সুনামগঞ্জের শাল্লায় জমি নিয়ে বিরোধের জেরে সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর প্রতিপক্ষের অন্তত ৪০টি বাড়িতে টানা তিন দিন লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যদের দাবি, বাড়িঘর থেকে গরু, ধান, পাওয়ার টিলার, মোটরসাইকেল, স্বর্ণালংকার, নগদ টাকাসহ অর্ধকোটি টাকার বেশি সম্পদ লুট করা হয়েছে। পুরুষ সদস্যরা গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ায় বাড়িগুলোতে থাকা নারী ও শিশুরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
ঘটনাটি ঘটেছে উপজেলার আটগাঁও ইউনিয়নের নিজগাঁও গ্রামে। গত শনিবার (৩১ অক্টোবর) দুপুরে গ্রামের বাসিন্দা রূপ মিয়া ও আজব মিয়ার মধ্যে বাড়ির পাশের জমির দখল নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে দুই পক্ষের লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়ান। এতে আব্দুল মান্নান (৬৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হন। আহত হন উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন।
গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গ্রামের পূর্ব পাশে থাকা পতিত জমির দখল নিয়ে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আজব আলী ও ইউনিয়ন কৃষক দলের আহ্বায়ক রূপ মিয়ার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। বর্ষাকালে জমিটি পানিতে তলিয়ে থাকায় কেউ সেখানে দখলে যাননি। সম্প্রতি হাওরের পানি নেমে জমি জেগে উঠলে এর দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে তা সংঘর্ষে রূপ নেয়।
সংঘর্ষে রূপ মিয়ার চাচাতো ভাই আব্দুল মান্নান নিহত হন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর গ্রেফতার ও প্রতিপক্ষের হামলার আশঙ্কায় আজব মিয়ার গোষ্ঠীর প্রায় ৪০টি পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ সদস্যরা গ্রাম ছেড়ে বিভিন্ন এলাকায় চলে যান। বাড়িতে থেকে যান নারী ও শিশুরা। সেদিন নিহতের মরদেহ দাফনের পর বিকালে নিরাপত্তার কথা ভেবে তারাও ঘরবাড়িতে তালা দিয়ে পাশের গ্রামে স্বজনদের বাড়িতে আশ্রয় নেন।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের অভিযোগ, বাড়ির নারী ও শিশুরা চলে যাওয়ার পর ৩১ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে টানা তিন দিন প্রতিপক্ষের লোকজন তাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালান। এ সময় ঘরে থাকা ধান-চাল, গরু, স্বর্ণালংকার, আসবাবপত্র, কৃষিযন্ত্র, নৌকা ও নগদ টাকা নিয়ে যাওয়া হয়। এ ছাড়া খড়ের গাদায় আগুন দিয়ে গোখাদ্য পুড়িয়ে দেওয়ারও অভিযোগ করেছেন তারা।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪০টি বাড়ি থেকে ৬৭টি গরু, পাঁচটি পাওয়ার টিলার, দুটি মোটরসাইকেল, পানির পাঁচটি সাবমার্সিবল পাম্প, ডিজেলচালিত ২০টি সেচযন্ত্র, দুটি ধান মাড়াইকল, কয়েকশ’ বস্তা বীজধান, গোলায় সংরক্ষিত ৪০০ মণ ধান, দুটি ফ্রিজ, ১২টি গ্যাসের চুলা ও সিলিন্ডার, নগদ পাঁচ লাখ টাকা এবং তিন ভরি স্বর্ণালংকার লুট করা হয়েছে। এ ছাড়া হাঁস-মুরগি, নৌকা, গৃহস্থালির আসবাবপত্র ও রান্নার হাঁড়িপাতিলও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক বৃদ্ধা বলেন, ঘরের মালামাল রক্ষার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি বাড়িতে ছিলেন। রাতে প্রতিপক্ষের লোকজন দরজা খোলার জন্য লাথি মারেন এবং গালাগাল করেন। ভয়ে তিনি দরজা খোলেননি। তার ঘরের বাইরে থাকা দুই ছেলের দুটি মেশিন, চারটি গরু ও একটি নৌকা নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মাসুম মিয়ার স্ত্রী আসমিনা বেগম বলেন, বাড়িতে ফিরে দেখেন ঘরের কোনও জিনিসপত্র অবশিষ্ট