সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্তকে হত্যাচেষ্টা মামলায় প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, হবিগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও হুইপ জি কে গউছ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরসহ আট জনকে খালাস দিয়েছেন আদালত। তবে এই মামলায় সৈয়দ নাইম আহমদ ওরফে নিমু (৪৫) নামের একজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) দুপুরে সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার এ রায় দেন।
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া নাইম আহমদের বাড়ি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর পশ্চিমপাড়া লম্বাহাটি গ্রামে। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি তাকে এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়।
বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে নিশ্চিত করেছেন সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের সরকারি কৌঁসুলি আবুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘রায়ে নাইম আহমদ নামে একজনকে মৃত্যুদণ্ড ও বাকিদের খালাস দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ শুনানি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আদালত রায় দেন। মামলায় ১২৩ জন সাক্ষীর মধ্যে ৬৭ জন আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই একজনকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়েছে।’
খালাস পাওয়া অন্য আসামিরা হলেন- মুহিব উল্লা ওরফে মফিজুর রহমান (মফিজ), মুফতি মঈন উদ্দিন ওরফে আবু জান্দাল (মাসুম বিল্লাহ ওরফে খাজা), আবদুল মাজেদ বাট (ইউসুফ বাট), নাজিউর রহমান ওরফে নাজমুল হক নাজু এবং মাওলানা তাজ উদ্দিন। তাদের মধ্যে তাজ উদ্দিন পলাতক আছেন।
মামলার এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৪ সালের ২১ জুন সুনামগঞ্জের দিরাই বাজারে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তর নির্বাচনী এলাকার একটি রাজনৈতিক সমাবেশে গ্রেনেড হামলার ঘটনা ঘটে। সমাবেশে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিচ্ছিলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। হামলায় যুবলীগের এক কর্মী নিহত হন। আহত হন অন্তত ২৯ জন। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
ঘটনার পর দিরাই থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হেলাল উদ্দিন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে পৃথক দুটি মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর লুৎফুজ্জামান বাবর, আরিফুল হক চৌধুরীসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার মৃত্যুদণ্ড পাওয়া আসামি ও হরকাতুল জিহাদের নেতা মাওলানা শেখ আবদুস সালাম ২০২১ সালের নভেম্বরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলে তাকে আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়।
দুটি মামলাতেই আট জনকে খালাস ও নাইম আহমদকে দোষী সাব্যস্ত করেন আদালত। হত্যা মামলায় নাইমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় বিস্ফোরক মামলায় তাকে আলাদা কোনও সাজা দেওয়া হয়নি।
আদালত সূত্রে জানা গেছে, মামলার নয় জন আসামির মধ্যে পাঁচ জন কারাগারে, তিন জন জামিনে ও একজন পলাতক। রায় ঘোষণার সময় পলাতক আসামি ছাড়া অন্য সবাই আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর এমপি এবং জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছসহ মামলার আসামিরা আদালতে হাজির হন। দুপুরে জনাকীর্ণ আদালতে বিচারক রায় দেন।
রায়ের পর আদালত প্রাঙ্গণে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানান আরিফুল হক চৌধুরী, জি কে গউছ ও লুৎফুজ্জামান বাবর। তারা দাবি করেন, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে তাদের এ মামলায় জড়ানো হয়েছিল। মিথ্যা মামলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে তাদের হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। তারা রায়ে সন্তুষ্ট।
অপরদিকে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া নাইম আহমদের ভাই সৈয়দ মারুফ আহমদ আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা রায়ে সন্তুষ্ট নই। এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করবো আমরা।’
এর আগে চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আদালতে হাজির হয়ে আসামিরা নিজেদের সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করেছিলেন এবং একই মাসে মামলার চূড়ান্ত যুক্তিতর্ক শুরু হয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরে বিচারাধীন থাকা সিলেট অঞ্চলের অন্যতম এই শীর্ষ রাজনৈতিক সহিংসতার মামলার রায়কে কেন্দ্র করে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই আদালত পাড়ায় ব্যাপক কৌতূহল ও উত্তেজনা বিরাজ করছিল। অবশেষে তারা খালাস পাওয়ার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ২২ বছরের এই আইনি প্রক্রিয়ার অবসান ঘটলো।









