পাঠ্যবইয়ে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের তুলনা

এস এম আববাস
০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯:৩৫আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৬, ১৯:৫১

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের তুলনা করা হয়েছে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে। মাধ্যমিক স্তরের অষ্টম শ্রেণির ‘সাহিত্য কণিকা’ বইয়ের ‘গণঅভ্যুত্থানের কথা’ শিরোনামের গদ্যে এই তুলনা করা হয়।

২০১২ সালের শিক্ষাক্রমের আলোকে প্রণীত পাঠ্যবই চালু হয় ২০১৩ শিক্ষাবর্ষ থেকে। এই শিক্ষাক্রমের শেষ দিকের শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই পরিমার্জন করে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবই প্রণয়ন করা হয়েছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা জানান, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের জন্ম হয়। অথচ এই অভ্যুত্থানের সঙ্গে জুলাই আন্দোলনের তুলনা করা হয়েছে, যা ঠিক হয়নি।

পরিমার্জিত পাঠ্যবইয়ে ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আর জুলাইয়ের আন্দোলনকে শুধু ছাত্র-জনতার আন্দোলন বলা হয়েছে। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের চেয়েও বড় পরিসরে তুলে ধরা হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এবং এই দুই দলের প্রধান দুই নেতা শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়া অনুপস্থিত পাঠ্যবইয়ে। তিন জোটের কথা উল্লেখ করা হলেও জোটের নাম নেই। তবে জুলাই আন্দোলনের বিস্তারিত তুলে ধরে পরিসর বড় করা হয়েছে।

অষ্টম শ্রেণির ‘সাহিত্য কণিকা’ বইয়ের ‘গণঅভ্যুত্থানের কথা’ শিরোনামে এই গদ্যসাহিত্যে লেখা হয়, ‘দুনিয়াজুড়ে সব কালে, নানা দেশে আমরা গণঅভ্যুত্থান ঘটতে দেখেছি। বাংলাদেশের নিকট-ইতিহাসেও এ রকম তিনটি বড় গণঅভ্যুত্থান হয়েছে। প্রথমটি হয়েছিল ১৯৬৯ সালে, যা ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান নামে পরিচিত। দ্বিতীয়টি ১৯৯০ সালে, যাকে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান বলা হয়, আর তৃতীয়টি হয়েছে একেবারে সম্প্রতি, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে। অনেকেই একে জুলাই অভ্যুত্থান বা ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান নামে অভিহিত করেছেন।’

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে তুলনা করে লেখা হয়, ‘আগের দুই অভ্যুত্থানের সঙ্গে এবারের অভ্যুত্থানের একটা বড় পার্থক্য হলো, আগের দুবার শিক্ষার্থীরা প্রধান ভূমিকা রাখলেও আন্দোলন পরিচালিত হয়েছিল রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে। কিন্তু জুলাই অভ্যুত্থানে এরকম কোনও রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব ছিল না। আন্দোলন পরিচালনা করেছে শিক্ষার্থীরা। তাদের সঙ্গে সংগঠন এবং সর্বস্তরের মানুষ যুক্ত হয়।’

অপরদিকে নবম ও দশম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য বইয়ের ‘আমাদের গৌরবগাথা’ শিরোনামের গদ্যসাহিত্য পাঠে লেখা হয়েছে, ‘জুলাই অভ্যুত্থান অভূতপূর্ব এক অভ্যুত্থান, যার পূর্বে নজির নেই। এই অভ্যুত্থান আমাদের জন্য এক অসাধারণ সুযোগ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু এটা কোনও দলের নেতৃত্বে হয়নি। কয়েকটি দলের জোটের মাধ্যমেও হয়নি।’ এই আন্দোলনকে শুধু ছাত্র-জনতার আন্দোলন বলা হয়েছে।

নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের সঙ্গে তুলনা করে সপ্তম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে ‘বাংলাদেশের গণআন্দোলন ও চব্বিশের জুলাই আন্দোলন’ শিরোনামে পাঠ্যে লেখা হয়, ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণতন্ত্রের দাবিতে বাংলাদেশের মানুষ বারবার সংগ্রাম করেছে। অধিকার আদায়ের সংগ্রামে অনেক মানুষ নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছে। ১৯৯০ ও ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার রক্ষার ইতিহাসে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।’