নেই। রান্নার হাঁড়িপাতিল, কাপড়চোপড়, গ্যাসের চুলা ও সিলিন্ডার সবই নিয়ে গেছে। তার দাবি, তাদের পরিবারের ৪০০ মণ ধান, ২০ মণ চাল, তিন ভরি স্বর্ণালংকার, ১৭টি গরু, নগদ পাঁচ লাখ টাকা, ফ্রিজ, পানির মোটর, মোটরসাইকেল, ট্রলি ও ধান ভাঙানোর মেশিনসহ ঘরের সব মালামাল লুট করা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত লিমা আক্তার বলেন, আজব মিয়ার গোষ্ঠীর কোনও বাড়িতেই এখন পুরুষ সদস্য নেই। ফাঁকা বাড়িগুলো থেকে গরু-বাছুর, ধান-চাল সব নিয়ে গেছে। এখন পানি পান করার একটি গ্লাসও অবশিষ্ট নেই। গ্রেপ্তার ও প্রতিপক্ষের হামলার ভয়ে পুরুষেরা গ্রাম ছেড়ে চলে গেছেন।
গ্রামছাড়া এলিম উদ্দিনের ছোট বোন মাহমুদা আক্তার বলেন, সংঘর্ষের দিন তাদের ওপর যেন কেয়ামত নেমে এসেছিল। নিহতের মরদেহ দাফনের কাজ শেষ হওয়ার পরই লুটপাট শুরু হয় বলে তার অভিযোগ। বাড়িতে থাকা নারী ও শিশুদের গালাগাল ও হুমকি দিয়ে সবকিছু নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা এবং বাড়িতে পুরুষ সদস্য না থাকায় তারা থানায় গিয়ে অভিযোগও করতে পারেননি।
তবে লুটপাটের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন নিহত আব্দুল মান্নানের চাচাতো ভাই রূপ মিয়া। তিনি বলেন, বিরোধপূর্ণ জমিটি তাদের পৈতৃক সম্পত্তি। জমির কাগজপত্র অনুযায়ী, তার বাবা ওই জমির মালিক। সেখানে ঘর নির্মাণের জন্য তারা মাটি ভরাট করেছেন। অন্যদিকে, আজব আলী কোনও বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে জমিটির মালিকানা দাবি করে দখলের চেষ্টা করছিলেন।
রূপ মিয়ার অভিযোগ, ৩১ অক্টোবর আজব আলীর গোষ্ঠীর লোকজনের হামলায় তার বড় ভাই আব্দুল মান্নান নিহত হন। তাদের গোষ্ঠীর নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ৩০ জন আহত হয়েছেন। সংঘর্ষে তিনি নিজেও পা ও মাথায় আঘাত পেয়েছেন। ঘটনার পর থেকে বিছানা থেকে উঠতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
আটগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান বলেন, ৩১ অক্টোবর সংঘর্ষের পর মরদেহ দাফন শেষে আজব মিয়ার গোষ্ঠীর বাড়িঘরে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। তবে কারা এসব লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের সঙ্গে জড়িত, তা তিনি জানেন না। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের সদস্যরা তাকে ধান-চাল, পাওয়ার টিলার, সেচযন্ত্র ও পারিবারিক ব্যবহারের বিভিন্ন জিনিসপত্র লুট হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
চেয়ারম্যান আরও বলেন, ঘটনাস্থলটি দুর্গম এলাকায়, নেত্রকোনার খালিয়াজুড়ি উপজেলার সীমান্তসংলগ্ন। যোগাযোগব্যবস্থা অনুন্নত হওয়ায় ট্রাক্টর-ট্রলিতে সেখানে পৌঁছাতে তিন থেকে চার ঘণ্টা সময় লাগে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো কঠিন।
শাল্লা থানার ওসি মোহাম্মদ সুহেল বলেন, সংঘর্ষে একজন নিহত হওয়ার পর পুলিশ নিজগাঁও গ্রামে পৌঁছানোর আগেই কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। বর্তমানে গ্রামের বাজারে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। রাতে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে বলে তারা শুনেছেন। তবে গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে পুলিশের পক্ষে যাওয়া কঠিন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পুলিশ কাজ করছে।
লুটপাটের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কেউ থানায় অভিযোগ করেননি জানিয়ে ওসি বলেন, অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আমি যখন প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে, তখন আমার ছেলেটারে গুলি করে মেরে ফেললো