এআইয়ের যুগে বদলে যাচ্ছে দেশের শিক্ষা: আছে ঝুঁকি, প্রস্তুতি কতটা? 

এস এম আববাস 
২৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:০০আপডেট : ২৭ জুলাই ২০২৬, ০৮:০০

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত বিকাশ বিশ্বজুড়ে শিক্ষা ও কর্মজগতের চেনা কাঠামো বদলে দিচ্ছে। সেই বৈশ্বিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থাতেও সূচনা হতে যাচ্ছে এক নতুন যুগের। শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ সমাজ ও আধুনিক কর্মক্ষেত্রের জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলতে ২০২৭ সালে শিক্ষা খাতে বড় ধরনের সংস্কার এবং ২০২৮ সালে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

এরই অংশ হিসেবে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে আনা হচ্ছে বড় পরিবর্তন। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বই প্রায় সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে। এতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, মিডিয়া লিটারেসি, সাইবার নিরাপত্তা ও ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের মতো যুগোপযোগী বিষয় যুক্ত করা হবে বলে জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। 

বদলে যাচ্ছে পাঠ্যবই, যুক্ত হচ্ছে নতুন ৪ বিষয় 

কেবল প্রযুক্তি নয়, শিক্ষার্থীদের শারীরিক, সাংস্কৃতিক ও কর্মমুখী দক্ষতায় জোর দিতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে চারটি সম্পূর্ণ নতুন বই যুক্ত করা হচ্ছে। এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক উইং) অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু নাসের টুকু বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, চতুর্থ শ্রেণিতে ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘আনন্দময় শিক্ষা’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ নামে চারটি বই যুক্ত হবে।

এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৭ সালের পাঠ্যবই সংশোধনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং চলতি জুলাইয়ের মধ্যেই সংশোধন শেষ করে বই মুদ্রণের প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। লক্ষ্য নির্ধারিত সময়ে আগামী বছরের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌঁছে দেওয়া। 

বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে এআই ও কর্মক্ষেত্রের সংযোগ

শুধু বিদ্যালয় পর্যায়েই নয়, উচ্চশিক্ষাতেও এআইভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আউটকাম-বেইজড এডুকেশন (ওবিই), লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস), ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার ও এআইভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা চালুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে গত ২০ জুন টেক্সটাইল বিজ্ঞান ও প্রকৌশল সম্মেলনে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, দেশের ঐতিহ্যবাহী টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন শিল্প খাতের আধুনিকায়নে এআই ব্যবহারের কোনও বিকল্প নেই এবং শিক্ষার সঙ্গেই কর্মক্ষেত্রের এই যোগসূত্র তৈরি করা হচ্ছে। 

সুযোগের পাশাপাশি ঝুঁকিও কম নয়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এআই শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক শেখা, জটিল বিষয় সহজে অনুধাবন করা ও শারীরিক প্রতিবন্ধীদের পড়ালেখায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। তবে এর ক্ষতিকর দিকও অনেক। এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা শিশুদের মৌলিক চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়া ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করা, গবেষণায় অসদুপায় অবলম্বন এবং মানবিক সম্পর্কের অবনতি ঘটারও বড় ঝুঁকি রয়েছে। 

‘এআই কখনোই শিক্ষকের বিকল্প নয়’ 

প্রযুক্তির এই জোয়ারে শিক্ষকের ভূমিকা যেন গৌণ হয়ে না পড়ে, সে বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশের শীর্ষ শিক্ষাবিদরা।

শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “মেশিন তো মেশিনই, তা কখনোই মানুষকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না। এআই যেন শিক্ষকের ভূমিকা গৌণ না করে ফেলে। মানুষ তো স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, এআইয়ের কাছে মানুষের সেই শ্রেষ্ঠত্ব হারালে চলবে না। গবেষণায় দেখা গেছে, এআই অতিরিক্ত ব্যবহারে মানুষের চিন্তাশক্তি কমে যায় এবং মানুষ ‘প্যাসিভ’ বা মানসিক অস্থিরতার শিকার হতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, কানাডা বা ফ্রান্সের মতো উন্নত দেশগুলো এর ক্ষতিকর প্রভাব সামলাতে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আনছে। আমাদের শ্রেণিকক্ষে মানবিকতার এই জায়গাটি টিকিয়ে রাখতে হবে।” 