অষ্টম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় গণঅভ্যুত্থান’ পাঠে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের চব্বিশের আন্দোলনের তুলনা করে লেখা হয়, ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান ও চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান তাৎপর্যপূর্ণ দুটি ঘটনা। গণতন্ত্র, সুশাসন ও সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠার দাবিতে জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সফল প্রতিফলন হলো এ দুটি অভ্যুত্থান।’ 

নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ে দ্বিতীয় অধ্যায়-‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা’ পাঠে ‘স্বাধীন বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থান’ অংশে জুলাই আন্দোলনের উল্লেখযোগ্য দিকের অর্থনৈতিক আলোচনায় লেখা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিছক কোনও সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা নয়। বরং এটা বাংলাদেশের জীবনে নতুন নাগরিক চেতনার উন্মেষ।

২০২৬ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক স্তরের বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় এবং বাংলা বইয়ে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন জায়গা পেয়েছে, লেখা হয়েছে কবিতা। প্রাথমিকের বইয়ের জুলাই আন্দোলন নিয়ে লেখা ও কার্টুন রয়েছে বড় পরিসরেই।

পাঠ্যবই পরিমার্জন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. মাহবুবুল হক পাটওয়ারী বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, পাঠ্যবই মুদ্রণের সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না। তিনি পরে দায়িত্ব পেয়েছেন বলে জানান। এনসিটিবির প্রধান সম্পাদকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন এনসিটিবির চেয়ারম্যান।

এনসিটিবির প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর পাঠ্যবই পরিমার্জন বিষয়ে কথা বলতে চাননি।

তবে এনসিটিবির সূত্রে জানা গেছে, পাঠ্যবই পরিমার্জনে ৫৭ জনের এডিটরিয়াল প্যানেল ছিল। পরিমার্জন অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটি (এনসিসি)।

পাঠ্যবই পরিমার্জনের সময় দায়িত্বে থাকা এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরীকে কয়েক দিন ধরে ফোন ও মেসেজে দিয়েও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

/আরকে/এমওএফ/
সম্পর্কিত
নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নারীরা কতটা জায়গা পেলেন?
দেশের প্রথম ‘জুলাই শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে’ আগুন দিলো কারা?
জুলাইয়ে অবদানের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি চান নাহিদ
সর্বশেষ খবর
বাংলাদেশে অ্যাকাডেমিক সহায়তা জোরদার করতে চায় পাকিস্তান
বাংলাদেশে অ্যাকাডেমিক সহায়তা জোরদার করতে চায় পাকিস্তান
১২ তলা থেকে পথচারী নারীর ওপর পড়লেন যুবক: নারীর মৃত্যু, জীবিত যুবক
১২ তলা থেকে পথচারী নারীর ওপর পড়লেন যুবক: নারীর মৃত্যু, জীবিত যুবক
এবার জামায়াত নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য আম্মারের, বললেন ‘একচুয়াল পারফর্ম করতেছে’
এবার জামায়াত নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য আম্মারের, বললেন ‘একচুয়াল পারফর্ম করতেছে’
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
দিনের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক খবর
সর্বাধিক পঠিত
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
এমপির ‘দ্বিতীয় বিয়ে’ নানান প্রশ্ন, দ্বিতীয় স্ত্রী ও শ্বশুরের বক্তব্যে অমিল
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
জামায়াত এমপির ভিডিও ভাইরাল, জানা গেলো আসল ঘটনা 
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বড় পরিবর্তনের পথে ইসি
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
এবার কাশিমপুর মহিলা কারাগারের জেল সুপার বদলি, জেলার বরখাস্ত
দলীয় এমপির ভিডিও ভাইরাল ইস্যুতে যা বললো জামায়াত
দলীয় এমপির ভিডিও ভাইরাল ইস্যুতে যা বললো জামায়াত