হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের ৭০০ বছরের প্রচলিত রীতি ভেঙে প্রকাশ্যে দানের টাকা গণনার নির্দেশ দিয়েছেন সিলেটের বিদায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম। তার নির্দেশে প্রশাসনের উপস্থিতিতে মাজার প্রাঙ্গণে টাকা গণনা শুরু হয়েছে।
সোমবার (২২ জুন) বিকালে মাজার প্রাঙ্গণে উপস্থিত হয়ে তিনি মাজারের দুটি দান ডেগ এবং জেলা প্রশাসনের স্থাপন করা নতুন দানবাক্স থেকে টাকা বের করে প্রকাশ্যে গণনার কার্যক্রম শুরু করান। দুপুর আড়াইটা থেকে প্রশাসনের উপস্থিতিতে এই টাকা গণনা শুরু হয়। এ সময় উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক কোনও কথা বলেননি জেলা প্রশাসক। তবে এ বিষয়ে পরে একটি ভিডিও বার্তা দেওয়ার কথা জানান তিনি।
সিলেট জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আবদুল বাছিত মোল্লা জানান, সোমবার শাহজালালের মাজারে জোহরের নামাজ আদায় করেন জেলা প্রশাসক। নামাজ শেষে বেলা ২টার দিকে প্রশাসনের উপস্থিতিতে সিলগালাকৃত ডেগ ও জেলা প্রশাসনের স্থাপনকৃত দানবাক্সের তালা খোলা হয়। পরে ডেগ ও দানবাক্স থেকে টাকা বের করা হয়। পরে সেগুলো গণনার জন্য নির্ধারিত স্থানে নেওয়া হয়। বিকাল ৫টা পর্যন্ত টাকা গণনা কার্যক্রম চলছে। দানের টাকা গণনা শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে মোট প্রাপ্ত অর্থের পরিমাণ প্রকাশ করা হবে।
হজরত শাহজালালের মূল মাজার বা সমাধিটি তার মৃত্যুর পর ১৩৪১ খ্রিষ্টাব্দে তার বাসস্থানের (যেখানে তিনি ইবাদত করতেন) কাছেই প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে বর্তমানের দৃশ্যমান বৃহৎ মাজার ও দরগাহ কমপ্লেক্সটি মূলত সুলতানি আমলে ১৫০০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে (মতান্তরে ১৫০৫ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের রাজত্বকালে খালিস খান নামক এক কর্মকর্তার মাধ্যমে) প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে নির্মাণ করা হয়। এরপর থেকে মাজারের টাকা প্রকাশ্যে গণনা করা হয়নি। সেই রীতি ভাঙলেন ডিসি সারওয়ার আলম।
এর আগে রবিবার (২১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে ন্যস্ত করা হয়। তবে ওই প্রজ্ঞাপনে প্রত্যাহারের নির্দিষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
মাজার সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজারের দানের টাকার আয়-ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ নেওয়ার পর ডিসিকে প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে জন্ম দিয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। ঠিক তখন সোমবার বেলা ১টা ১৫ মিনিটে শাহজালালের মাজারে উপস্থিত হন জেলা প্রশাসক। বিদায়ের আগে মাজারে জেলা প্রশাসকের এই আকস্মিক উপস্থিতিতে দেখা দেয় সবার মাঝে কৌতূহল। এরপর খুলে দেন সিলগালা করা তিনটি ডেগের তালা। পাশাপাশি জেলা প্রশাসনের স্থাপন করা দানবাক্সগুলো খুলে জনসম্মুখে টাকা গণনার কাজ শুরু করেন। এই টাকা গণনা শেষে ধারণা মিলবে যুগের পর যুগ দানের কত টাকা হয়েছে লুট। এমনকি দিনে কত টাকা দান আসে, তাও জানা যাবে।
মাজার সংশ্লিষ্ট দুই ব্যক্তি জানিয়েছেন, মাজারের ইতিহাসে এই প্রথম প্রকাশ্যে এভাবে দানের বাক্স ও ডেগ খুলে টাকা গণনার কার্যক্রম শুরু হলো। এতে জানা যাবে দিনে কী পরিমাণ অর্থ ডেকে পড়তো এতদিন।
টাকা গণনার কাজে অংশ নিয়েছেন মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে এক শিক্ষক জানিয়েছেন, আজকের দিন ছাড়া বিগত ইতিহাসে দানের টাকা ও মানতের পশু, স্বর্ণালঙ্কার এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গের মাসিক দানের টাকা ভাগবাঁটোয়ারা হতো। প্রকাশ্যে এসব টাকা এতদিন লুট হলেও কেউ কিছু বলতো না। গত বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাজারের দানের তিনটি ডেগ সিলগালা করা হয়। আজ মাত্র চার দিন পর সোমবার সেই ডেগের তালা খুলে গণনায় নেমেছে জেলা প্রশাসন।
টাকা গণনা করতে করতে মাজার মাদ্রাসার একজন শিক্ষক বলেন, ‘এই চার দিনের টাকার হিসাব থেকেই জানা যাবে, যুগের পর যুগ ধরে এই মাজারে দানের কত টাকা লুট হয়েছে। দিনে কত টাকা আসে। এসব টাকা কোথায় যায়। এরপর এই লুটের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার দাবি তুলবো আমরা।’
গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) বিকালে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহে থাকা দানের তিনটি ডেগ সিলগালা করে জেলা প্রশাসন। এর বদলে জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স স্থাপন করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদ রানার উপস্থিতিতে নতুন দানবাক্স স্থাপনের পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য আনসার সদস্যও নিয়োজিত করা হয়।
এ ঘটনার পর ওই দিন রাত সাড়ে ৮টার দিকে মাজারভক্তরা দরগাহ প্রাঙ্গণে জড়ো হয়ে ‘শাহজালাল, শাহজালাল’ স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করেন। এ সময় প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স স্থাপনের বিষয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। জেলা প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে মাজারের অভ্যন্তরীণ ঐতিহ্য ও ব্যবস্থাপনায় অযাচিত হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখেন মাজারের খাদেম, আশেকান এবং ভক্তদের বড় অংশ। এমন পদক্ষেপের পর ‘আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশ’-এর মতো কিছু সংগঠনের পক্ষ থেকে ডিসি সারওয়ার আলমের তীব্র সমালোচনা করা হয়। তাকে ব্যর্থ জেলা প্রশাসক হিসেবে আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়।

মাজারের ডেগে হাত দিয়ে কপাল পুড়লো ডিসি সারওয়ারের
বিদায়ের আগে ডিসি সারওয়ারের চমক, এবার জানা যাবে মাজারের কত টাকা লুট হয়
অবশেষে শাহজালালের মাজারের ডেগের তালা খুলে দিলেন ডিসি সারওয়ার