শিক্ষা গবেষক কে এম এনামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “শিক্ষায় এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষককেই কেন্দ্রের ভূমিকায় রাখতে হবে। শিক্ষকদের নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট, ডিভাইস এবং এআই ব্যবহারের ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তবে মনে রাখতে হবে— এআই কখনোই শিক্ষকের বিকল্প নয়, এটি শিক্ষকের কাজকে আরও কার্যকর করার একটি সহায়কমাত্র।” 

অপরদিকে মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে কিশলয় বালিকা বিদ্যালয় ও কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ রহমত উল্লাহ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “গ্রামের অনেক শিক্ষক এখনও ঠিকমতো স্মার্টফোনই ব্যবহার করতে পারেন না। তাছাড়া গ্রামের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর স্মার্টফোন কেনার সামর্থ্য নেই। এই অবস্থায় শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ না দিয়ে এআই চালু করলে শহরের সঙ্গে গ্রামের শিক্ষার্থীদের এক বিশাল ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি হবে।” 

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ২০২৭ সালের শিক্ষা সংস্কার কেবল আইসিটি বই পরিবর্তনের বিষয় নয়; বরং প্রযুক্তিকে যেন শিক্ষার্থীরা অন্ধভাবে ব্যবহার না করে কেবল একটি সহায়ক মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে এবং শিক্ষকের মানবিক দিকটি অটুট থাকে—সেদিকে দৃষ্টি দেওয়াই এখন সরকারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। 

/এসটি/এমওএফ/
সম্পর্কিত
প্রধান শিক্ষিকার রিল ভিডিও ভাইরালের পর বিতর্ক, তদন্তে শিক্ষা বিভাগ
জবি শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা: মানসিক নিপীড়নের অভিযোগে প্রেমিকের বিরুদ্ধে চার্জশিট
৬২১ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি বন্ধের নির্দেশ
সর্বশেষ খবর
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন পথে হাঁটতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে নতুন পথে হাঁটতে চায় বাংলাদেশ ব্যাংক
স্নাতক পাসে ইউসিবি ব্যাংকে চাকরি, বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৪০ বছর
স্নাতক পাসে ইউসিবি ব্যাংকে চাকরি, বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৪০ বছর
অফিস পেরিয়ে এবার সংসারেও এআই
অফিস পেরিয়ে এবার সংসারেও এআই
নাশতার টেবিলে আনুন ভিন্নতা, তৈরি করুন সুস্বাদু মালাই মোমো
নাশতার টেবিলে আনুন ভিন্নতা, তৈরি করুন সুস্বাদু মালাই মোমো
সর্বাধিক পঠিত
উদ্বোধনের ১২ দিনেই ধসে পড়লো ৪৭০০ কোটির এক্সপ্রেসওয়ে
উদ্বোধনের ১২ দিনেই ধসে পড়লো ৪৭০০ কোটির এক্সপ্রেসওয়ে
বিজিবি ও গ্রামবাসীর প্রতিরোধ, সীমান্তের  ৯ নারীকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে বিএসএফ
বিজিবি ও গ্রামবাসীর প্রতিরোধ, সীমান্তের  ৯ নারীকে ফিরিয়ে নিয়ে গেছে বিএসএফ
প্রধান শিক্ষিকার রিল ভিডিও ভাইরালের পর বিতর্ক, তদন্তে শিক্ষা বিভাগ
প্রধান শিক্ষিকার রিল ভিডিও ভাইরালের পর বিতর্ক, তদন্তে শিক্ষা বিভাগ
বাংলাদেশি দম্পতিকে পিটিয়ে গ্রেফতার ভারতীয় চিকিৎসক
বাংলাদেশি দম্পতিকে পিটিয়ে গ্রেফতার ভারতীয় চিকিৎসক
নিয়োগ পরীক্ষার হলে বিএনপির সাবেক এমপির ছেলে, পরীক্ষার্থীরা বললেন ‘আমরা হতবাক’
নিয়োগ পরীক্ষার হলে বিএনপির সাবেক এমপির ছেলে, পরীক্ষার্থীরা বললেন ‘আমরা হতবাক’