সিলেটের হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারে ১৮ দিন পর দ্বিতীয়বারের মতো জেলা প্রশাসনের সিলগালা করা ঐতিহাসিক ডেগ আর নতুন স্থাপন করা দানবাক্স খুলে ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের মুদ্রা, স্বর্ণ-রৌপ্য, একটি গরু, ৬৫টি ও হাতে লেখা কয়েকটি চিঠি পাওয়া যায়।
শনিবার (১১ জুলাই) দুপুরে মাজার প্রাঙ্গণে দানবাক্সের টাকা গণনার সময় চিঠিগুলো পাওয়া যায়। চিঠিগুলোর একটিতে উঠে এসেছে চাকরি না পাওয়ার হতাশায় ভেঙে পড়া এক যুবকের আকুতি।
তিনি লিখেছেন, ‘আল্লাহ গো, আমি কতো চেষ্টা করতাছি একটা চাকরি নেওয়ার জন্য, আল্লাহ তাও হয় না। অনেকবার চেষ্টা করছি, অনেকবার ব্যর্থ হয়েছি। অনেক টাকা নষ্ট করছি একটা চাকরির জন্য। মাঠে ব্যর্থ হয়ে গিয়েছি। আল্লাহ গো আমি আর পারছি না।’
চিঠির তথ্য অনুযায়ী, চাকরির জন্য তিনি বিভিন্ন সরকারি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়োগ পরীক্ষায় অন্তত ১৩ বার অংশ নিয়েও সফল হতে পারেননি।
তিনি লিখেছেন, পুলিশে তিনবার, নৌবাহিনীতে তিনবার, সেনাবাহিনীতে তিনবার, বিমানবাহিনীতে একবার, বিজিবিতে একবার, কারারক্ষী পদে একবার এবং ব্যাটালিয়নে একবার পরীক্ষা দিয়েও চাকরি পাইনি।
চিঠির শেষ অংশে তিনি লিখেছেন, ‘আল্লাহ, এবার তোমার অলি হজরত শাহজালাল মাজারে আসিয়া খাসি মান্নত করছি, আমি এই মান্নত পূর্ণ করবো। আল্লাহ তুমি এবার আমার জেল কারারক্ষীর চাকরিটা পাইয়ে দাও। আমার মা-বাবার আশা পূর্ণ করে দাও।’
দানবাক্স থেকে পাওয়া আরেকটি চিঠিতে এক ব্যক্তি স্ত্রীকে নিয়ে সুখী দাম্পত্য জীবনের জন্য প্রার্থনা করেছেন। টিঠিতে পুরুষ ও নারী দুজনের নাম লেখা রয়েছে। তাতে লেখা রয়েছে, ‘...আমার বউ। তাকে আমি অনেক অনেক ভালোবাসি। (দুজনের) সম্পর্ক হাজার বছর ঠিক রাখার তৌফিক দাও।’
চিঠিতে দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা অটুট রাখা, ভুল-বোঝাবুঝি দূর হওয়া, আর্থিক সচ্ছলতা এবং শত্রুর হাত থেকে রক্ষার জন্যও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা হয়েছে।
এ ছাড়া দানবাক্স থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে লেখা একটি চিঠিও পাওয়া গেছে। চিঠিতে নিজেকে সিলেটের দরগাহ মহল্লার বাসিন্দা ও ‘শুভাকাঙ্ক্ষী’ পরিচয় দিয়ে লেখক তারেক রহমানকে ‘দুলাভাই’ সম্বোধন করে তার কাছে কয়েকটি অনুরোধ জানিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, ‘সিলেটের সাবেক জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে পুনরায় সিলেটে দায়িত্ব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হোক। একইসঙ্গে হাদি হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা হোক।’
এ ছাড়া মামুনুল হককে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি লিখেছেন, কোনও সংসদীয় আসন শূন্য থাকলে সেখানে তাকে মনোনয়ন দেওয়া যেতে পারে। প্রয়োজনে মির্জা আব্বাসের আসনেও তাকে বিবেচনার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
চিঠিতে লেখা হয়েছে, ‘আল্লামা মামুনুল হক বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আন্তরিকতা ও শ্রদ্ধার পরিচয় দিয়েছেন। বেগম খালেদা জিয়ার মাতার জানাজা ও দাফনের সময় তার খাটিয়া বহনে অংশ নেওয়ার দৃশ্য গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছিল। আমি মনে করি, তার এই অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন করা উচিত।’
টাকা গণনা শেষে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘ডেগ ও নতুন দানবাক্স খুলে ৪৭ লাখ ১০ হাজার ১৫৩ টাকা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রা, স্বর্ণ ও রৌপ্যও পাওয়া যায়। এসব অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার জেলা প্রশাসকের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে জমা রাখা হবে।’
