেই। নগরের টিলাগড়ের টিকরীপাড়ার মটু মিয়ার ছেলে তিনি।
মো. ছালাহ উদ্দিন রিমন
স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. ছালাহ উদ্দিন রিমন স্বশিক্ষিত ও পেশায় ব্যবসায়ী। তবে ব্যবসা থেকে কোনও আয় নেই। কৃষিখাত থেকে বছরে আয় ৬০ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পদ হিসেবে আছে নগদ এক লাখ ৭৫ হাজার টাকা, ব্যাংকে জমা আছে ১৬ হাজার টাকা এবং এক লাখ টাকার ইলেকট্রনিকস সামগ্রী রয়েছে।
স্থাবর সম্পদ হিসেবে নিজের নামে ৬০ হাজার টাকার ১৫ শতক কৃষিজমি আছে। তিনি পাঁচ মামলার আসামি। এর মধ্যে একটি থেকে খালাস পেলেও চারটি বিচারাধীন। কোনও ধারদেনা নেই। নগরের কদমতলী এলাকার সামাল হাসান মো. আলা উদ্দিনের ছেলে ছালাহ উদ্দিন।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২১ জুন সিলেট সিটিতে ইভিএমে ভোট হবে। ইতিমধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল শেষে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ শেষ হয়েছে। ১ জুন প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন। ২ জুন প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচার-প্রচারণা শুরু করতে পারবেন প্রার্থীরা।