তিনি জানান, বৈদেশিক মুদ্রার মধ্যে রয়েছে সৌদি আরবের ১৩৫ রিয়াল, যুক্তরাষ্ট্রের ২০ ডলার, ভারতের ২ হাজার ৫৩২ রুপি, কাতারের ২২ দিরহাম, মালয়েশিয়ার ৬ রিঙ্গিত, হংকংয়ের ২০ ডলার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২০ ইউরো, ওমানের ১ দশমিক ৪৫০ দিনার, সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৫৪ দশমিক ২০ দিরহাম, ইন্দোনেশিয়ার ৪ হাজার রুপিয়াহ, পাকিস্তানের ৬০ রুপি এবং সিঙ্গাপুরের ১০ ডলার। এ ছাড়া দানবাক্সে ৯ গ্রাম স্বর্ণ, ১০ গ্রাম স্বর্ণসদৃশ বস্তু এবং ৩৯ দশমিক ৪ গ্রাম রৌপ্য পাওয়া গেছে। পাশাপাশি একটি গরু, ৬৫টি ছাগল পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গরু ও ৪০টি ছাগল রান্না করে মাজারের ভক্ত ও অনুরাগীদের খাওয়ানো হয়েছে। ২৫টি ছাগল বিক্রি করা হয়েছে, যার বিক্রয়মূল্য ১ লাখ ১৫ হাজার ৪০৩ টাকা।
মাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির ওপর আস্থা রাখায় সিলেটবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘হজরত শাহজালালের (রহ.) মাজার, দরগাহ মসজিদ ও মাদ্রাসার পরিচালনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গঠিত কমিটির পরবর্তী সভা আগামী বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভার সিদ্ধান্তের আলোকে এক মাসের মধ্যে আমরা এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায় একটা নীতিমালা চূড়ান্ত করবো। এর মধ্য দিয়ে অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবো।’
এর আগে গত ২২ জুন আটটি ডেগ আর দানবাক্স খুলে চার দিনে মোট ১৭ লাখ ৫৪৯ টাকা নগদ পাওয়া যায়। এ ছাড়া ৭ আনা স্বর্ণালঙ্কার এবং সৌদি ৫ রিয়ালের দুটি নোট পাওয়া গিয়েছিল। পরে জেলা প্রশাসকের ব্যবস্থাপনায় নতুন করে চালু করা একটি ব্যাংক হিসাবে এসব টাকা জমা রাখা হয়।
স্থানীয় প্রশাসন ও মাজার কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, গত ১২ জুন হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-এর মাজার পরিদর্শনে যান সিলেটের তৎকালীন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। এ সময় তিনি মাজারের আয় ও ব্যয়ের ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নেওয়ার ঘোষণা দেন। এর অংশ হিসেবে ১৮ জুন বিকালে মাজারে থাকা আগের দানবাক্স সিলগালা করে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি মাজারে মানুষের দানের অর্থ রাখার জন্য থাকা ঐতিহাসিক তিনটি দানের ডেগ সিলগালা করা হয়।
এ ঘটনার পর জেলা প্রশাসকের পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তর আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়। কেউ জেলা প্রশাসকের উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে অভিহিত করেন। আবার প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় দানবাক্স স্থাপনের বিষয়ে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এ রকম আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে নেয় সরকার। সরকারের একাধিক মন্ত্রী অবশ্য জেলা প্রশাসক বদলির ঘটনাকে ‘রুটিন ওয়ার্ক’ বলে মন্তব্য করেছিলেন।
এরপর হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার ইস্যুতে স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদিরের উদ্যোগে গত ২৬ জুন সিলেট সার্কিট হাউসে এক সভা হয়। সেখানে মাজারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সার্বিক পরিচালনায় স্বচ্ছতা আনতে ১৩ সদস্যের কমিটি হয়। আজ ওই কমিটির উদ্যোগেই প্রথমবারের মতো মাজারের দানের টাকা গণনার কাজ শুরু হয়।








